সোনা-গয়নার চাহিদায় ভাটা ভারতে: ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল
এই সময়: ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধি, শুল্কের চাপ এবং সঞ্চয়ের বিকল্প উৎসের উপরে বর্ধিত আস্থার কারণে ভারতের সোনার বাজারে চাহিদা কমেছে। বৃহস্পতিবার তাদের ‘কিউ ২ ২০২৬ গোল্ড ডিমান্ড ট্রেন্ডস’ শীর্ষক এক রিপোর্টে এমনটাই জানিয়েছেন ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল (ডব্লিউজিসি) কর্তৃপক্ষ। আন্তর্জাতিক সংস্থাটির দেওয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকে দেশে সোনার মোট চাহিদা বার্ষিক ৬ শতাংশ কমে ১৩১.৪ টনে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের এপ্রিল-জুন পর্বে যা ১৩৯.৭ টন ছিল।
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, বিয়ে ও উৎসবের মরশুম না থাকায় বিক্রি স্বাভাবিক ভাবেই কিছুটা শ্লথ ছিল, তার উপরে সোনার আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি এবং অপ্রয়োজনীয় সোনা কেনা কমানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আহ্বান বাজারে প্রভাব ফেলেছে। তবে, পরিমাণের নিরিখে চাহিদা কমলেও দামের নিরিখে গত ত্রৈমাসিকে রেকর্ড বিক্রি হয়েছে। এর কারণ অবশ্যই বিশ্ববাজার সমেত ভারতের বাজারের সোনার চড়া দাম। ডব্লিউজিসি-র ভারতীয় শাখার আঞ্চলিক সিইও সচিন জৈন জানিয়েছেন, এপ্রিল-জুন পর্বে দেশে মোট ১ লক্ষ ৯৮ হাজার ১০০ কোটি টাকার সোনা কেনাবেচা হয়েছে। ২০২৫-এর একই সময়ে তা ১ লক্ষ ৩২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ছিল। অর্থাৎ, আর্থিক অঙ্কের নিরিখে চাহিদা ৫০ শতাংশ বেড়েছে। তাঁর কথায়, ‘সোনার চড়া দামের মধ্যেও ভারতীয় ক্রেতারা সোনাকে সম্পদ তৈরির নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে অগ্রাধিকার দিয়ে চলেছেন।’
এর মধ্যে সব থেকে উল্লেখযোগ্য হলো গয়নার চাহিদা কমে যাওয়া। রিপোর্ট অনুযায়ী, এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকে দেশে গয়নার চাহিদা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ শতাংশ কমে ৭৫.১ টনে নেমে এসেছে। ২০২৫-এর এপ্রিল-জুন পর্বে তা ৮৮.৮ টন ছিল। ডব্লিউজিসি-র মতে, অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত, সোনার শুল্ক বৃদ্ধি এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সোনা কেনা কমানোর ডাক—এই তিন কারণ গয়নার বাজারের উপরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
প্রসঙ্গত, ভারতের বাজারের চাহিদা মেটানোর জন্য বিপুল পরিমাণ সোনা আমদানি করতে হয়। যে কারণে অনেক বেশি আমদানি খরচের বোঝা বহন করতে হয় কেন্দ্রকে। এই আমদানি খরচে রাশ টানতে চলতি বছরের মে মাসে দেশবাসীকে অপ্রয়োজনীয় সোনা কেনা কমানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বিশ্বের অপরিশোধিত তেলের বাজারে অস্থিরতার কারণে দেশের আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের জন্য বিকল্প সঞ্চয়ের পথ খোঁজার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
অন্য দিকে, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তুলনামূলক আশাব্যঞ্জক ছবি দেখা গিয়েছে। বার ও কয়েনের চাহিদা বছরে ৯ শতাংশ বেড়ে ৫০.৩ টনে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে ভারতীয় গোল্ড ইটিএফ-এ ৪.২ টন নিট লগ্নি হয়েছে। যদিও একই সময়ে বিশ্বের গোল্ড ইটিএফ বাজার থেকে বিনিয়োগ তুলে নেওয়ার প্রবণতাই বেশি ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, সুদের হার এবং মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা সোনাকে কৌশলগত বিনিয়োগের উপকরণ হিসেবে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
তবে, সোনা আমদানিতে শুল্ক বৃদ্ধির ফলে বেআইনি সোনা পাচার বাড়তে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচিন। তিনি জানিয়েছেন, বাজারে ইতিমধ্যেই অবৈধ সোনা ঢোকার রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে এবং আগামী ত্রৈমাসিকগুলিতে এই প্রবণতার উপরে নজর রাখতে হবে।
ডব্লিউজিসি-র রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে রিসাইকলড গোল্ড বা পুনর্ব্যবহৃত সোনার পরিমাণও কমেছে। এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকে এই ধরনের সোনার পরিমাণ ১৭ শতাংশ কমে গিয়ে ১৯.২ টনে দাঁড়িয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ে ২৩.১ টন ছিল। একই সঙ্গে দেশে মোট সোনার আমদানি ২৩ শতাংশ কমে ৯৮.১ টনে দাঁড়িয়েছে।
তবে, বছর শেষে ভারতের মোট সোনার চাহিদা ৬৫০-৭৫০ টনের মধ্যে থাকতে পারে বলে ডব্লিউজিসি-র অনুমান। সচিন জৈন-এর মতে, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সুদের হার ও মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষিতে চাহিদা এই সীমার মধ্যবর্তী স্তরে থাকবে। তবে, সোনার দামে বড় ধরনের সংশোধন এবং আমদানি শুল্ক কমলে চাহিদা আবার ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে বলেই তাঁর দাবি।