ইউরেনিয়াম নিয়ে ছাড় সৌদিকে, ট্রাম্পের পরমাণু চুক্তি সাক্ষর নিয়ে উদ্বেগে বিশ্ব
আমেরিকার সঙ্গে সৌদি আরবের ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নয়া উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে এই চুক্তি। কী রয়েছে এই চুক্তিতে? জানা গিয়েছে, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ৩০ বছরের এই চুক্তির আওতায় সৌদি আরবকে নিজের দেশে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ (Uranium Enrichment)-এর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে বেসরকারি পারমাণবিক পরিকাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ পাবে সৌদি আরব। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক পরমাণু নিরাপত্তার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা ব্যবস্থা চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরমাণু বিশেষজ্ঞ এবং মার্কিন আইনপ্রণেতাদের একাংশ। বিশেষজ্ঞদের একাংশের আশঙ্কা, এর ফলে পশ্চিম এশিয়ায় পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে পারে।
কী এই পরমাণু চুক্তি?
এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Atomic Energy Act-এর Section 123-এর অধীনে হওয়া একটি সিভিল নিউক্লিয়ার কো-অপারেশন অ্যাগ্রিমেন্ট। এই ধরনের চুক্তি অনুযায়ী, আমেরিকার সংস্থাগুলি অন্য দেশকে পারমাণবিক প্রযুক্তি, রিঅ্যাক্টর, জ্বালানি এবং গবেষণায় সহযোগিতা করতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের অনুমোদিত এই চুক্তির মেয়াদ ৩০ বছর। এর মাধ্যমে সৌদি আরব পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং জ্বালানি উৎপাদনে আমেরিকার সহায়তা পাবে। চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার আগে মার্কিন কংগ্রেসে পর্যালোচনার জন্য পাঠানো হবে। কংগ্রেসের আপত্তি না থাকলে এটি কার্যকর হবে। রয়টার্স জানিয়েছে, এটি ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত চুক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামে মাত্র ০.৭ শতাংশ U-235 থাকে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সাধারণত এটিকে ৩-৫ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা হয়। কিন্তু একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইউরেনিয়ামকে ৯০ শতাংশ বা তারও বেশি সমৃদ্ধ করা গেলে তা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপযোগী হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের প্রযুক্তি একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জরুরি, অন্যদিকে, সেটিই পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রথম ধাপ হতে পারে। তাই এই প্রযুক্তিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে দেখা হয়।
কেন চুক্তি নিয়ে বিতর্ক?
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের প্রধান কারণ, এই চুক্তিতে আমেরিকার তথাকথিত ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ শর্ত নেই। সাধারণত সংযুক্ত আরব আমিরশাহির (UAE) মতো দেশগুলির সঙ্গে করা চুক্তিতে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত থাকে—
দেশটি নিজস্বভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করবে না।
ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ (reprocessing) করবে না। কিন্তু সৌদি আরবের ক্ষেত্রে এই সীমাবদ্ধতা রাখা হয়নি। ফলে ভবিষ্যতে দেশটি নিজস্বভাবে পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করবে, যা পরবর্তীতে সামরিক কর্মসূচিতেও ব্যবহার করা যেতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।
IAEA নিয়ে কেন প্রশ্ন?
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) সাধারণত সদস্য দেশগুলির পারমাণবিক কর্মসূচির উপর নজরদারি চালায়। সমালোচকদের দাবি, এই চুক্তিতে IAEA-র Additional Protocol-এর মতো কঠোর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকে বাধ্যতামূলক করা হয়নি। ফলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক নজরদারি দুর্বল হতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সৌদির অবস্থান কী?
সৌদি আরব বারবার দাবি করেছে, তাদের লক্ষ্য শুধুমাত্র বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জ্বালানির বিকল্প উৎস গড়ে তুলতে ইউরেনিয়াম ব্যবহার করা। তবে অতীতে যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমন বলেছিলেন, ‘ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে, তাহলে সৌদি আরবও সেই পথে হাঁটবে।’ সেই মন্তব্যের জেরেই নতুন চুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
ইরানের সঙ্গে কী সম্পর্ক?
সৌদির এই চুক্তির সময়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সাম্প্রতিক মাসগুলিতে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং তেহরানের সঙ্গে আমেরিকার সংঘাত আবারও তুঙ্গে। এই পরিস্থিতিতে সৌদির যুবরাজের পুরোনো মন্তব্য মনে করাচ্ছে আন্তর্জাতিক মহল। সৌদির যুবরাজের ওই মন্তব্যের পর থেকেই সৌদির পারমাণবিক কর্মসূচিকে আন্তর্জাতিক মহল বাড়তি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। অনেকের আশঙ্কা, এই চুক্তি ইরান-সৌদি প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নতুন মাত্রা দিতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি কী?
হোয়াইট হাউসের ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি, এই চুক্তির উদ্দেশ্য পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি নয়, বরং সৌদি আরবের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আমেরিকার পারমাণবিক শিল্পের জন্য বড় বাজার তৈরি করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন সংস্থাগুলি সৌদিতে বিলিয়ন ডলারের পারমাণবিক পরিকাঠামো নির্মাণের সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে এটি পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকার প্রভাব আরও শক্তিশালী করবে।
কংগ্রেসের অনুমোদন বাকি
চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার আগে মার্কিন কংগ্রেসে পাঠানো হবে। সেখানে ৯০ দিনের পর্যালোচনা চলবে। কংগ্রেস চাইলে আপত্তি জানাতে পারে, যদিও প্রেসিডেন্টের ভেটো অগ্রাহ্য করতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন হবে। ফলে বিষয়টি নিয়ে ওয়াশিংটনে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই চুক্তিকে শুধু একটি জ্বালানি সহযোগিতা নয়, বরং পশ্চিম এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য বদলে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।