কাজের খোঁজে ভিন রাজ্যে, মাঝপথে গায়েবে রহস্য!
বাসুদেব ভট্টাচার্য, ময়নাগুড়ি
বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন রুজির টানে। কেউ কেরালা, কেউ তামিলনাড়ু। পরিজনদের বলে গিয়েছিলেন, পৌঁছেই ফোন করবেন। কিন্তু সেই ফোন আর আসেনি। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, কোথাও কোথাও বছরের পর বছর কেটে গিয়েছে। অপেক্ষা ছাড়া আর কিছুই জোটেনি পরিবারের ভাগ্যে।
ডুয়ার্সের চা-বাগান এলাকায় ক্রমশ উদ্বেগ বাড়াচ্ছে এমন একের পর এক নিখোঁজের ঘটনা। কাজের খোঁজে ভিন রাজ্যে গিয়ে উধাও হয়ে গিয়েছেন চা-শ্রমিকরা। অথচ প্রশাসনের কাছে তাঁদের কোনও রেকর্ড নেই। অথচ প্রশাসনের কাছে তাঁদের কোনও রেকর্ড নেই। কে, কোথায়, কার সঙ্গে কাজে গিয়েছিলেন, তারও কোনও তথ্য নেই। ফলে কেউ নিখোঁজ হলে তদন্ত শুরু হয় কার্যত শূন্য থেকে। ‘ডুয়ার্স জাগরণ’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সমীক্ষায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। গত এক দশকে শুধু কয়েকটি চা-বাগান থেকেই অন্তত ছ’-সাত জন শ্রমিক ভিন রাজ্যে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন বলে দাবি সংস্থার। বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলেও আশঙ্কা তাদের।
রেড ব্যাঙ্ক চা-বাগানের বাসিন্দা, বছর চল্লিশের সঞ্চার ওরাওঁ ২০২৫- এর এপ্রিলে কেরালায় কাজ করতে গিয়েছিলেন। তার পরে আর তাঁর কোনও খোঁজ নেই। একই বাগানের অনিল ওরাওঁ সে বছরের জুনে চেন্নাইয়ে রওনা দেন। শেষবার তাঁর মোবাইলের অবস্থান ধরা পড়েছিল তিরুচিরাপল্লিতে। তার পরে ফোন বন্ধ। এখনও নিখোঁজ। এই প্রথম নয়। একই বাগানের ধনলাল ওরাওঁ ২০১৪-তে কেরালা কাজ করতে গিয়ে আর ফেরেননি। সেই বছরই নিখোঁজ হন মনুলাল ওরাওঁ। এক দশক কেটে গেলেও তাঁর ভাগ্যে কী ঘটেছিল, আজও জানে না পরিবার। একই ছবি লক্ষ্মীপাড়া চা-বাগানে। ২০২৪-এর অক্টোবরে কাজের জন্য বাইরে গিয়ে নিখোঁজ হন মণ্ডু প্রাজা। তাঁর স্ত্রী মানসিক ভাবে অসুস্থ। থানায় অভিযোগ হয়েছে কি না, তা-ও স্পষ্ট নয়।
চলতি বছরের মে-তে চটুয়া বস্তি-র আদেশ ওরাওঁ কেরালা যাওয়ার পথে বিজয়ওয়াড়া স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে নিখোঁজ হয়ে যান। সম্প্রতি একই এলাকার প্রসেনজিৎ ওরাওঁ-এর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নতুন করে আতঙ্ক বাড়িয়েছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, শ্রম দপ্তর কার্যত অন্ধকারে। মালবাজারের সহকারী শ্রম কমিশনার শুভ্রজিৎ সরকার জানিয়েছেন, ভিন রাজ্যে কাজে যাওয়া এই শ্রমিকদের কোনও তথ্য তাঁদের কাছে নেই।
প্রতি বছর হাজার হাজার চা-শ্রমিক কাজের খোঁজে রাজ্যের বাইরে পাড়ি দেন। কিন্তু তাঁদের যাত্রার কোনও সরকারি রেকর্ড নেই। প্রাথমিক তথ্যটুকু না-থাকায় কেউ নিখোঁজ হলে পুলিশ-প্রশাসনকে তদন্তে বেগ পেতে হয়। অনেক সময়ে তদন্ত মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায়। জলপাইগুড়ি জেলার এক পুলিশ কর্তার কথায়, ‘ছাই দিয়ে তো আর দড়ি পাকানো যায় না।’ ‘ডুয়ার্স জাগরণ’ মঞ্চের কর্ণধার ভিক্টর বসুর দাবি, ‘শ্রমিকদের কোথায়, কার মাধ্যমে, কোন সংস্থায় কাজে পাঠানো হচ্ছে, তার একটি বাধ্যতামূলক সরকারি রেকর্ড রাখা জরুরি। তাতে অন্তত বিপদের সময়ে দ্রুত যোগাযোগ ও অনুসন্ধান সম্ভব।’
নিখোঁজদের পরিবার আজও অনিশ্চয়তায়। সঞ্চার ওরাওঁয়ের ছেলে সিমিল বলেন, ‘আত্মীয়-স্বজন থেকে শুরু করে পুলিশ, সব জায়গায় গিয়েছি। এখনও কোনও খোঁজ মেলেনি।’ বানারহাট ও ময়নাগুড়ি থানার দাবি, অভিযোগ পাওয়ার পরে তদন্ত হলেও খুব একটা অগ্রগতি হয়নি। প্রশ্ন উঠেছে, ভিন রাজ্যে যাওয়ার আগে তাঁর যাত্রাপথ, নিয়োগকারী সংস্থা বা গন্তব্য সম্পর্কে যদি কোনও সরকারি তথ্য না থাকে, তাহলে নিখোঁজের তদন্ত কতটা এগোন সম্ভব?