আমি কী বলিব, কার কথা, কোন সুখ, কোন ব্যথা
রণিতা চট্টোপাধ্যায়
রুশতী সেনকে নিয়ে এক আলোচনায় অধ্যাপক শ্রাবণী পাল লিখেছিলেন, ‘বাংলা সাহিত্যের এক বিশিষ্ট সমালোচক রুশতী, বাসন্তী দেবী কলেজে অর্থনীতির শিক্ষক।’ রুশতী সেনের লেখালিখির স্বাতন্ত্র্যকে চিহ্নিত করার জন্য বাক্যের এই চলনটাই জরুরি বলে মনে হয়েছিল আলোচকের কাছে, যেখানে পেশাগত পরিচয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল সেই মনন, যা তিনি সমালোচক ও বিশ্লেষক হিসাবে নির্মাণ করেছেন। আর সেই মনন গড়ে উঠেছে কী ভাবে, তার একটা সূত্র রুশতী সেন নিজেই ধরিয়ে দেন আমাদের— ‘ইতিহাস, ভূগোল, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বা অর্থনীতি, অর্থাৎ সমাজবিজ্ঞানের যে চত্বরেই ঘোরাফেরা করি, তাকে পড়তে হবে সাহিত্য-সংস্কৃতির সঙ্গে মিলিয়ে, সাহিত্য-সংস্কৃতির অন্দরেও খুঁজে নিতে হবে সমাজবিজ্ঞানের উপাদান।’
তাঁর সম্পাদিত ‘মেয়েদের কথা মায়েদের কথা’ বইয়ের তৃতীয় খণ্ড পড়তে গিয়ে গোড়াতেই যে এ প্রসঙ্গ উঠে এল, তার কারণ বইটির বিষয় নির্বাচনের নেপথ্যে সম্পাদকের এই মনোভঙ্গিকে চিনতে ভুল হওয়ার জো নেই। বস্তুত, বৃহত্তর প্রেক্ষাপট থেকে সাহিত্য পাঠের প্রতিক্রিয়া বয়ন এবং সেই তাত্ত্বিক বোধ দিয়ে সাহিত্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত সমাজকে অনুধাবন করার যে অভ্যাস তিনি আত্মস্থ করেছেন, সেই প্রেক্ষণবিন্দু দিয়েই তিনি দেখতে চেয়েছেন মেয়েদের— যারা নানা সময়ের, নানা সমাজের বাসিন্দা। তাদের নিজেদের কথার টুকরো টুকরো দিয়ে তিনি একটা ধারণা পাঠকের সামনে রাখতে চেয়েছেন, যে ধারণার কথা ধরা আছে প্রতি খণ্ডের ব্লার্বে— ‘ঘরে-বাইরের দাবি-দাওয়া, কর্মজগতের আনুকূল্য-প্রতিকূলতা, সম্পর্কের সুর-বেসুর, অনেক সঙ্গের ভিতরেও নিঃসঙ্গতার অভিযান, সব মিলে বিচিত্র এই জীবনের কয়েকটি টান-টোনে বুঝতে চাওয়া— কেমন আছি আমরা’।
যে বইয়ের একাধিক খণ্ড, তার একটি মাত্র অংশ নিয়ে আলোচনা করা কঠিন। কিন্তু সম্পাদকের সমাজকে দেখা-চেনা-বোঝার চর্চার ধারাবাহিকতা জুড়েই এ বই পথ চলছে বলে তাকে সেই ইতিহাসের একটি নির্দেশক হিসেবে দেখা চলে। সেই ইতিহাসের শরিক যেমন বর্ষীয়ান লেখক-শিক্ষাবিদ শিবানী রায়চৌধুরী, চিকিৎসক টুটুল চক্রবর্তী, কিংবা জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার কর্মী ও লেখক মৈত্রী রায় মৌলিক, তেমনই লিখেছেন এক বছরের চাকরি ছেড়ে গৃহবধূর চিরস্থায়ী কাজে ঢুকে পড়া অসীমা চক্রবর্তী। সুপরিচিত নাট্যকর্মী সীমা মুখোপাধ্যায় বা চিত্রশিল্পী অরুণিমা চৌধুরী, হেপ্টাথলন খেলোয়াড় সোমা বিশ্বাসের পাশাপাশি এ সংকলনে নিজেদের এক-একটি অংশ রেখে গিয়েছেন দক্ষিণবঙ্গ মৎস্যজীবী ফোরামের তাপসী দোলুই, পশ্চিমবঙ্গ গৃহপরিচারিকা সমিতির স্বপ্না ত্রিপাঠীরা। সমাজের বহুবিচিত্র স্তর থেকে উঠে আসা, ভিন্ন ভিন্ন পরিসরে থাকা এই মেয়েদের কথায় সেই সব নানা স্তরের ছবি মিলে তৈরি হয়েছে একটা কোলাজ। যে সংকলনের প্রতিটা টুকরোর স্বাদ বর্ণ গন্ধ আলাদা রকমের। তবে সঙ্কলন গ্রন্থ বলেই টুকরো লেখাদের আয়তনে খানিক সাযুজ্য থাকলে ভালো হতো। আর ভালো হতো লেখাগুলির মধ্যে দিয়ে বইয়ের নামের তাৎপর্য আরও স্পষ্ট হলে। এ বই মেয়েদের কথা তো বটেই, তবে সেই মেয়েদের মায়ের কথা কিংবা তাঁদের কারও কারও মা হওয়ার আলোআঁধারি পথের খবর এখানে মেলেনি। যদিও শুধু একটি খণ্ডের ভিত্তিতে এ ধারণায় বদ্ধমূল না হওয়াই ভালো।
মেয়েদের স্মৃতিকথা কিংবা আত্মস্মৃতি নিয়ে নাড়াচাড়া করা অবশ্য রুশতী সেনের পক্ষে নতুন নয়। মেয়েদের কথা নিয়ে কথা বলার প্রসঙ্গেই একটা শব্দকে তিনি বারবার ছুঁয়ে, বুঝে দেখতে চেয়েছেন— ‘আড়াল’। যে আড়ালে থাকার অভ্যাস, আড়াল করার অভ্যাস মেয়েদের কথা বলার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর মনে হয়েছে, জীবনের বাঁকে বাঁকে নারীকেন্দ্রিক জিজ্ঞাসাগুলির সঙ্গে যে মেয়েরা যুক্ত হয়েছেন, তাঁদের অনেকেই নিজের কথা বলার ক্ষেত্রে আরও বেশি দ্বিধার মুখোমুখি হয়েছেন, আড়াল ভাঙতে না পারাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে আসলে তাঁদের আত্মসম্ভ্রমের আঁচল টেনে রাখার সাফাই। ‘যাঁর আলোকপ্রাপ্তি যত বেশি, তাঁর বানিয়ে তোলার আয়োজন তত আঁটসাঁট’, এ কথা বুঝতে বুঝতেই রুশতী দ্বিধায় পড়েন, ‘সামাজিক সম্ভ্রমের আবর্তে অনেকটাই অপাঙ্ক্তেয়, নিদারুণ পোড়খাওয়া মানুষ যাঁরা, তাঁরা কি নিজের চারপাশের আড়ালটা ভেঙে ফেলতে পারেন তুলনায় সহজে?’ ‘মেয়েদের কথা মায়েদের কথা’ যে মেয়েদের অনেক আড়াল-ভাঙা, আগল-ভাঙা আত্মকথনকে আলোর মধ্যে দাঁড় করাল, মেয়েদের আধখানা-পাওয়া আধখানা-চাওয়া যাপনের ইতিহাসে এই বা কম কী!