বসবাসের জন্য বিশ্বের সেরা শহর কোনটি? Global Liveability Index-এ রয়েছে ইউরোপ ও এশিয়ার একাধিক শহর

বিশ্ব জুড়ে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দ্রুত নগরায়নের চ্যালেঞ্জের মধ্যেও এমন কিছু শহর রয়েছে, যেখানে জীবনযাত্রার মান এখনও বিশ্বের কাছে উদাহরণ। নিরাপদ পরিবেশ, উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা, আধুনিক অবকাঠামো, উন্নত শিক্ষা এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিবেশ—এই সবকিছুর সমন্বয়েই তৈরি হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরগুলির তালিকা।

২০২৬ সালের Economist Intelligence Unit (EIU) প্রকাশিত Global Liveability Index-এ বিশ্বের ১৭৩টি শহরের র্যাঙ্কিং প্রকাশ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাটি প্রতি বছরই বিশ্বের বিভিন্ন শহরে বসবাসের মান বিচার করে এই তালিকা তৈরি করে।

কী ভাবে তৈরি হয় এই তালিকা?
EIU পাঁচটি প্রধান সূচকের ভিত্তিতে প্রতিটি শহরকে মূল্যায়ন করেছে—
-
স্থিতিশীলতা (Stability) – আইনশৃঙ্খলা, অপরাধের হার, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা।
-
স্বাস্থ্য পরিষেবা (Healthcare) – হাসপাতাল, চিকিৎসা পরিষেবা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার মান।
-
শিক্ষা (Education) – সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষার সুযোগ ও মান।
-
পরিকাঠামো (Infrastructure) – রাস্তা, গণপরিবহণ, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও ডিজিটাল পরিষেবা।
-
সংস্কৃতি ও পরিবেশ (Culture & Environment) – সবুজ পরিবেশ, বিনোদন, জলবায়ু, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং জীবনযাত্রার মান।

এই পাঁচটি সূচকের গড় নম্বরের ভিত্তিতেই নির্ধারণ করা হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহর। এ বছরের লিস্টে কোন দেশ কোন স্থানে রয়েছে?
ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন আবারও বিশ্বের এক নম্বর বাসযোগ্য শহরের তকমা ধরে রেখেছে। ২০২৫ সালের মতো ২০২৬ সালেও শহরটি প্রথম স্থান অধিকার করেছে। কোপেনহেগেনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সাসটেইনেবল আরবান প্ল্যানিং। শহরের অধিকাংশ মানুষ প্রতিদিন সাইকেলে অফিস বা কর্মস্থলে যাতায়াত করেন। ফলে দূষণ কম, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রিত এবং জীবনযাত্রাও অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর।

অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা এ বার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। যদিও গত কয়েক বছর ধরে শহরটি একাধিকবার বিশ্বের এক নম্বর বাসযোগ্য শহরের স্বীকৃতি পেয়েছিল। বিশ্বমানের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, অপেরা, জাদুঘর, নিরাপদ পরিবেশ এবং দুর্দান্ত গণপরিবহণ এখনও ভিয়েনাকে বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় শহর হিসেবে ধরে রেখেছে।

এ বারের তালিকায় অস্ট্রেলিয়ার তিনটি শহর সেরা দশে জায়গা করে নিয়েছে। মেলবোর্ন তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে। সিডনি গত বছরের তুলনায় দুই ধাপ এগিয়ে চতুর্থ স্থানে এসেছে। আধুনিক অবকাঠামো, সমুদ্র উপকূল, উন্নত জীবনযাত্রা এবং শক্তিশালী অর্থনীতি শহরটির জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়েছে। অ্যাডিলেড অষ্টম স্থানে রয়েছে।

সুইৎজ়ারল্যান্ডের দুই শহরও রয়েছে সেরাদের মধ্যে। জ়ুরিখ পঞ্চম এবং জেনেভা ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে। এই দুই শহরের পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, বিশ্বমানের ব্যাংকিং ব্যবস্থা, নিরাপদ জীবন, উচ্চ আয় এবং উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবা তাদের দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের অন্যতম বাসযোগ্য শহরের তালিকায় রেখেছে।

জাপানের ওসাকা সপ্তম এবং টোকিও দশম স্থানে রয়েছে। জাপানের শহরগুলির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো অত্যন্ত সময়নিষ্ঠ গণপরিবহণ, উন্নত প্রযুক্তি, দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি, কম অপরাধের হার এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ।

কানাডার ভ্যাঙ্কুভার নবম স্থানে রয়েছে এবং উত্তর আমেরিকার একমাত্র শহর হিসেবে সেরা দশে জায়গা ধরে রেখেছে। নিউ ইয়র্ক তিন ধাপ এগিয়ে ৬৬ নম্বরে উঠে এসেছে।

এ বারের রিপোর্টে এশিয়ার উন্নতি হয়েছে। এশিয়ার গড় স্কোর বেড়েছে, বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বৃদ্ধির কারণে। চিনের ফুঝৌ-সহ একাধিক শহর স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নতির জন্য উল্লেখযোগ্য ভাবে এগিয়ে এসেছে।

তবে যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে বহু শহরে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত এবং ইরান-সংক্রান্ত উত্তেজনার প্রভাব এ বার এই তালিকায় স্পষ্ট ভাবে ধরা পড়েছে। মাসকাট ১৪ ধাপ নেমে ১২৩তম এবং কুয়েত সিটি ১২ ধাপ নেমে ১০৫তম স্থানে পৌঁছেছে।

অন্য দিকে চলমান যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের কিয়েভ এবং ইরানের তেহরান-এর অবস্থানও অনেকটাই নীচে নেমে গেছে। বিশ্বের সবচেয়ে কম বাসযোগ্য শহর হিসেবে এ বারও রয়েছে সিরিয়ার দামাস্কাস। যুদ্ধ পরিস্থিতি, রাজনৈতির টালমাটাল পরিস্থিতি এর জন্য দায়ী বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।