সিঙ্গুর–নন্দীগ্রামের পুনরাবৃত্তি নয়, শিল্পের জন্য জমি কিনে দেবে রাজ্যই, বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর
এই সময়, কলকাতা ও ডানকুনি: রাজ্যে বাম জমানায় নন্দীগ্রামে জমি আন্দোলনে পুরোভাগে ছিলেন তিনি। সেখানকার জমি-রক্ষা কমিটির তিনিই ছিলেন হোতা। সিঙ্গুর আন্দোলনেও সক্রিয় যোগদান ছিল তাঁর। সেই তিনি, শুভেন্দু অধিকারী বর্তমানে বাংলায় বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী। শনিবার তিনি ঘোষণা করলেন, রাজ্যে শিল্পের জন্য জমিজটের কারণে আর সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের মতো ঘটনা চান না তিনি। শিল্পপতিদের জমি নিয়ে মাথাব্যথা হতে দিতে চান না বর্তমান সরকার। শিল্পের জন্য যতটা জমি দরকার হবে, সেই জমি সরকারই কিনে নিয়ে তা সংশ্লিষ্ট শিল্পসংস্থার হাতে তুলে দেবে।
হুগলির ডানকুনিতে ‘লাক্স কোজি়’ সংস্থার কারখানা সম্প্রসারণের শিলান্যাস অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে এই ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, জমি অধিগ্রহণের মতো বিতর্কিত বিষয়ের জেরে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটুক, বর্তমান সরকার তা চায় না। একই সঙ্গে বড় শিল্পের খাতিরে বর্তমান সরকার জমির ঊর্ধ্বসীমা নীতির বদল করতে চায়, তা–ও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
‘লাক্স কোজ়ি’ ডানকুনিতে নতুন একটি হোসিয়ারি ইউনিট তৈরি করছে। এটিকে তারা সম্প্রসারিত ইউনিট বলছে। এই ইউনিট তৈরিতে সংস্থার তরফে ৬০০ কোটি টাকার বেশি লগ্নি করা হয়েছে। সংস্থার দাবি, এই ইউনিটে ছ’হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হওয়ার কথা। এ দিনের অনুষ্ঠানে শুভেন্দু ছাড়াও ছিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি তথা রাজ্যসভার সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য, রাজ্যের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী তাপস রায়, শ্রমমন্ত্রী অর্জুন সিং, স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়, শিল্পসচিব বন্দনা যাদব। ‘লাক্স কোজ়ি’র পক্ষ থেকে ছিলেন সংস্থার চেয়ারম্যান অশোক টোডি, ডিরেক্টর সাকেত টোডি-সহ অন্য পদাধিকারীরা।
শুভেন্দু জানান, তৃণমূল জমানার আট লক্ষ কোটি টাকার ঋণ মাথায় নিয়ে সরকারের দায়িত্ব নিতে হয়েছে। ফলে ইচ্ছে আকাশ ছোঁয়া হলেও রেস্ত অনুযায়ী পা বাড়ানো যাচ্ছে না। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘শিল্পে যে ইনসেনটিভ চালু ছিল, আগের সরকার গত দু’টি অর্থ বছরে তা বাতিল করে দিয়েছিল। আমি জানি, এই খাতে ২০ হাজার কোটি টাকার সংস্থান রাখলে ভালো হয়। কিন্তু এ বারের বাজেটে অত টাকা রাখতে পারিনি। ৫ হাজার কোটি টাকা আপাতত ওই খাতে রাখা হয়েছে।’
তবে বাংলা যে বিনিয়োগে আবার ভারত সেরা হবে, তা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন শুভেন্দু। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘অনুকূল পরিবেশ তৈরি না হলে বিনিয়োগ আসবে না। আর আইন-শৃঙ্খলা ঠিক না হলে বিনিয়োগ-অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে না। সেই দায়িত্ব বর্তমান সরকার নিচ্ছে। এখন কেউ লাক্স কোজ়ির কারখানায় এসে তোলা আদায় করবে না।’ এর পাশাপাশি জমি নিয়ে শিল্পপতিদের তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, ‘জমি নিয়ে কোনও চিন্তা আপনাদের করার দরকার নেই। জমি কোনও সমস্যা তৈরি করবে না।’ তা হলে জমি সমস্যা কী ভাবে মিটবে? তার জবাবে শুভেন্দু বলেন, ‘ঠিক যে ভাবে বিএসএফ, রেল, জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষকে সরকার জমির ব্যবস্থা করে দিচ্ছে, সেই মডেলেই এ বার শিল্পের জন্যও জমি সরকারই সরাসরি চাষিদের থেকে কিনে নেবে। তার পরে সেই জমি সংশ্লিষ্ট শিল্পসংস্থাকে হস্তান্তর করা হবে।’ অর্থাৎ শিল্পসংস্থা তাদের জমির পরিমাণ জানালে, চাষিদের কাছ থেকে সরকার তা কিনে নেবে। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়— ‘আমি চাই না, আর একটা সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম হোক।’
প্রসঙ্গত, বর্তমানে রাজ্য সরকার যদি জমি কিনতে যায়, তা হলে আইন মোতাবেক জমির মালিকরা ন্যূনতম বর্তমান বাজার মূল্য ও ১০০ শতাংশ সোলাসিয়াম পান। শহরের জমি হলে বাজার মূল্যের দ্বিগুণ এবং গ্রামের জমি হলে বাজার মূল্যের চারগুণ পর্যন্ত দাম ও পুনর্বাসন পান মালিকরা। মুখ্যমন্ত্রী ‘ল্যান্ড সিলিং’ বা জমির ঊর্ধ্বসীমা নিয়ে শিল্পপতিদের আশ্বস্ত করে বলেন, ‘ল্যান্ড সিলিং যে আইন যেটা রয়েছে (রাজ্যে), সেটা আমরা পুরোপুরি চেঞ্জ করে দেবো।’ ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা, ল্যান্ড সিলিং আইনের জন্য বাংলায় একলপ্তে বড় মাপের জমির অভাব রয়েছে। ফলে শিল্পপতিরা সরাসরি জমি কিনতে গেলে ফড়েদের কবলে পড়েন।
এ দিনের মঞ্চে শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় বলেন, ‘বাংলার স্বার্থে, এ রাজ্যের নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যতের স্বার্থে মুখ্যমন্ত্রী যদি আমাকে নির্দেশ দেন, তবে আমি রাজ্য ছেড়ে চলে যাওয়া সেই সমস্ত শিল্পপতির দোরগোড়ায় যাব। প্রয়োজনে তাঁদের হাত-পা ধরে, অনুরোধ-উপরোধ করে পুনরায় এই বাংলায় ফিরিয়ে আনার আপ্রাণ চেষ্টা করব।’ বাংলায় শিল্প যে ফিরছেই, তা জোরের সঙ্গে জানান শমীকও। নতুন সরকার শপথ নেওয়ার পরে একটি বণিকসভার অনুষ্ঠানে তিনি জানিয়েছিলেন, টাকা গোষ্ঠীকে সিঙ্গুরেই ফেরানোর উদ্যোগ নিচ্ছে রাজ্য। এ দিন তিনি বলেন, ‘আগের সরকারের আমলে কী হয়েছিল, ভুলে যান। আগের আমলে যে সব শিল্পপতি মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, বাংলার মতো বাণিজ্য–অনুকূল রাজ্য আর নেই— সে সব আমরা মনে রাখব না, সরকার মনে রাখবে না।’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘নিশ্চিত থাকুন, বাংলায় টাটা-বাটা-রিলায়েন্স-আদানি সবই আসবে। শুধু দেশিয় শিল্পপতি নয়, সিলিকন ভ্যালি, লন্ডন, মিউনিখ, এমনকী ইজ়রায়েল থেকেও অনাবাসী ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক লগ্নিকারীরা বাংলায় বিনিয়োগ করতে আসবেন। এখানে ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট আসবে।’