বসুন্ধরাকে বাঁচাতে চায় যারা, তারাই অপরাধী?
রাহুল রায়
আপনি পরিবেশকর্মী? হতেই পারে হাজতবাস। জুটতে পারে ‘দেশবিরোধী’, ‘সন্ত্রাসবাদী’র তকমা। জরিমানায় যেতে পারে ভালো রকম গাঁটগচ্চা। ফেঁসে যেতে পারেন নানা মিথ্যা মামলায়। এমনকি অপহরণ ও গুমখুনও বাদ যাবে না। বিগত ৪ জুন, ২০২৬, স্ট্রাসবুর্গ-এ রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার হাই কমিশনার ভোলকার টুর্ক-এর বক্তব্য ‘উই নিড আ স্ট্রং প্রোটেকশন সিস্টেম ফর এনভায়রনমেন্টাল হিউম্যান রাইটস্ ডিফেন্ডারস্’-এ উঠে এসেছে এমন ভয়াবহ, চাঞ্চল্যকর সমস্ত বিষয়। টুর্ক জানিয়েছেন, ২০২৩ সাল থেকে বিশ্ব জুড়ে প্রায় ৬০০ জন পরিবেশ ও ভূমিরক্ষা কর্মী খুন বা নিখোঁজ হয়েছেন। বিশ্বের ৫৫টি দেশে এঁদের আটক করে রাখার ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন দেশের সরকার শান্তিপূর্ণ পরিবেশ আন্দোলনকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে দাগিয়ে দিতে নানা আইনও চালু করছে। সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী আইনে মামলা করে এই সমস্ত পরিবেশ ও ভূমিরক্ষা আন্দোলনকারীদের বলা হচ্ছে ‘পরিবেশ-সন্ত্রাসী’।
মানবাধিকার সংগঠন গ্লোবাল উইটনেস প্রকাশিত প্রতিবেদন ‘দ্য ডিফেন্ডারস অ্যানুয়াল রিপোর্ট ২০২৫ : রুটস্ অফ রেজ়িস্ট্যান্স’ জানাচ্ছে, ২০২৪ সালে পৃথিবীতে ১৪৬ জন ভূমি ও পরিবেশরক্ষা-কর্মী খুন বা বেপাত্তা হয়েছিলেন। এর মানে প্রতি সপ্তাহে তিন জন পরিবেশকর্মী খুন বা বেপাত্তা হয়েছিলেন। এই ১৪৬ জন ভূমি ও পরিবেশরক্ষা-কর্মীর খুনের ঘটনার ৮২ শতাংশই (১১৭ জন) ঘটেছে লাতিন আমেরিকার দেশগুলিতে। এখানে স্থানীয় জনজাতি এবং ছোট চাষিরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। কলম্বিয়া-য় এই সংখ্যাটি ছিল ৪৮ জন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, পর পর তিন বছর কলম্বিয়া পরিবেশকর্মী খুনের ঘটনার শীর্ষে। গুয়াতেমালা-য় পরিবেশকর্মী খুনের ঘটনা ২০২৩ সালের ৪ জন থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ২০ জন হয়েছিল। ২০২৪ সালে শতাংশের হিসেবে ভূমি ও পরিবেশরক্ষা-কর্মীদের ১১ শতাংশ খুনের ঘটনা ঘটেছিল এশিয়া মহাদেশে (১৬ জন)। বাকি ৬ শতাংশ পরিবেশকর্মী (৯ জন) খুন হয়েছিলেন আফ্রিকায়। লাতিন আমেরিকার দেশগুলির মধ্যে মেক্সিকো-তে খুন হয়েছিলেন ১৮ জন, ব্রাজিল-এ ১২ জন। এখানে বলার, ফিলিপিন্স-এ ৭ জন এবং হন্ডুরাস ও ইন্দোনেশিয়া-তেও ৫ জন পরিবেশকর্মী খুন হয়েছিলেন। ২০২৪ সালে এক জন করে পরিবেশ কর্মী ফিলিপিনস, মেক্সিকো, হন্ডুরাস এবং চিলি-তে নিখোঁজ হন।
উল্লেখ্য, মোট ১৪৬ জন প্রতিবাদীর ৯১ জন (৬২ শতাংশ) যুক্ত ছিলেন ভূমি এবং ভূমিসংস্কার বিষয়ে।
২০১২-২০২৪, এই সময়ে প্রায় ২ হাজার ২৫৩ জন পরিবেশ ও ভূমিরক্ষা-আন্দোলনকারী নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন। শুধু ২০২৩ সালেই ১৯৬ জন পরিবেশ ও ভূমি-অধিকার রক্ষাকর্মী খুন হয়েছেন বিশ্বজুড়ে। সংখ্যার হিসেবে বিচার করলে ২০২৪ সালে এটি কিছুটা কমলেও, আবিশ্ব প্রতিবাদীদের অপরাধীর তকমা দিয়ে এবং অপহরণ করে আন্দোলন স্তব্ধ করার প্রক্রিয়া ক্রমবর্ধমান। বেআইনি বিদেশি অর্থলাভ ও দুর্নীতি সংক্রান্ত বিভিন্ন তদন্তে জড়িয়ে ফেলা হচ্ছে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে। আন্দোলনকারীদের ওপর নেমে আসছে নানা আইনি ফতোয়া। ক্রমাগত চলছে তাদের ধরপাকড়।
ভারতেও পরিবেশ কর্মীরা গ্রেপ্তারি ও হাজতবাসের মুখে পড়ছেন। তাঁদের বাড়িঘর এবং স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কার্যালয়গুলিতে তল্লাশি হচ্ছে। এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাঁরা বিদেশি তহবিল পান বলেও অভিযোগ উঠছে। দিল্লি-র নয়ডাবাসী ‘সতত সম্পদ’ স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার হরজিৎ সিং ও তাঁর স্ত্রী জ্যোতি অওস্থি ‘জীবাশ্ম জ্বালানি অপসারণ চুক্তি’-র পক্ষে কথা বলেন। এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টোরেট থেকে বিদেশি মুদ্রালাভের অভিযোগে তাঁদের জানুয়ারি ২০২৬-এ আটক করা হয়। পরে তাঁরা জামিনে ছাড়া পান। হায়দরাবাদ-এর কেবিআর জাতীয় উদ্যানে গাছ কাটার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালে ৫ জনের বিরুদ্ধে তেলঙ্গানা পুলিশ গত মে মাসে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা অনুযায়ী এফআইআর দায়ের করে আটক করে। পরে তাঁরা জামিনে ছাড়া পান। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। ২০২৫-২৬ সালে শিল্পদূষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে এবং শ্রমজীবীদের অধিকারের পক্ষে কথা বলায় দিল্লি ও তামিলনাড়ুতে বেশ কয়েকজন সমাজকর্মী ও পরিবেশকর্মীকে আটক করা হয়। এঁদের বিরুদ্ধে ‘পাবলিক অর্ডার আইন’ অনুযায়ী অভিযোগ দায়ের করা হয়। কয়েকজন আদালত থেকে ছাড়া পান।
বর্তমানে সোনম ওয়াংচুক এক পরিচিত নাম। ইনি জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ সুরক্ষা এবং লাদাখের সংবিধানিক অধিকারের দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন। আন্দোলনের মাঝেই ‘জাতীয় নিরাপত্তা আইন’-এ তাঁকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আটক করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসে উস্কানি দেবার অভিযোগ আনা হয়। ১৭০ দিন জেল খাটার পর তিনি ছাড়া পান। ২০২৪ সালে ছত্তিসগড়ের পরিবেশ ও আদিবাসী মানুষের অধিকার-রক্ষা কর্মী বিজেন্দ্র কোররাম-কে ‘দেশবিরোধী’ লেবেল সেঁটে পুলিশ আটক করে। তাঁর উপর অকথ্য পুলিশি নির্যাতন চালানো হয় বলে রাষ্ট্রপুঞ্জে অভিযোগও ওঠে। জলবায়ু কর্মী দিশা রবি গ্রেটা থুনবার্গ-এর ‘ফ্রাইডেজ় ফর ফিউচারস্ চ্যাপ্টার ইন ইন্ডিয়া’-র সহ-প্রতিষ্ঠাতা। দিশা দিল্লির কৃষক আন্দোলনকে সমর্থন করে এক ডিজিটাল ‘টুলকিট’ শেয়ার করায় ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি-তে দিল্লি পুলিশ দিশাকে রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে গ্রেপ্তার করে। দিশাকে দশ দিন তিহার জেলে কাটাতে হয়। পরে তিনি জামিনে মুক্ত হন। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, সোনম, বিজেন্দ্র ও দিশা এই তিনজনের বিরুদ্ধে অপরাধের কোনও প্রমাণই (বিচারকের আদেশনামা অনুযায়ী ‘নট ওয়ান আয়োটা অফ এভিডেন্স’) পাওয়া যায়নি।
ভারতে পরিবেশ আইন-ভঙ্গকারীদের হাতে বেশ কয়েকজন পরিবেশ কর্মীকে প্রাণ দিতে হয়েছে। যে সমস্ত পরিবেশকর্মী অবৈধ খনন, শিল্পদূষণ এবং জমি-হাঙরদের বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁদেরই খুন করা হয়েছিল। এ রকম একজন হলেন পেশায় হকার, বিহারের শশীধর মিশ্র। অবৈধ বালি খাদানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় কর্মক্ষেত্র থেকে বাড়ি ফেরার সময় ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১০ দুষ্কৃতীরা তাঁকে গুলি করে মারে। ঝাড়খণ্ডের সুরেশ ওঁরাও অবৈধ কয়লা উত্তোলন এবং স্থানীয় আদিবাসীদের উৎখাত করা নিয়ে প্রতিবাদ জানালে ২০২৫ সালে অচেনা আততায়ীদের হাতে তাঁকে বন্দুকের গুলিতে প্রাণ দিতে হয়। মধ্যপ্রদেশ এবং ছত্তিসগড়ে অবৈধ গাছ কাটার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় বেশ কয়েকজন পরিবেশ কর্মী এবং আদিবাসী নেতা কাঠ-মাফিয়াদের হাতে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে খুন হন, যদিও সংবাদমাধ্যমে এই খবর খুব একটা প্রচারিত হয়নি। মুম্বই-এর ৭২ বছর বয়সি ভূমিরক্ষা কর্মী ভূপেন্দ্র ভিরা অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় খুন হন ২০১৬ সালের ১৫ অক্টোবর। এমন উদাহরণ আরও অনেক আছে।
ভারতের ‘তথ্য অধিকার আইন’-এ নাগরিকরা সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে তথ্য জানার সুযোগ পান। কমনওয়েলথ হিউম্যান রাইটস ইনিশিয়েটিভ স্থাপিত ট্র্যাকার জানাচ্ছে, ২০০৫ সালের অক্টোবরে আইনটি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ভারতে ৭৪ জন আন্দোলনকর্মী সত্য জানতে চাওয়ার অপরাধে খুন হয়েছেন। এই মৃত্যুগুলোর মধ্যে প্রায় ৬৮টি সরাসরি হত্যাকাণ্ড, আর বাকিগুলোকে আত্মহত্যা বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে ১৬টি ঘটেছে মহারাষ্ট্রে, ১২টি গুজরাটে এবং ৮টি কর্নাটকে, আর ৬টি করে ঘটেছে বিহার ও উত্তর প্রদেশে। এ ছাড়াও, ১৬৪ জন আন্দোলনকর্মী হামলার শিকার হয়েছেন। ১৮০ জন নানা হুমকি পেয়েছেন। উল্লেখ্য, ভারতে আন্দোলনকর্মীদের সুরক্ষা দেওয়ার কোনও আইন নেই।
ভারতের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে ১৯৯৭ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত শব্দ-শহিদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি (১৬ জন)। খুনে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পুলিশ কখনওই কোন তদন্ত সঠিকভাবে চালায়নি। একটি ঘটনা ছাড়া বাকি সমস্ত ঘটনায় অভিযুক্তরা ছাড় পেয়েছেন। ২০ অক্টোবর, ২০২৫-এ চন্দননগরের স্ট্র্যান্ড-এ সবুজের অভিযান, পরিবেশ আকাদেমি সহ ৮টি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার প্রতিনিধিরা শব্দ-শহিদ তথা ভারতের বুকে যাঁরাই পরিবেশ রক্ষায় প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের উদ্দেশে শ্রদ্ধা জানিয়ে কালীপুজোর আগের রাত ‘পরিবেশ-শহিদ দিবস’ হিসেবে পালনের জন্য মানুষকে আহ্বান জানান। উল্লেখ্য, পরিবেশকর্মী নব দত্ত ১৭ অগস্ট, ২০১০ স্পঞ্জ আয়রন কারখানার দূষণের প্রতিবাদে জিতুশোলে রশ্মি সিমেন্ট কারখানায় আগুন লাগানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। পরে আদালতের নির্দেশে মুক্ত হন। জলাভূমি বোজানোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে ৬ মে, ২০১১ বালি-র তপন দত্ত খুন হন। তাঁর পরিবার এখনও এই মৃত্যুর বিচার পাননি।
ভোলকার টুর্ক বলেন যে পরিবেশ কর্মীদের অপরাধমূলক আইনে চিহ্নিত করার প্রচেষ্টা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। ২৩টি দেশের ১৬০ জন বিজ্ঞানী-কৃত প্রতিবেদন ‘গ্লোবাল টিপিং পয়েন্টস্ ২০২৫’-এ জানা গিয়েছে, উষ্ণ-জলের প্রবাল প্রাচীরের ব্যাপক ব্লিচিং ও ধ্বংসের সঙ্গে পৃথিবী তার প্রথম জলবায়ু ‘টিপিং পয়েন্ট’-এ পৌঁছেছে। মনুষ্য-কৃত উষ্ণায়নে বসুন্ধরার ৩৪টি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণের মধ্যে ২২টিতে নজিরভাঙা পরিবর্তন ঘটেছে। বিশ্বজুড়ে চলছে সুপার এল নিনো-র দাপট। পৃথিবী রেকর্ড উষ্ণতার মধ্য দিয়ে চলেছে। নির্বিচারে বনবিনাশ চলছেই। জীবাশ্ম-জ্বালানির ব্যবহারও অব্যাহত। আবিশ্ব আবহাওয়াজনিত চরম ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন মানুষ। বদলে গিয়েছে জলবায়ু। বিপন্ন হয়ে পড়েছে নানান বাস্তুতন্ত্র এবং জীববৈচিত্র্য। পরিবেশ ধ্বংস হলে কোনও দেশই বাঁচবে না। পরিবেশকর্মীরা পরিবেশের রক্ষাকবচ। জাতপাত-ধর্ম-বর্ণ-দেশ নির্বিশেষে তাঁদের লড়াই ও দায়বদ্ধতা সমস্ত পৃথিবীর পরিবেশ রক্ষার জন্য। সকল দেশের সীমারেখা মিশিয়ে একাকার করে তাঁদের লড়াই জারি, যেখানে আছে শুধু খোলা আকাশ, সুনীল জলরাশি ও সবুজ প্রান্তর। প্রকৃতপক্ষে পরিবেশকর্মীরাই বিশ্বনাগরিক। এই বিশ্বনাগরিকদের রাষ্ট্রপুঞ্জ ও পৃথিবীর রাষ্ট্রপ্রধানরা রক্ষা না করার অর্থই হলো, তাঁরা বসুন্ধরার ধ্বংসসাধনকে ত্বরান্বিত করতে চাইছেন। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা/ বিশ্ব ভরা প্রাণ’— এই বিশ্বভরা প্রাণকে বাঁচাতে তৎপর বিশ্বনাগরিকদের বাঁচানোর দায়িত্ব সকলেরই। লেখক শিক্ষক ও পরিবেশকর্মী