এ কোনও পর্যটন কেন্দ্র নয়, বরং এক নীরব জ্ঞানভূমি
পাহাড়ের পথের একটি অদ্ভুত স্বভাব আছে। মানুষ চলে যায়, কাফেলা হারিয়ে যায়, রাজ্য ভেঙে পড়ে, সীমান্ত বদলে যায়, ভাষা পরিবর্তিত হয়, এমনকি ধর্মীয় অনুশীলনের রীতিও সময়ের সঙ্গে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু পথ অপেক্ষা করে। সেই অপেক্ষার মধ্যেই জমা হতে থাকে মানুষের পদচিহ্ন, প্রার্থনা, স্মৃতি এবং অদৃশ্য কথোপকথন। নাকো মনাস্ট্রি সেই দীর্ঘ অপেক্ষারই একটি দৃশ্যমান রূপ। তার মাটির দেওয়াল, বিবর্ণ রং, প্রার্থনার পতাকা এবং শান্ত লেক যেন আজও সেইসব পথিকের সাক্ষ্য বহন করে, যারা বিশ্বাস করতেন জ্ঞান কোনও জাতির সম্পত্তি নয়, করুণা কোনও ভাষার একচেটিয়া নয়, আর সভ্যতার প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে বিনিময়ের মধ্যে।
নাকো থেকে ফিরে আসার পরে তাই মনে হয়, আমরা কোনও গুম্ফা দেখে ফিরিনি। ফিরে এসেছি এমন একটি পথ থেকে, যে পথ এখনও অদৃশ্যভাবে ভারত, কাশ্মীর, পশ্চিম তিব্বত এবং মানুষের অন্তর্জগতকে যুক্ত করে রেখেছে। সেই পথের উপর আজ আর লবণের কাফেলা চলে না, সংস্কৃত পুঁথি নিয়ে অনুবাদকও হাঁটেন না। তবু তার যাত্রা থেমে নেই। কারণ প্রতিবার কোনও মানুষ নাকোতে এসে মাটির দেওয়ালের দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকে, প্রতিবার কোনও শিশু গুম্ফায় বসে সূত্রপাঠ শেখে, প্রতিবার বাতাসে প্রার্থনার পতাকা কেঁপে ওঠে, সেই পথ আবার নতুন করে জীবিত হয়ে ওঠে।
হিমালয়ের এই ছোট্ট জনপদ তাই কেবল একটি ভ্রমণস্থল নয়। এটি একটি দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যাত্রার স্মারক, এক নীরব জ্ঞানভূমি, যেখানে পাহাড় মানুষের অহংকারকে ছোট করে, সময় মানুষের অস্থিরতাকে ধীর করে, আর ইতিহাস শেখায়-সভ্যতার সবচেয়ে স্থায়ী নির্মাণ কখনও ইট, পাথর বা সাম্রাজ্য নয়; তা মানুষের স্মৃতি, জ্ঞান, সহাবস্থান এবং করুণাবোধ। সেই কারণেই, বহু শতাব্দী পেরিয়েও নাকো মনাস্ট্রি আজও প্রাসঙ্গিক। কারণ সে অতীতকে সংরক্ষণ করে না; সে অতীতকে প্রতিদিন বাঁচিয়ে রাখে। আর সেই জীবন্ত উত্তরাধিকারের সামনে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত মনে হয়, পাহাড়ের নীরবতা আসলে নীরব নয়। তার মধ্যে এখনও উচ্চারিত হয়ে চলেছে হাজার বছরের এক অবিরাম প্রার্থনা।