যেখানে পাহাড়ের নীরবতা হাজার বছরের প্রার্থনা হয়ে ওঠে - 24 Ghanta Bangla News
Home

যেখানে পাহাড়ের নীরবতা হাজার বছরের প্রার্থনা হয়ে ওঠে

Spread the love

গুম্ফার প্রধান দরজার সামনে এসে আমি থামলাম। বাইরে নির্মম উচ্চভূমির আলো, ভিতরে শীতল অন্ধকার। কাঠের সেই দরজাটি যেন দুটি সময়ের সীমানা। এক পা এগোলেই বর্তমান থেকে অতীতে প্রবেশ করা নয়, বরং এমন এক জগতে প্রবেশ, যেখানে সময় সরলরেখায় এগোয় না; শতাব্দীগুলি পাশাপাশি বসে থাকে, আর মাটির দেওয়াল, বিবর্ণ রং ও মাখনের প্রদীপ মিলিয়ে মানুষের দীর্ঘতম স্মৃতিকে নীরবে ধারণ করে।

কাঠের সেই দরজাটি যেন দুটি সময়ের সীমানা। এক পা এগোলেই বর্তমান থেকে অতীতে প্রবেশ করা নয়, বরং এমন এক জগতে প্রবেশ, যেখানে সময় সরলরেখায় এগোয় না; শতাব্দীগুলি পাশাপাশি বসে থাকে, আর মাটির দেওয়াল, বিবর্ণ রং ও মাখনের প্রদীপ মিলিয়ে মানুষের দীর্ঘতম স্মৃতিকে নীরবে ধারণ করে।

গুম্ফার ভেতরে প্রবেশ করতেই প্রথম যে অনুভূতিটি জাগে, তা বিস্ময়ের নয়, ধীরতার। বাইরের উজ্জ্বল আলো যেন মোটা মাটির দেওয়ালে এসে কোমল হয়ে যায়। ছোট ছোট জানালা দিয়ে প্রবেশ করা সূর্যালোক ঘরের অন্ধকার দূর করে না; বরং তাকে আরও গভীর করে তোলে। সেই মৃদু আলোর মধ্যে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে দেওয়ালজুড়ে আঁকা অসংখ্য মুখ। প্রথমে তারা অস্পষ্ট, তারপর চোখ অভ্যস্ত হলে একে একে দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন বুদ্ধ, অবলোকিতেশ্বর, বজ্রপাণি, তারা, বিভিন্ন বোধিসত্ত্ব, রক্ষাকর্তা দেবতা এবং জটিল মণ্ডলের প্রতীকসমূহ। মনে হয়, দীর্ঘদিন ঘুমিয়ে থাকা কোনও প্রাচীন পুঁথির পাতা যেন ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে।

নাকো মনাস্ট্রির শিল্পকে বুঝতে গেলে প্রথমেই একটি ভুল ধারণা সরিয়ে রাখতে হয়। আমরা প্রাচীন শিল্পকে প্রায়ই নিখুঁত অবস্থায় কল্পনা করি। কিন্তু নাকোর দেওয়ালচিত্রের সৌন্দর্য তার অক্ষত থাকার মধ্যে নয়, তার ক্ষয়ের মধ্যেও বেঁচে থাকার ক্ষমতায়। কোথাও রঙের স্তর উঠে গেছে, কোথাও ধোঁয়ার আস্তরণ, কোথাও মাটির প্লাস্টারে সূক্ষ্ম ফাটল। এইসব ক্ষয়চিহ্ন মুছে ফেললে হয়তো ছবিগুলি আরও উজ্জ্বল দেখাত, কিন্তু তাদের ইতিহাস হারিয়ে যেত। সময় এখানে শিল্পীর প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; সহশিল্পী। এক সহস্রাব্দের বাতাস, প্রদীপের ধোঁয়া, ভূমিকম্প, মানুষের প্রার্থনা এবং ঋতুচক্র মিলিয়ে এই চিত্রগুলিকে নতুন এক মাত্রা দিয়েছে। ফলে নাকোর শিল্পকে শুধু চোখ দিয়ে নয়, সময়ের অনুভূতি দিয়েও পড়তে হয়।

এই দেওয়ালচিত্রগুলির শিল্পরীতি দীর্ঘদিন ধরেই শিল্প-ইতিহাসবিদদের কৌতূহলের বিষয়। মুখাবয়বের গঠন, চোখের দীর্ঘ টান, অলংকারের সূক্ষ্মতা, বস্ত্রের ভাঁজ এবং রঙের ব্যবহার বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে এগুলি কেবল তিব্বতি ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার নয়। এর মধ্যে প্রবলভাবে উপস্থিত কাশ্মীরি শিল্পধারা। একাদশ শতকে কাশ্মীর ছিল ভারতীয় বৌদ্ধ শিল্প, দর্শন এবং সংস্কৃত শিক্ষার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। রিনচেন জাংপো কাশ্মীরে দীর্ঘকাল অধ্যয়ন করেছিলেন এবং তাঁর উদ্যোগে বহু কাশ্মীরি শিল্পী পশ্চিম হিমালয়ের বিভিন্ন গুম্ফায় কাজ করতে এসেছিলেন বলে গবেষকদের একটি শক্তিশালী মত রয়েছে। নাকোর দেওয়ালচিত্র সেই সম্ভাবনার অন্যতম উজ্জ্বল সাক্ষ্য। এখানে ভারতীয় রেখা, কাশ্মীরি নন্দনচেতনা এবং তিব্বতি প্রতীকতত্ত্ব এমনভাবে মিলেছে যে তাদের আলাদা করা আর সম্ভব নয়।

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *