শহুরে চটকে অস্তিত্ব হারাচ্ছে ভাটিয়ালির সুর! সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রামে পড়ুয়া-খেতমজুরদের নিয়ে গানের কর্মশালা শ্যামলের - 24 Ghanta Bangla News
Home

শহুরে চটকে অস্তিত্ব হারাচ্ছে ভাটিয়ালির সুর! সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রামে পড়ুয়া-খেতমজুরদের নিয়ে গানের কর্মশালা শ্যামলের

Spread the love

অনিমেষ দত্ত

কথিত আছে, পূর্ববঙ্গের (অধুনা বাংলাদেশ) ‘ভাটিয়াল’ অঞ্চল ছিল নদীবহুল। সেখানে নৌকা বাইতে বাইতে মাঝিরা একক কণ্ঠে যে গান গাইতেন, তা-ই পরবর্তীতে ভাটিয়ালি গান হিসেবে পরিচিতি পায়। আবার আর একটি মতে, ‘ভাটি’ অর্থাৎ ভাটার টানে নৌকা বাইতে বাইতে মাঝিরা এই গান গাইতেন বলে এর এমন নাম। তবে নামের শিকড় যা-ই হোক না কেন, বিশেষজ্ঞদের মতে, নানা কারণে আজ ভাটিয়ালি গান হারিয়ে যাওয়ার পথে। সেই গানেরই অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নেমেছেন লোকসঙ্গীত শিল্পী এবং গবেষক শ্যামল গায়েন। তাঁর তত্ত্বাবধানে এবং ভারতের সংস্কৃতি মন্ত্রকের কালচারাল সেন্টারের (পূর্বাঞ্চল জোন) উদ্যোগে দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুন্দরবনে গোসাবা ব্লকের শম্ভুনগর গ্রামে সম্প্রতি ছ’দিনের ভাটিয়ালি কর্মশালা আয়োজন করা হলো।

নদীর কলতান, স্নিগ্ধ বায়ু এবং নিঃসঙ্গ প্রকৃতির মাঝে মাঝির একক কণ্ঠে উদাস করা টানা-টানা সুরে গাওয়া ভাটিয়ালি এক সময়ে ঢাকা, ময়মনসিংহ জেলা থেকে অভিভক্ত বাংলার দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। মূলত মাঝি-মাল্লাদের গান হলেও পরবর্তীতে ভাটিয়ালিতে আলো ছড়িয়েছিলেন আব্বাসউদ্দীন আহমেদ, আবদুল হালিম বয়াতি, শচীনদেব বর্মন, সুরেন চক্রবর্তী, অমর পাল, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, নির্মলেন্দু চৌধুরীর মতো তাবড় শিল্পীরা।

ভাটিয়ালি গানে কোনও বাঁধা তাল নেই। নৌকা বাইতে বাইতে গায়ক (মাঝি) নিজের আবেগটুকু উজাড় করে দেন। এই গানে যেমন বেদনা আছে, তেমনই আছে দেহতত্ত্ব। এ হেন গানগুলি বর্তমানে বিকৃত হয়ে চটকদারিতে পরিণত হওয়ায় ভাটিয়ালি তার নিজস্ব সত্তা এবং শিকড় হারাচ্ছে বলে মনে করেন শ্যামল। এমনকী, এখনকার মাঝিদেরও নৌকা বাইতে বাইতে ভাটিয়ালি গাইতে শোনা যায় না। এ ভাবে চলতে থাকলে ভাটিয়ালি তার অস্তিত্ব হারাবে— এই আশঙ্কা থেকেই এ ধরনের কর্মশালা আয়োজন করা হয়েছে বলে জনিয়েছেন তিনি। শুধু গান শেখানো নয়— ভাটিয়ালির ইতিহাস-ভূগোল, প্রকৃতি এবং মানুষের জীবন সংগ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক, সবটাই তুলে ধরা হয়েছে ওয়ার্কশপে।

পশ্চিমবঙ্গের যে কোনও প্রান্তেই কর্মশালাটি হতে পারত। সুন্দরবনেই কেন? এর পিছনেও রয়েছে বিশেষ তাৎপর্য। ভাটিয়ালি মূলত নদীবহুল এলাকার গান। সুন্দরবন অঞ্চলটিও নদীতে ভরপুর। এখানকার মানুষের দৈনন্দিন জীবন সংগ্রাম এবং প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কের আখ্যানগুলি ভাটিয়ালি গানের কথার সঙ্গে বহুলাংশে সাযুজ্যপূর্ণ। তাই কখনও গাছের তলায়, কখনও নদীর ধারে ঘুরে ঘুরে কর্মশালাটি চলেছে।

in the workshop
ভাটিয়ালি গানের কর্মশালায় শিশুরাও

এতে অংশ নিয়েছে শম্ভুনগর-সহ আশপাশের তিন-চারটি গ্রামের ইপ্সিতা বিশ্বাস, সৌমী গায়েন, শ্রাবন্তী বৈদ্যর মতো স্কুল পড়ুয়ারা। অংশ নিয়েছেন রাজু বিশ্বাস, নিরঞ্জন দিন্দার মতো কৃষক-খেতমজুররাও। সবমিলিয়ে ৪০-৪৫ জন। এঁরা কেউ গায়ক নন। কোনওদিন দোতারাও বাজাননি। তবু গানের টানে স্কুল শেষ হয়ে যাওয়ার পরে কিংবা খেতের কাজ সেরে প্রত্যেকদিন চার-পাঁচ ঘণ্টা শুনেছেন ভাটিয়ালির অন্তর্দর্শন। শ্যামল এবং তাঁর দুই সহযোগী কৌশিক ও সৌভিক চন্দের সঙ্গে গলা মিলিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে গেয়েছেন, ‘মাঝি বাইয়া যাও রে… অকূল দরিয়ার মাঝে, আমার ভাঙা নাও মাঝি বাইয়া যাও রে…।’

কর্মশালা প্রসঙ্গে শ্যামলের বক্তব্য, ‘আমরা মাঠেঘাটে ঘুরে, নদীর ধারে বসে গান শিখেছি। আঞ্চলিক শিল্পীদের জীবন সংগ্রাম প্রত্যক্ষ করেছি। বর্তমান প্রজন্ম শহরে ঠান্ডাঘরে বসে লোকগান শিখছে। ফলে লোকগানের সঙ্গে প্রকৃতির মেলবন্ধন বলতে আসলে কী বোঝায়— তার নির্যাস তারা পাচ্ছে না। মানুষের দুঃখকষ্টের জীবনের মধ্যে দিয়ে যে ভাটিয়ালি গান উঠে এসেছে, যে গানের কথা একে অন্যের প্রতি সমব্যথী হওয়ার পাঠ দেয়— তা নতুন প্রজন্ম বুঝতে পারছে না। ভাটিয়ালি গান এখন পণ্যায়িত হয়েছে। গানগুলির বিকৃতি ঘটেছে।’

শ্যামলের সঙ্গে একমত তাঁর শিক্ষক, প্রয়াত সুরেন চক্রবর্তীর ছেলে এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অসবরপ্রাপ্ত অধ্যাপক রঞ্জিত চক্রবর্তী। তিনি বলছেন, ‘ভাটিয়ালি মূলত গ্রাম-বাংলার গান। শহরকেন্দ্রিক হতে গিয়ে গানের অবমূল্যায়ণ হয়েছে।’ লোকসঙ্গীত বিশেষজ্ঞের ব্যাখ্যা, ‘ভাটিয়ালি গানে ছন্দ গৌন। মুখ্য হলো, টানা-টানা সুর। সেই সুর থেকে এখন অনেক জায়গায় সরে এসেছে।’ শ্যামল বলেন, ‘একটা ওয়ার্কশপ করে ভাটিয়ালি গানের অস্তিত্ব রক্ষা করা সম্ভব নয়। কিন্তু শুরুটা তো হোক। আর এটা কখনই কলকাতায় বসে সম্ভব নয়। নদীর গান, মাঝির গান বাঁচাতে গেলে ফিরতে হবে গ্রামেই।’

কর্মশালার শেষদিনে শম্ভুনগর হাইস্কুলে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে ভাটিয়ালি গান শুনিয়েছেন শ্যামল এবং তাঁর দল। কর্মশালায় অংশ নেওয়া পড়ুয়ারাও গান শুনিয়েছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন লোকসঙ্গীত শিল্পী রঞ্জিতকুমার চন্দ। কর্মশালা থেকে উৎসাহী লোকজনদের ভাটিয়ালি গান শিখিয়ে তাঁদের নিয়ে আগামীদিনে দীর্ঘমেয়াদী কাজের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছেন শ্যামল।

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *