হাফ–প্যান্ট পরিয়ে হাঁটানো হলো প্রাক্তন বিধায়ক রামেন্দুকে!
এই সময়: পুলিশের হেফাজতে থাকাকালীন বন্দিদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় সম্প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আদালত। বিচারাধীন বন্দিকে হাফ–প্যান্ট পরিয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে ঘোরানো নিয়ে রাজ্যের কাছে রিপোর্ট তলব করেছে কলকাতা হাইকোর্ট। কিন্তু আদালতের নিষেজ্ঞা উড়িয়ে তারকেশ্বরের প্রাক্তন বিধায়ক তথা তৃণমূলের আরামবাগ সাংগঠনিক জেলা সভাপতি রামেন্দু সিংহ রায়কে সোমবার হাফ–প্যান্ট পরিয়ে রাস্তায় হাঁটিয়ে ধনেখালির কোটালপুর এলাকায় তাঁরই মালিকাধীন বিএড কলেজে নিয়ে যাওয়া হলো। এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। এটাকে মানবাধিকার লঙ্ঘন বলেই মনে করছেন আইনজীবীরা।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ১১ জুন প্রশাসনের লোকেরা রামেন্দুর কলেজ লাগায়ো একটি গোডাউন থেকে সরকারি ত্রাণ সামগ্রী বের করার সময় সেখানে হাজির হন বিজেপি কর্মী–সমর্থকরা। তারপরই রামেন্দুর বিরুদ্ধে ধনেখালি থানায় অভিযোগ দায়ের হয়। তারপর থেকে পলাতক ছিলেন রামেন্দু। গত ১৯ জুন কর্নাটক থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে আনে হুগলি গ্রামীণ পুলিশের একটি বিশেষ টিম। গত ২২ জুন তাঁকে চুঁচুড়া আদালতে পেশ করে পুলিশ। ১০ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেয় আদালত। পুলিশের দাবি, ঘটনার পুনর্নির্মাণ করতেই রামেন্দু সিংহ রায়কে বিএড কলেজে নিয়ে আসা হয়। সেই সময় তাঁর পরণে ছিল হাফ–প্যান্ট ও গেঞ্জি। এর আগে ফলতার তৃণমূল নেতা জাহাঙ্গির খানকেও হাফ–প্যান্ট ও গেঞ্জি পরিয়ে রাস্তায় হাঁটানো হয়েছিল। এ দিন যখন তাঁকে বিএড কলেজের সামনে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে হাজির হন কয়েকশো বিজেপি কর্মী–সমর্থক। তাঁরা চোর চোর স্লোগান দেন। বিক্ষোভের আশঙ্কায় রামেন্দুকে ঘিরে রেখেছিল বিশাল পুলিশ বাহিনী।
রাজ্যে পালাবদলের পর থেকেই বিভিন্ন জায়গায় তৃণমূল নেতাদের লক্ষ্য করে ডিম ছুড়তে দেখা যাচ্ছে কিছু লোকজনকে। বিজেপির রাজ্য নেতারা অবশ্য প্রথম থেকেই দাবি করে আসছেন, এই ধরনের ঘটনার সঙ্গে বিজেপির কোনও যোগ নেই। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ডিম ছোড়া কখনও কোনও দলের রাজনৈতিক সংস্কৃতি হতে পারে না। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও বিধানসভায় ডিম ছোড়া থেকে মানুষজনকে বিরত থাকতে বলেছেন। তা সত্ত্বেও হাওড়ার দুটি জায়গায় তৃণমূল নেতাদের লক্ষ্য করে আবারও ডিম ছোড়ার ঘটনা ঘটেছে।
সরকারি টাকা তছরুপের অভিযোগে পাঁচলা ব্লকের গঙ্গাধরপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের তৃণমূলের প্রধান উৎপল দলপতি এবং গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য অঞ্জলি দাসকে রবিবার গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সেই সময় তাঁদের লক্ষ্য করে পরপর ডিম ছোড়া হয়। একই ভাবে এ দিন শ্যামপুর ২ নম্বর ব্লকের বাছরি গ্রাম পঞ্চায়েতের তৃণমূলের প্রধান শ্যামসুন্দর মেটিয়াকে লক্ষ্য করেও ডিম ছোড়া হয় এবং পুলিশের উপস্থিতিতেই মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। তাঁর বাড়িতেও ভাঙচুর চালানো হয়। অভিযোগের তির বিজেপির দিকে। স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের অভিযোগ, বিজেপির শ্যামপুর ৫ নম্বর মণ্ডলের সভাপতি মিহির প্রামাণিকের মদতেই শ্যামসুন্দর মেটিয়ার বাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়েছে। তাঁর গ্রেপ্তারির দাবিতে সরব হয়েছে তৃণমূল।
বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের কাজের হিসাব চেয়ে গত রবিবার পাঁচলার গঙ্গাধরপুর গ্রাম পঞ্চায়েতে হাজির হন বিজেপি কর্মী–সমর্থকরা। সেই সময় পঞ্চায়েতে হাজির ছিলে অঞ্চল প্রধান উৎপল দলপতি এবং পঞ্চায়েত সদস্য অঞ্জলি দাস। স্থানীয় বিজেপি নেতাদের দাবি, কাজের সঠিক হিসেব দিতে না পারায় স্থানীয় মানুষরা পঞ্চায়েত অফিসে বিক্ষোভ দেখান। সেই খবর পেয়ে পুলিশ এসে দু’জনকে পঞ্চায়েত অফিস থেকে উদ্ধার নিয়ে যায়। সেই সময় তাঁদের লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া হয়। রবিবার রাতে পুলিশ তাঁদেরকে গ্রেপ্তার করে।
পাঁচলা বিধানসভার বিজেপির পরাজিত প্রার্থী রঞ্জন পালের দাবি, ‘বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের টাকা তছরুপের অভিযোগ রয়েছে ধৃতদের বিরুদ্ধে। রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদল ঘটায় সাধারণ মানুষ এখন মুখ খুলতে শুরু করেছেন।’
শ্যামপুরের বাছরি গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান শ্যামসুন্দর মেটিয়ার বিরুদ্ধে আবার সেচ দপ্তরের জমিতে দোকান বসিয়ে টাকা তোলা, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে কাটমানি নেওয়া এবং টাকা তছরূপের অভিযোগ করেছে বিজেপি। তারই প্রতিবাদে এ দিন সকালে শ্যামসুন্দর মেটিয়ার বাড়ির সামনে কয়েকশো মানুষ জড়ো হন। শ্যামসুন্দর তখন নিজের বাড়িতেই ছিলেন। খবর পেয়ে শ্যামপুর থানার পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। শ্যামসুন্দর মেটিয়াকে বাড়ি থেকে বের করার সময় তাঁকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া হয়।
বিজেপির শ্যামপুর ৫ নম্বর মণ্ডলের সভাপতি মিহির প্রামাণিক বলেন, শ্যামসুন্দর মেটিয়া বিভিন্ন জায়গায় বলে বেড়িয়েছেন, আমাকে টাকা দিয়ে উনি নাকি রফা করে নিয়েছেন। এ বিষয়ে খোঁজ নিতে সোমবার তাঁর বাড়িতে দেখা করতে গিয়েছিলাম। অঞ্চল প্রধানকে মারধর ও বাড়ি ভাঙচুরের সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্ক নেই। সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন।’ শ্যামপুর থানা সূত্রে জানা গিয়েছে, সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনও অভিযোগ জমা পড়েনি। তবে দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ দেওয়া হবে বলে থানায় জানানো হয়েছে। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হাওড়া গ্রামীণ জেলা পুলিশের এক আধিকারিক জানিয়েছেন।