কারখানার অবৈধ সম্প্রসারণে জামুড়িয়ায় ‘তারাতলা-আতঙ্ক’
বিশ্বদেব ভট্টাচার্য, আসানসোল
জামুড়িয়ার একাধিক কারখানায় সম্প্রসারণের কাজ হয়েছে আসানসোল পুরসভার অনুমতি ছাড়াই। কলকাতার তারাতলায় সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার পরে জামুড়িয়ার একাধিক লৌহ-ইস্পাত কারখানার বেআইনি নির্মাণ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। পুর এলাকার বাসিন্দারা তো বটেই, পুরসভার চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে শ্রমিক নেতা— সবার মনেই এখন আশঙ্কা এই নিয়ে।
অভিযোগ, জামুড়িয়ায় বাম আমলে গড়ে ওঠা বেশ কিছু লোহা, ইস্পাত ও বিদ্যুৎ কারখানায় তৃণমূল জমানায় পুরসভার অনুমতি ছাড়াই বড় ধরনের সম্প্রসারণ করা হয়েছে। লোহার স্ট্রাকচার দিয়ে বিশালাকার শেড তৈরি থেকে শুরু করে কংক্রিটের ঘর বানিয়ে বসানো হয়েছে ভারী মেশিন।
পুরসভার এক আইনজীবী জানান, জামুড়িয়ার একটি বড় ইস্পাত কারখানায় প্রায় ৩৭ হাজার বর্গফুট জুড়ে কংক্রিটের নির্মাণ এবং শেড তৈরি করা হয়েছে বেআইনি ভাবে। এর জন্য পুরসভা ৯০ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ ধার্য করেছিল। এই ধরনের বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে পুরসভা পদক্ষেপ করতে গেলে বার বার বাধা এসেছে। গত দু’বছরে জামুড়িয়ার ডজন খানেক এবং রানিগঞ্জের একটি কারখানায় নোটিস পাঠানো হলেও, বুলডোজ়ার নিয়ে গিয়েও শেষ পর্যন্ত কোনও না কোনও কারণে পিছু হটতে হয়েছে পুর কর্তৃপক্ষকে।
২০২৩–এর পুর আইন অনুযায়ী, বেআইনি নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রতি বর্গফুট হিসেবে জরিমানা দিয়ে তা বৈধ করার ব্যবস্থা রয়েছে। সেই সূত্র ধরে কোটি কোটি টাকা জরিমানা ধার্য করা হলেও কারখানা কর্তৃপক্ষ নামমাত্র টাকা জমা দিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করছেন। যেমন, যার ৬৮ কোটি টাকা জরিমানা হয়েছে সে হয়তো ২০ লক্ষ টাকা জমা দিয়েছে, আবার যার ৯০ কোটি টাকা জরিমানা হওয়ার কথা সে-ও মাত্র ২০ লক্ষ টাকা জমা দিয়ে দায় সেরেছে। অনেকে আবার আদালতের দ্বারস্থও হয়েছেন। এখানে এ নিয়ে শ্রমিক নেতা মনোজ দত্তর প্রশ্ন, ‘অবৈধ নির্মাণের পর জরিমানা দিলেই কি তা আইনগত হয়ে যায়? সেখানে কি দুর্ঘটনা ঘটবে না?’
আসানসোলের মেয়র বিধান উপাধ্যায় একসময় জানিয়েছিলেন, সব জরিমানা ঠিকমতো আদায় হলে পুরসভার প্রায় ৩০০ কোটি টাকা রাজস্ব আসত। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি হলো, দু’বছর কেটে গেলেও এই কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে বড় কোনও পদক্ষেপ করা যায়নি।
এ প্রসঙ্গে আসানসোল পুরসভার চেয়ারম্যান অমর চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘এই ধরনের কোনও অভিযোগের শুনানির সময়ে সেই এলাকার কাউন্সিলারের উপস্থিত থাকা উচিত। বহু ক্ষেত্রেই তাঁদের ডাকা হয় না। কয়েকটি বহুতল এবং একাধিক কারখানা অনুমতি ছাড়া সম্প্রসারণ বা নির্মাণ নিয়ে নানা ধরনের অভিযোগ জমা পড়েছে। তার তদন্ত হচ্ছে বলে শুনেছি।’
জামুড়িয়ার লৌহ ও ইস্পাত শিল্প কারখানাগুলোর মালিক সংগঠনের পক্ষে পবন মামুন্ডিয়া বলেন, ‘বাম আমলে এই কারখানাগুলো তৈরি হলেও পরে কিছুটা সম্প্রসারণ হয়েছে এবং জিতেন্দ্র তিওয়ারি মেয়র থাকাকালীন হোল্ডিং ট্যাক্সেরও ব্যবস্থা করা হয়। এর পরে বিধান উপাধ্যায় এসেই নতুন করে মাপজোক শুরু করেন। কিছু কারখানা ইতিমধ্যেই জরিমানা বাবদ কিছু টাকা দিয়েছে। আমরা চাই কারখানাগুলো অবৈধ ভাৈবে সম্প্রসারণ করে থাকলে পুর–আইন মেনে সমস্যা মিটিয়ে ফেলা হোক। দুর্ঘটনা ঘটলে কারখানাই দায়ী থাকবে।’
বেআইনি সম্প্রসারণ প্রসঙ্গে আসানসোল পুরসভার এক অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার জানান, বহু ক্ষেত্রেই নোটিস দিয়েছে পুরসভা। তদন্ত হচ্ছে। শুক্রবার একটি বৈঠকে পুরসভা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ১০টি বরো এলাকার জন্য পৃথক ইঞ্জিনিয়ারদের নিয়ে টিম তৈরি করা হবে। কারখানা হোক বা বহুতল— বেআইনি নির্মাণের অভিযোগ পেলেই তদন্ত করে দেখবেন তাঁরা।
রাজনৈতিক মহলের মতে, ভোটের আগে বিজেপি নেতারা যেখানে সমস্ত রকমের বেআইনি কাজকর্ম বন্ধের আশ্বাস দিয়েছিলেন, সেখানে এখন রাজ্য সরকারের পরিবর্তনের পর এই বেআইনি কার্যকলাপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি আরও জোরালো হচ্ছে।