বুদ্ধজন্মের প্রতি মোহ - 24 Ghanta Bangla News
Home

বুদ্ধজন্মের প্রতি মোহ

Spread the love

অনিন্দ্য সরকার

“অমিতাভ মুখোপাধ্যায়। রোল নাম্বার থার্টিন। অমিতাভ! আবার জানালার বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। সব সময় কী যে ভাবে ছেলেটা! অ্যাই অমিতাভ!”

কী ভাবে ছেলেটা? ক্লাসরুমের শেষ বেঞ্চে বসে এক মনে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। ম্যাডামের চিৎকার, বন্ধুদের ফিসফিসানি কিছুই যেন তাকে স্পর্শ করছে না। অথচ ওই দূরে গাছের মধ্যে অবিশ্রান্ত ডেকে চলা কোকিলের ডাক সে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। ভালো করে কোকিলটিকে দেখার চেষ্টা করলো সে। কচি পাতার আড়ালে কোথায় যে লুকিয়ে আছে খুঁজে পেল না।

অথচ ওই ডাকের কী অমোঘ টান! বুক হু হু করে ওঠে। কাকে এমন প্রাণপণ ডাকছে কোকিলটি, এ সবই কি ভাবছে ছেলেটা? নাকি ওই ডাক তাকে নিয়ে যাচ্ছে অনেক দূরে.. গত জন্মে, তারও আগে।

(২)

আমি অমিতাভ। কিছুক্ষণ আগেই ম্যাডাম আমাকে বকলেন। ক্লাসরুমের পড়ায় আমার মন ছিল না। সব সময় এরকম হয় না। কিন্তু কোকিলের ওই মন কেমন করা ডাক! আমি স্থির থাকতে পারি নি। আমার মন চলে গিয়েছিল তার কাছে। সারাক্ষণ তো তাকেই খুঁজে বেড়াই। কাকে? জন্ম জন্ম ধরে পাওয়া হলো না যাকে। আমি জাতিস্মর। পূর্বজন্মের স্মৃতি এখনও আমার মনে ভেসে ভেসে বেড়ায়। বাবা, মা, দিদি বলে এসব নাকি আমার মনের ভুল। আমি খুব কল্পনাপ্রবণ, তাই এসব ভাবি। কিন্তু আমি তো জানি এসব ভুল নয়। কবে কোন জন্মে আমি কে ছিলাম, সব জানি। কেনই বা এ জন্ম তাও জানি। তাকে না পেলে যে এ জন্মও বৃথা।

(৩)

দু’হাত পর্যন্ত সময়, দু’পা পর্যন্ত এ জন্ম। অথচ চোখ বন্ধ করলেই অনন্ত। চোখের সামনে ভেসে ওঠে কত দৃশ্য, কত ঘটনা, কত মানুষ। সবাইকে চিনি না আমি। তবুও কী এক অদৃশ্য টানে জড়িয়ে রয়েছি তাদের সাথে। আর সেই মানুষটা! তাকেই তো সব সময় খুঁজে বেড়াই। তার ছোঁয়ায় মুছে যায় জরা, ধুয়ে যায় আজন্মের শোক। তার শান্ত হাসির আভায় নেমে যায় একাকীত্ব ভার, খুলে যায় মোহনাগপাশ। তার হাতের মুদ্রায় গড়িয়ে পড়া জ্যোৎস্না স্নান করিয়ে ত্রাণমন্ত্র দেয়। এক আকাশের নীচে, এক পৃথিবীর বুকে ভূমিস্পর্শ করে কেটে গেলো দুটো জন্ম, তবুও তার সাথে দেখা হলো না।

(৪)

আমি সুজাতাপুত্র। এই আমার প্রথম জন্ম। নৈরঞ্জনা নদীর এক পাড়ে প্রাচীন জনপদ। নাম উরুবিল্ব। সেই গ্রামের মোড়লের মেয়ে সুজাতা। ভালো অবস্থাপন্ন ঘরে বিয়ে হয়েছে তার। বাপের বাড়ি আর শ্বশুরবাড়ি মিলিয়ে ভরা সংসার। তবুও তার মনে এক গোপন ব্যথা। বিয়ের অনেক বছর হয়ে গেল, কিন্তু তার কোনো সন্তান হল না। সুজাতার মনে ভয় হয়েছিল যে তাকে কেউ বাঁজা অপবাদ না দেয়। যদিও কেউ তাকে কিছু বলে না বা অবহেলা করে না, তবুও গ্রামশুদ্ধ লোকের প্রশ্ন, উদ্বেগ, সান্ত্বনা তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।

সেই সময় নৈরঞ্জনা নদীর অন্য পাড়ে বিজন বনপ্রান্তে এসে দাঁড়ালেন এক সন্ন্যাসী। পরনে গৈরিক চীবর। মাথার উপর চুল চূড়া করে বাঁধা। মহাকায় অশ্বত্থ গাছের তলায় তিনি ধ্যানে বসলেন।

পুত্র লাভের আকাঙ্ক্ষায় সুজাতা চলেছে সেই সন্ন্যাসীর কাছে। নদীর কাছে যখন পৌঁছল সুজাতা, তখন সূর্য এসে বসেছে দিগন্তরেখায়। নদীর বুকে রক্তিম আভা। গা ভরতি সোনার পাতার কাঁকন পরে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই মহাকায় অশ্বত্থ গাছ। তার তলায় গহন ধ্যানে সমাহিত সেই সোনার বরণ সন্ন্যাসী। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে থাকে সুজাতা। ঝিরঝির করে কেঁপে ওঠে অশ্বত্থ গাছের পাতা। হু হু বাতাস তার পুত্রাকাঙ্খী মনে আলোড়ন সৃষ্টি করে। মাটির পাত্রে উষ্ণ পরমান্ন, কুশাসন ও বনকুসুমের মালা দিয়ে সন্ন্যাসীকে পূজা নিবেদন করলো সে। মনে মনে প্রার্থনা করলো ‘হে বনদেবতা মুখ তুলে চাও। পুত্র সন্তান দাও।’

তারপরেই আমার জন্ম। ততদিনে সন্ন্যাসী চলে গিয়েছেন উরুবিল্ব থেকে কাশীপত্তনের দিকে। জ্ঞান হওয়ার পর মায়ের মুখে শুনি সেই বনদেবতার গল্প। মায়ের বিশ্বাস তার আশীর্বাদেই আমার জন্ম। পরে জেনেছিলাম তিনি ভগবান বুদ্ধ। তারপরেই তার পায়ে নিজেকে সঁপে দেওয়ার বাসনা নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ি। মাতা সুজাতা আমাকে বাধা দেন নি। উরুবিল্ব থেকে কাশীপত্তন, মৃগদাব হয়ে মগধে এসে পৌঁছোই। কিন্তু হায়, তাকে দেখার আগেই যে এ জন্ম ফুরিয়ে যায়।

(৫)

আমি নালক। আমার দ্বিতীয় জন্ম। আমি আবার জন্ম নিই এক কুটিরে। পাশে অন্ধকার বর্ধনের বন। সেই বনের ভেতর এক বটগাছের তলায় দেবলঋষির মুখে শুনি ভগবান বুদ্ধের কথা। মনে পড়ে যায় অতীত, গতজন্ম। আমি জাতিস্মর বরপ্রাপ্ত হই। গতজন্মে তাকে দেখতে না পাওয়ার বেদনা এ জন্মে এসে জাগে। তাকে দেখবো বলে দেবলঋষির সাথে আবার বেরিয়ে পড়ি। যেতে যেতে শুনি তার বোধিলাভের গল্প। শুনি গতজন্মের মাতা সুজাতার দেওয়া পরমান্নের কথাও। কী এক প্রসন্নতায় বুক ভরে ওঠে!

দেবলঋষির সাথে ঘুরে ঘুরে বছরের পর বছর কেটে যায়। তিনিও ঘুরে বেড়ান সারা দেশে। ধর্মপ্রচার করেন, সঙ্ঘ স্থাপন করেন। কত রাজা তার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে। কত পাপী-তাপী মানুষ তার দর্শন পেয়ে ধন্য হয়ে যায়। কিন্তু তার সাথে আমার দেখা হয় না। দেবলঋষি বলেন, সময় হলেই তিনি আসবেন। ঘুরতে ঘুরতে এক সময় আমরা তপোবনে এসে উপস্থিত হই।

তপোবনের ছায়ায় বর্ধনের বনের কথা মনে পড়ে। হঠাৎ এতোদিন পর বাড়ির জন্য মন কেমন করে। দেবলঋষি কিছুদিনের জন্য আমাকে বাড়িতে যেতে বললেন। আমি সারাদিন বরুণা নদীর ধারে বসে ভাবি যাই কি না-যাই। সন্ধ্যা হয়ে আসে। শেষ নৌকাটি বুকে পিদিম জ্বালিয়ে ঘাটে এসে লাগে। ‘যাবে গো?’ বলে মাঝি ডাক দেয়। আমি না বলতে পারি না। সেই নৌকায় চড়ে দেশের পথে যেতে যেতে ভাবি কত বছর বাড়ি ফেরা হয় নি!

ঠিক তার পরের দিন বরুণার খেয়াঘাট পার করে তথাগত বুদ্ধ সারনাথের তপোবনে এলেন। আমি তাকে দেখতে পেলাম না। এ জন্মেও তার সাথে আমার আর দেখা হলো না। আর একদিন যদি থেকে যেতাম!

শুধু আসার আগে খেয়াঘাটে যে ফুলটি আমি ভাসিয়ে দিয়ে এসেছিলাম, ভগবান বুদ্ধ তার করুণ করে সেই ফুলটি তুলে নিলেন। কেউ তা দেখতে পেলো না।

(৬)

তারপরেও আরও কত শত শত জন্ম কেটে গেলো এভাবেই। নৈরঞ্জনা দিয়ে বয়ে গেলো কত জল। দিন বদলে গেলো, সভ্যতা বদলে গেলো। তবুও আমার খোঁজা শেষ হলো না। তাকে খুঁজেছি বন থেকে বনে, দেশ থেকে দেশে, জন্ম থেকে জন্মান্তরে। শুধু তার দেখা পাই নি বলেই আবার এই জন্ম। আমি অমিতাভ। এই আমার বর্তমান জন্ম। সেই কত শত জন্মের পর এই জন্ম। তবুও আমি কিছু ভুলি নি। এ জন্মেও তো শুধু তাকেই খুঁজে বেড়াই। তাকে খুঁজেই কেটে যাবে আরও কত জন্ম। বুদ্ধজন্মের প্রতি এই মোহে আমি বারবার জন্ম নেবো। বুদ্ধজন্মের আগে ভগবান বুদ্ধ যেমন কত শত জাতকজন্ম পেরিয়ে এসেছিলেন, তেমনই আমার এইসব জন্ম। কোনো এক জন্মে ঠিক তার দেখা পাবো। তাকে না পাওয়া পর্যন্ত যে আমার মুক্তি নেই। পথ নেই আর কোনও।

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *