মারাদোনা আউট, ছানার পায়েস ও বিশ্বকাপ-ডেস্ক - 24 Ghanta Bangla News
Home

মারাদোনা আউট, ছানার পায়েস ও বিশ্বকাপ-ডেস্ক

Spread the love

হীরক বন্দ্যোপাধ্যায়

দিয়েগো মারাদোনা, ডেভিড বেকহ্যাম, রবার্তো বাজ্জিও, রবের্তো কার্লোস, সুনীল মহাপাত্র।

পঞ্চম নামটির সুবাদে পাঠকের মনে সঙ্গত ভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, এটা কি কোনও হেঁয়ালি? নাকি ‘অডম্যান’-কে বেছে নেওয়ার সহজতম পরীক্ষা?

দুটোর কোনওটাই না, খুব সচেতন ভাবেই নামটা লেখা। কারণ সুনীলদা ছাড়া আমাদের বিশ্বকাপ উদযাপন সম্পূর্ণ হ’ত না।

পরণে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ঘরানার, ধবধবে সাদা পরিপাটি ধুতি-শার্ট, মুখে পান এবং আন্তরিক হাসি সুনীলদা ছিলেন আমাদের সাপোর্ট-স্টাফ। যখনকার কথা বলছি, সেই নব্বইয়ের দশকে, তিনি অবসরের প্রায় দোরগোড়ায়, কিন্তু ছিপছিপে ফিট চেহারায় সদা অ্যাকটিভ। আমার দেখা পাঁড় মোহনবাগান সমর্থকদের মধ্যে সৌম্যদার (সাংবাদিক সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়, একদা আমার সহকর্মী) সঙ্গে অবশ্যই যুগ্মজয়ী হবেন সুনীলদাও। এবং কলকাতা লিগ, শিল্ড, ডুরান্ড কাপ ছাপিয়ে সুনীলদার গভীর আগ্রহ ছিল বিশ্ব ফুটবলেও। ফলে তাঁকে ছাড়া যে বিশ্বকাপ-ডেস্ক যে সম্পূর্ণতা পাবে না, তাতে আমাদের কোনও সংশয় ছিল না। সুনীলদা না থাকলে কে-ই বা ঘড়ির কাঁটা ধরে জোগান দেবে পেটপুজোর উপচারের।

শারদোৎসব ছাড়া যদি অন্য কোনও সমারোহ বাঙালির আবেগকে সবচেয়ে বেশি আলোড়িত ও উদ্দীপিত করে থাকে, সেটা বিশ্বকাপ ফুটবল। লাতিন আমেরিকার যে দু’টি দেশের কথা দৈনন্দিন জীবনে সচরাচর আমাদের মাথাতেই থাকে না, চার বছর অন্তর পাড়াগুলো সেই আর্জেন্তিনা-ব্রাজিলে ভাগ হয়ে যায়, গোটা তল্লাট মুড়ে যায় নীল-সাদা আর হলুদ-সবুজে। খবরের কাগজের খেলার পাতারই শুধু দখল নিয়ে নেয় না, বিশ্বকাপময় ফ্রন্ট পেজও বাংলা কাগজের প্রায় চার দশকের ট্র্যাডিশন। ছিয়াশির মেক্সিকোয় মারাদোনা ম্যাজিক বিশ্বকাপ নিয়ে বাঙালি পাঠকের সামগ্রিক আগ্রহ-উদ্দীপনা এক ধাক্কায় অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছিল।

ক্লাস এইটে পড়ি তখন, ১৯৭৮-এ বিশ্বকাপের সঙ্গে আমার প্রথম চাক্ষুষ পরিচয়। ঝাপসা সাদা-কালোয় মারিও কেম্পেজ, দানিয়েল পাসারেল্লাদের চিনলাম, চ্যাম্পিয়ন হল আর্জেন্তিনা। লাইভ নয় কিন্তু, ‘ধনী’ এক প্রতিবেশীর বাড়ির বৈঠকখানায় আমরা বন্ধুরা দল বেঁধে অপার বিস্ময়ে দেখেছিলাম ‘রেকর্ডেড’ ম্যাচ, ফাইনালের দিন তিনেক পরে। চার বছর পরে এসপানা-এইট্টিটু-তেও লাইভ খেলা দেখানো হয়েছিল মাত্র তিনটি—দুটো সেমিফাইনাল আর ফাইনাল। ফ্রান্স-জার্মানি সেমিফাইনালের মীমাংসা হয়েছিল একস্ট্রা টাইম, টাইব্রেকার পেরিয়ে। ফ্রান্স শেষ পর্যন্ত পারল না। ম্যাচ শেষে পরাজিত নায়ক মিশেল প্লাতিনি তখন জার্সি দিয়ে চোখের জল মুছছেন, আমাদের এখানে তখন ভোর হয় হয়। আক্ষরিক অর্থে রাত জেগে বাঙালির ফুটবল-বিলাসের সেটাই সূচনা। তবে চার বছর পরের বিশ্বকাপে মাতামাতির পারদ চড়ল অনেক গুণ। তার প্রধান দুটো কারণ।

এক, লাইভ ম্যাচের সম্প্রচার অনেকটাই বেড়েছিল দূরদর্শনে। বাড়িতে বাড়িতে ছাদের অ্যান্টেনা মেরামতির সে কী ধুম। যারা বুস্টার লাগিয়েছিলেন, তাঁরা আরও ঝকঝকে খেলা দেখেছিলেন বাংলাদেশ টিভির সৌজন্যে।

দুই, আইকন হিসেবে মারাদোনার উত্থান। আমরা পেলে, গ্যারিঞ্চা, পুসকাস বা ইয়াসিনকে দেখিনি। দিয়েগো মারাদোনা আমাদের মন্ত্রমুগ্ধ করেছিল। লালকার্ড দেখার কারণে বিরাশির বিশ্বকাপ দিয়েগোকে চেনায়নি। তাঁর জাত চিনিয়েছিল ছিয়াশি। ব্রাজিলের পাশাপাশি আর্জেন্তিনার জন্য তল্লাটে তল্লাটে পাগলামোর শুরু মূলত সেই বছরেই। এবং খবরের কাগজ আরও বিশ্বকাপময়। বাঙালি রাতে খেলা দেখছে, আর সকালে কাগজের উপরে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। যে যুগে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নেই, শর্ট ভিডিয়ো বা রিলস্ নেই— ম্যাচের বিশ্লেষণ ও বাড়তি তথ্য, ড্রেসিংরুম স্টোরি জানার এক এবং একমাত্র জানলা তো সংবাদপত্রই।

এই আবহে চার বছর পরে ‘বিশ্বকাপ স্কোয়াডে’ আমার অন্তর্ভুক্তি। ছিয়াশির বিশ্বকাপের ঠিক এক বছর পরে শিক্ষানবিশ সাংবাদিক হিসেবে আমার কাজে যোগদান। তাই প্রথম সুযোগ এল ১৯৯০ সালে, যে বিশ্বকাপে রজার মিল্লাদের ক্যামেরুন দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দিল, রিজার্ভ বেঞ্চে বসে থাকা দিয়ে শুরু করে ইতালিয়ান স্ট্রাইকার স্কিলাচি তাক লাগিয়ে দিলেন ছয় গোলে টুর্নামেন্ট শেষ করে, আর্জেন্তিনা টিমকে কার্যত একা ঘাড়ে করে ফাইনাল পর্যন্ত টানলেন দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনা।

যতদূর মনে পড়ে সে বার বিশ্বকাপ শুরুর সপ্তাহ খানেক আগে আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আমি এক মাস স্পোর্টস ডিপার্টমেন্টের ‘ওয়ার্ল্ড কাপ ডেস্ক’-এ কাজ করতে উৎসাহী কিনা। বিশ্ব ফুটবল নিয়ে প্রবল উৎসাহী আমি সঙ্গে সঙ্গে বলেছিলাম, নিশ্চয়। নিউজ় ডেস্কের প্রাত্যহিক কাজ থেকে বিরতি নেওয়ার এমন সুযোগ হারাবো কেন?

সেই সময়ে স্পোর্টস ডিপার্টমেন্টের জন্য যে ঘরটি বরাদ্দ ছিল, সেটি আকারে আয়তনে মোটেই বড় নয়। খুব হাত পা ছড়িয়ে কাজ করার অবকাশ তেমন ছিল না। যেতাম বিকেলে, থাকতাম মধ্যরাত, কোনও কোনও দিন শেষ রাত পর্যন্ত। একের পর এক ছোট বড় স্টোরি লেখা, ছবি বাছা, পেজ মেকআপ, বিশেষজ্ঞদের ম্যাচ-বিশ্লেষণের অনুলিখনের পাশাপাশি হাসি-আড্ডা-গল্প। উপভোগ করেছি বলেই বোধহয় আমার কাজ সন্তুষ্ট করেছিল সিনিয়রদের, যার স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৯৪-এর বিশ্বকাপেও আমার ডাক পড়ল, যদিও ততদিনে ডেস্ক থেকে রিপোর্টিং-এ আমার স্থানান্তর হয়েছে।

’৯৪-এর বিশ্বকাপ যাঁরা দেখেছেন, তাঁদের কারও স্মৃতিতে সবচেয়ে উজ্জ্বল রোমারিওর গোল্ডেন বল জেতা আর দোসর বেবেতোর গোল দেওয়ার পরে রক-দ্য-বেবি নাচ। কেউ হয়তো বলবেন সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত পাসাডেনায় রবার্তো বাজ্জিওর পেনাল্টি মিস। আমার কাছে অবশ্য সেবারের বিশ্বকাপ জৌলুস হারিয়েছিল মাঝপথেই। বিকেলে অফিসে আসার পথে বাস থেকেই কানে এল হকারের চিৎকার। সেই সময়ে ট্যাবলয়েড আকারের একটা সান্ধ্য কাগজ বেরোত। বিক্রেতা চিৎকার করছেন, ‘বিশ্বকাপ থেকে মারাদোনা আউট।’ অফিস এসে কাজের মধ্যেও বিষণ্ণতাকে তাড়াতে পারছিলাম না। সন্ধেবেলা সুনীলদা বললেন, ‘মন খারাপ করে আর কী হবে? নিন, ছানার পায়েস খান।’

ভাববেন না মন ভালো করতে সেদিন সুনীলদা কোনও স্পেশাল অ্যারেঞ্জমেন্ট করেছিলেন। প্রতি সন্ধ্যায় ও রাতে নানাবিধ আহার সামগ্রীর আয়োজন ছিল বিশ্বকাপ ডেস্কের বিশেষত্ব। চার বছর অন্তর অন্তর মাসাধিক কালের ফুড-বিল স্যাংশান্ড হত নিয়ম করে। বলা যেতে পারে, এটা ছিল বিশ্বকাপ ডেস্কের বিশেষ প্রিভিলেজ। সন্ধেবেলা একবার রোল বা কচুরি বা মুড়ি-তেলেভাজা এনে দেওয়ার পরে নৈশাহারের বন্দোবস্ত মোগলাই বা চাইনিজ সহযোগে। সঙ্গে মিষ্টি তো আছেই। বাকিরা সকালে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নানা রকম অর্ডার দিলেও রূপায়নের (ভট্টাচার্য) অলটাইম ফেবারিট ছিল আমেরিকান চপসুই আর গাঙ্গুরামের ইন্দ্রাণী।

আমাদের মিষ্টিমুখ করানোর জন্য অবশ্যই সুভাষ ভৌমিক, শিশির ঘোষদের আন্তরিকতাও ভোলার নয়। রাতে ম্যাচ, অফিসে বসেই টিভিতে দেখে সেই খেলার বিশ্লেষণ করবেন সুভাষদা। খেলা চলাচালীনই পয়েন্টস্ বলতে থাকবেন, আমাদের কেউ শুনে সেটা একটু সাজিয়ে গুছিয়ে দেবেন। আমাদের জন্য নিয়ে এসেছেন এক হাঁড়ি রসগোল্লা, এমন প্রায়ই হয়েছে।

আর শিশিরের কাছে আবদার করেছিলাম আমি নিজেই। বিশেষণ হিসেবে ও ভীষণ উত্তেজিত সেবার চিলির জামোরানো আর সালাসকে নিয়ে (১৯৯৮) আমি বললাম, শুধু সালাসদের সাবাস দিলেই হবে? ‘ফ্যালা ময়রার’ গজা কোথায়?

শিশিরের বাড়ি রিষড়ায়। পারিবারিক সূত্রে যে জায়গাটির সঙ্গে আমার আশৈশব পরিচয়। সেই সূত্রে ফেলু মোদকের মিষ্টির উৎকর্ষের সঙ্গেও। এক কথায় রাজি হয়ে সকালের জন্য গজা এনেছিল পরের দিন।

ওঁরা অফিসে এসে খেলা দেখে ম্যাচ-অ্যানালিসিস প্রেফার করলেও, চুনীদা (গোস্বামী) অবশ্য অন্য মেজাজের মানুষ ছিলেন। বলে দিতেন, ‘খেলার হাফ টাইমে আর শেষে আমাকে ফোন করবি। পয়েন্টস দিয়ে দেব।’ বিষয়টা যতটা সহজ শোনালো, ততটা সহজ অবশ্য ছিল না। যার অ্যাসাইনমেন্ট থাকত চুনীদার থেকে লেখা জোগাড় করবে, তার কালঘাম ছুটে যেত প্রায়শই। ম্যাচের শেষে ফোন করা হল। উনি বললেন, ‘একটা মুশকিল হয়েছে রে। খেলার সময়টাই আমার পাড়ায় লোডশেডিং হয়েছিল। দেখতেই পারিনি খেলা।’

অতএব? চুনীদার হয়েই লিখে দেবে রিপোর্টারদের কেউ। কারণ খবরের কাগজে বিশ্বকাপ-ম্যাচের বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে নামে সত্যিই আসে যায়। এবং ঐতিহাসিক ভাবেই এই পরম্পরা প্রবহমান। তাই আগ্রহ আমাদের। আর যাঁরা চুনীদাকে চিনতেন, তাঁরা জানেন তিনিও ‘চলো নিয়মমতে’র কঠোর অনুশাসনে বন্দি থাকার বান্দা নন।

পরবর্তী জীবনে ‘চলো নিয়মমতে’-কে অগ্রাহ্য করা এক নারীর প্রসঙ্গ আনছি আমার বিশ্বকাপ-কাহিনির পরিশিষ্টে। পাঠকের মনে হতেই পারে, কেন? কীসের সংযোগ?

১৯৯৪-এর বিশ্বকাপ আসর বসার মাসখানেক আগে ম্যানিলায় ‘মিস ইউনিভার্স’ হয়েছেন এক অষ্টাদশী। প্রবাসী হলেও বাঙালি, তাই বাংলার কিঞ্চিৎ শ্লাঘা বোধ করারও হক আছে। ওয়ার্ল্ড কাপ শুরুর আগেই তিনি ঘাঁটি গেড়েছেন লস অ্যাঞ্জেলেস-এ, যেখান থেকেই চলত তাঁর বিশ্বভ্রমণ। একটা সূত্রের যোগাযোগ হয়েছিল ওঁর বাবা সুধীরবাবুর সঙ্গে। তাঁর সৌজন্যেই ফোন নম্বর জোগাড়। এখানকার সময় রাত আড়াইটা নাগাদ অফিসের একমাত্র আইএসডি টেলিফোন থেকে লস অ্যাঞ্জেলেসে ফোন। এদিকে আমি, ওদিকে সুস্মিতা সেন। বত্রিশ বছরের আগের ব্যাপার, কথোপকথন পুঙ্খানুপুঙ্খ মনে থাকা কঠিন। তবে এটুকু মনে আছে, তিনি খুব সপ্রতিভ ছিলেন, ঝরঝরে বাংলায় কথা বলছিলেন, আমিই কেমন থতমত খেয়ে গেছিলাম। পরের পরের দিন প্রথম পাতায় সিঙ্গল কলামে একটা ছোট ছবি সহকারে ইন্টারভিউটা বেরিয়েছিল। তার কাটিং আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে নেই। তবে মনে আছে, পাসাডেনায় ফাইনাল দেখতে যাবেন নাকি? জবাবে বলেছিলেন, সময় পেলে সুযোগ থাকলে নিশ্চই যেতে চান। হেডিং-ও হয়েছিল সেই মর্মেই।

সত্যিই কি গেছিলেন তিনি? এখন আবার যোগাযোগ করে প্রশ্নটা করাই যায়।

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *