মেসির মায়ামিতে কঠিন প্রশ্নপত্রের সামনে রোনাল্দো
সব্যসাচী সরকার, ডালাস
সিআর সেভেন বনাম এলএম টেন! ক্রিস্তিয়ানো রোনাল্দো বনাম লিওনেল মেসি।
দু’জনেই এ বার ছয় নম্বর বিশ্বকাপ খেলছেন, কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে বিশ্বমঞ্চে কখনও মুখোমুখি হননি। একটা সময়ে স্পেনের লা লিগায় রিয়াল মাদ্রিদ বনাম বার্সেলোনা অর্থাৎ এল ক্লাসিকো মানেই ছিল রোনাল্দো বনাম মেসি। বহু নাটক, ঘাত প্রতিঘাত, ইতিহাস সে সবের সঙ্গে জড়িয়ে।
অথচ বিশ্বকাপ কখনও একই ম্যাচে এই দুই কিংবদন্তিকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি ফুটবলের। এ বার গল্পটা অন্য রকম। অঙ্ক টু প্লাস টু ফোর হলেই তৈরি হবে দুই কিংবদন্তির কোয়ার্টার ফাইনালে একটা টক্করের সম্ভাবনা। আমেরিকার বিভিন্ন অনলাইন সাইটের দাবি, ম্যাচটা হলে এক-একটা টিকিটের দাম কালোবাজারে চোখ বুজে ছয় থেকে সাত হাজার ডলারে পৌঁছবে। তার বেশিও হতে পারে। ডালাসেই আজের্ন্তিনার পরে ম্যাচ, জর্ডনের বিরুদ্ধে। সে দেশের মিডিয়া এখন এই শহরে। ডালাস স্টেডিয়ামে জাপান-সুইডেন ম্যাচ চলাকালীন প্রেস বক্সে বসে আর্জেন্তিনার সাংবাদিক মাতিও বলছিলেন, ‘ওই ম্যাচ হলে সেটাকেই অনেকে বিশ্বকাপ ফাইনাল ধরে নেবে। টিকিট থাকলে আপনি অবশ্যই হিরো।’
ম্যাচটা হতে গেলে অবশ্য শর্ত থাকছে। সে জন্যই আজ গোটা ফুটবল দুনিয়ার সার্চলাইটে মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে ‘কে’ গ্রুপে কলম্বিয়া বনাম পতুর্গাল ম্যাচ। শেষ আটে মেসিদের মুখোমুখি হতে গেলে পতুর্গালকে গ্রুপে এক নম্বর হতে হবে।
কলম্বিয়া দুই ম্যাচে ছয় পয়েন্ট পেয়ে নক আউটে নিশ্চিত, লুইস দিয়াস, রদ্রিগেস, দানিয়েল মুনিওসদের লক্ষ্য গ্রুপে এক নম্বর হওয়া। অন্য দিকে, রোনাল্দোর পর্তুগালের দুই ম্যাচে চার পয়েন্ট, জিতলে তারা এক নম্বর হবে। কলম্বিয়ার সঙ্গে হারলে বা ড্র করলে এ বারও রোনাল্দো বনাম মেসি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, সেকেন্ড বয় হলেই তো ভালো পতুর্গালের। মেসির আজের্ন্তিনাকে এড়ানো যাবে। কিন্তু ঘটনা হলো, হারলে রোনাল্দোদের নক আউট অভিযানে আরও কাঁটা ছড়ানো থাকবে। রাউন্ড অফ থার্টি টু-তেই দেখা হতে পারে হ্যারি কেনের ইংল্যান্ডের সঙ্গে।
এই পর্যায়ে অঙ্ক কষে বিশ্বকাপ নক আউটের ম্যাচের প্রতিদ্বন্দ্বী ঠিক করতে হলে বারবার ঠকতে হয়, সে জন্যই রোনাল্দোরা তো বটেই, লুইস দিয়াসরাও আজ তিন পয়েন্টের জন্য খেলবেন। পতুর্গাল কোচ রবের্তো মার্তিনেস জানেন, এই কলম্বিয়া কোপা আমেরিকা ফাইনালিস্ট, একেবারেই সহজ প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। আর্জেন্তিনীয় কোচ নেস্তর লরেন্সো টিমটাকে একটা নতুন মাত্রা দিয়েছেন। দিয়াস বা রদ্রিগেসরা অ্যাটাকিং থার্ডে সামান্য জায়গা পেলেই খেলা ধরে নিতে পারেন। সঙ্গে এক্স ফ্যাক্টর রাইট উইং ব্যাক দানিয়েল মুনিওস। যিনি প্রতি ম্যাচে শুধু গোল করছেন না, উইং ব্যাকের কনসেপ্টটাই বদলে দিয়েছেন।
আবার পতুর্গালের ব্রহ্মাস্ত্র মিডফিল্ড। উজবেকিস্তানের বিরুদ্ধে আগের ম্যাচে জাদুকরের মতো পুরো মাঝমাঠটা কন্ট্রোল করেছিলেন ব্রুনো ফের্নান্দেস। আবার নুনো মেন্দেস এখন বিশ্বের সেরা লেফট ব্যাক। ডিআর কঙ্গোর বিরুদ্ধে যে টিম গোলমুখ খুঁজে পাচ্ছিল না, তারা উজবেকিস্তানকে ৫-০ উড়িয়ে দিয়েছে। দুনিয়া দেখেছে রোনান্দোর সেই হুঙ্কার ‘আই অ্যাম ব্যাক, আই অ্যাম ব্যাক!’
কে না জানে, মায়ামি মানেই মেসি মহল্লা। গত কয়েক বছর ধরেই মেসি খেলেন ইন্তার মায়ামিতে, তিনি এই শহরেরই বাসিন্দা। দু’বছর আগে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ চলাকালীন মায়ামিতে থাকার সময়ে দেখেছি, ফুটবল ঈশ্বরকে নিয়ে উন্মাদনা। মোটেই গোলাপি নয়, বেবি পিঙ্ক ও হাল্কা সাদার মিশ্রণে ইন্তার মায়ামির জার্সি পরে থাকলে পিৎজার দোকানে বা কফি শপেও টেন পার্সেন্ট ছাড় পাওয়া যায়। ডেভিড বেকহ্যামের উদ্যোগে মায়ামিতে আসার পরে মেসি এই শহর তো বটেই, আমেরিকার ‘সকার’ দর্শনটাই বদলে দিয়েছেন। এমনই কপাল, এ বারের বিশ্বকাপে গ্রপের সবচেয়ে কঠিন ম্যাচটা রোনাল্দোকে খেলতে হচ্ছে মেসির দুর্গে।
অন্য দিকে, ডালাসে আজ আজের্ন্তিনার সামনে দুর্বল প্রতিপক্ষ জর্ডন। সদ্য টিমমেটদের সঙ্গে ৩৯তম জন্মদিন পালন করা মেসির কোনও চাপই নেই। টিম দুটো ম্যাচ জিতে নক আউটে চলে গিয়েছে, জর্ডন ম্যাচে মেসিকে বিশ্রামও দিতে পারেন স্কালোনি। তবে সবটাই নির্ভর করবে, মেসি কী চান। নক আউটের আগে আরও কিছু সময় খেলতে চাইতেই পারেন। তবে হুলিয়ান আলবারেস বা নিকো পাসকে দেখে নেওয়ার এটাই সেরা সময়। কাতারে স্ট্রাইকার লাউতারো মার্তিনেস ফর্মে না থাকায় আসবারেসকে নামিয়ে বাজিমাত করেছিলেন স্কালোনি। এ বার আসবারেস প্রথম এগারোয় শুরু করছেন না, তার উপরে আর্জেন্তিনার পাঁচটা গোলের সবক’টাই মেসির। সহজ প্রশ্ন, এই ৩৯ বছর বয়সেও প্রতি ম্যাচে মেসিকে গোল করে যেতে হবে কেন? বাকিরা কবে গোল করবেন? আর কত টানবেন তিনি? নক আউটে তাঁর যদি একটা অফ ডে যায়, লা আলবিসেলেস্তে (আর্জেন্তিনা টিমের ডাকনাম) কি আটকে যাবে? তার উপরে ডিফেন্সে রোমেরোর চোট একটা দুশ্চিন্তার কারণ।
স্কালোনি জানেন, মেসি তাঁর শেষ পারানির কড়ি, কিন্তু কাতারের পরে আবার একটা বিশ্বকাপ তিনি একা উতরে দেবেন, এই ভাবনা ধরে বসে থাকলে তাঁকে ডুবতে হবে। ডিফেন্স কাতারে তাঁকে ভুগিয়েছিল, এ বারও উইং ব্যাক পজি়শনে মন্তিয়েলকে নিয়ে সমস্যা আছে। ওতামেন্দির অভিজ্ঞতা থাকলেও এখন অনেকটাই স্লো।
সব মিলিয়ে আজ জর্ডন ম্যাচ আজের্ন্তিনার কাছে মেসি ছাড়া বাকিদের দেখে নেওয়ার ম্যাচ। অন্য দিকে, সিআর সেভেনের ফের পরীক্ষা, কলম্বিয়াকে টপকে মেসির পাড়ায় মস্তানি দেখানোর।