তারাতলা দুর্ঘটনা: বেচে থাকার লড়াইয়ে দুই শ্রমিকের পরিবার
বিশ্বদেব ভট্টাচার্য, আসানসোল
কলকাতার তারাতলায় নির্মীয়মাণ গোডাউন ধসে পড়ার মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন রানিগঞ্জের নবীন সিং (৪৪) এবং ঝাড়খণ্ডের নিরসার গণেশ কালিন্দী (৪৫)। বৃহস্পতিবার রাত ও শুক্রবার ভোরের মধ্যে দুই শ্রমিকের নিথর দেহ তাঁদের বাড়িতে পৌঁছতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিজন -ও প্রতিবেশীরা। দু’টি পরিবারই আকস্মিক এই বিপর্যয়ে তাঁদের একমাত্র উপার্জনকারীকে হারিয়ে এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। এক দিকে যেমন প্রশাসনের সহায়তায় দেহ ফিরে পেয়েছেন তাঁরা, তেমনই তুলেছেন পরিকাঠামোগত গাফিলতির অভিযোগ।
বুধবার দুপুরে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতাল -ও তারাতলায় দুর্ঘটনাস্থলে আসেন রানিগঞ্জের লায়েকবাঁধ ৩ নম্বর ধাওড়ার বাসিন্দা নির্মাণ শ্রমিক নবীন সিংয়ের স্ত্রী নেহা দেবী, পুত্র প্রিন্স কুমার। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন নবীনের বড় শ্যালিকার মেয়ে সিমরন। তিনি বলেন, ‘বুধবার গভীর রাত পর্যন্ত এসএসকেএমে কোনও দেহ পৌঁছতেই ছুটে গিয়েছি। নজর রাখতে হয়েছে অ্যাম্বুল্যান্সেও। মেসোকে খুঁজে পাইনি।
বৃহস্পতিবার যখন তাঁকে পেলাম, তখন তিনি ছিলেন হাসপাতালের মর্গে। দেহ থেঁতলে গিয়েছিল। মুখ দেখে চেনা যাচ্ছিল না। হাতের ট্যাটু দেখে শনাক্ত করি।’ বৃহস্পতিবার রাতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং পুলিশের ব্যবস্থাপনায় গাড়িতে নবীনের দেহ রানিগঞ্জের বাড়িতে আনা হয়। শুক্রবার দুপুরে মেজিয়া শ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে।
স্বামীকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন নেহা। পরিকাঠামোর অভাবকে দায়ী করে তিনি বলেন, ‘এটা দুর্ঘটনা নয়, পরিকল্পনা করে মেরে ফেলা হয়েছে। মালিক তো জানতেনই যে নীচের কাঠামোটা মজবুত নয়। খুব নরম মাটিতে স্ট্রাকচার ছিল।’ তাঁর প্রশ্ন, ‘বহু দিন ধরে পড়ে থাকা কারখানার উপরে কী ভাবে কংক্রিটের ঢালাইয়ের কাজ চলছিল?’ নেহা বললেন, ‘আমাকে মাঝেমধ্যে স্বামী দেখাত, কতটা ভয়াবহ অবস্থায় জীবনকে বাজি রেখে কাজ করতে হয় তাদের। তাকে কাজ ছেড়ে বাড়ি চলে আসতে বলেছিলাম। আমার কথা শুনলে, এমনটা হতো না।’
বৃদ্ধ শ্বশুর এবং দশম শ্রেণির ছাত্র প্রিন্স, সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী কোমল ও ছোট ছেলে আরিয়ানকে নিয়ে এখন অথৈ জলে নেহা। তার উপরে এসেছে রেলের উচ্ছেদ-নোটিস। রাজ্য সরকারের ১০ লক্ষ টাকা সহায়তার আশ্বাস শুনলেও এখনও কোনও স্পষ্ট বার্তা পাননি তিনি। চোখের জল মুছে নেহার আবেদন, ‘আমি যদি একটা কিছু কাজ পাই, তা হলে কোনওক্রমে সবাইকে নিয়ে সংসার চালিয়ে নেব।’
তারাতলার দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ঝাড়খণ্ডের ধানবাদ জেলার নিরসার শালুকচাপড়া গ্রামের পরিযায়ী শ্রমিক গণেশ কালিন্দী। মাত্র ১৫ দিন আগে কাজে যাওয়া গণেশের মৃত্যুর খবরে স্তব্ধ তাঁর পরিবার। কলকাতা পুলিশের সহায়তায় শুক্রবার ভোরে তাঁর দেহ গ্রামে পৌঁছলে চারদিকে কান্নার রোল ওঠে।
গণেশের বাবা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক কালীপদ কালিন্দী কেবল বলতে থাকেন, ‘আমাদের সব হারিয়ে গেল।’ নির্বাক স্ত্রী লক্ষ্মী কালিন্দী বার বার স্বামীর দেহে মাথা ঠুকছিলেন। মেজো মেয়ে মৌমিতা আর্তনাদ করে বলেন, ‘দুর্ঘটনার দিন সকাল ১০টার সময়ে বাবার সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল। বলেছিল বৃহস্পতিবার বাড়ি ফিরবে। কিন্তু এ ভাবে ফিরবে, ভাবতেই পারছি না।’
খবর পেয়ে শুক্রবার সকালেই কালিন্দী পরিবারে পৌঁছন নিরসার বিধায়ক মৃতদেহকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি পরিবারটিকে সান্ত্বনা দেন এবং গণেশের তিন ছেলেমেয়ের পড়াশোনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার কথা ঘোষণা করেন। বিধায়ক বলেন, ‘আমি গণেশের পরিবারের পাশে সব সময় থাকব। ওদের যা সাহায্যের দরকার আমাকে বলবে। ওদের পড়াশোনার কোনও ক্ষতি হতে দেবো না।’
পাশাপাশি, ধানবাদ লেবার কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে ঝাড়খণ্ড সরকারের পক্ষ থেকে পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যুর জন্য দেড় লাখ টাকা দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। এ দিন গণেশকে শেষশ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদের সদস্য বাদলচন্দ্র বাউড়ি, সজল দে, সরস্বতী গড়াই, পবন পান্ডে-সহ বহু স্থানীয় সমাজকর্মী ও জনপ্রতিনিধি।