স্বপ্নই সার, দামি মোবাইল কেনা হলো না রাহুলের
গৌতম ধোনি, কৃষ্ণনগর
জলঙ্গি নদীর চরে গ্রাম। বসতির চেয়ে পাটখেত, সবজির খেত, কলাবাগানই বেশি। বাড়ির পাশ দিয়ে সমবয়সিদের কেউ কেউ খেতে কাজে যেত। তাদের কারও কারও হাতে দামি মোবাইল ফোনও দেখেছিল স্কুলছুট রাহুল। তারও ইচ্ছে হয়েছিল দামি সেট কিনবে। কিন্তু পয়সা কে দেবে? কোনও কোনও দিন বাবার সঙ্গে মাঠে কাজে গেলে যে মজুরি জুটত, বাবার হাতেই সেটা তুলে দিতে হতো।
দামি একটা অ্যানড্রয়েড সেট কেনার স্বপ্নে আঠারো ছুঁই ছুঁই কিশোরটি ঠিকাদারের অধীনে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ নিয়েছিল। কলকাতায় নির্মাণ শ্রমিকের কাজে ছিল মাস দুয়েক। তারাতলার গোডাউনের ছাদ ভেঙে বুধবার মৃত্যু হওয়া শ্রমিকদের তালিকায় রয়েছে নদিয়ার কোতোয়ালি থানার চর-শম্ভুনগর গ্রামের রাহুল চৌধুরী (১৮)-র নাম। বৃহস্পতিবার সকালে রাহুলের মৃতদেহ যখন গ্রামের বাড়িতে এল, মোবাইল ক্যামেরায় অনেক ছবি উঠল। কিন্তু মোবাইল আর কেনা হলো না রাহুলের।
কৃষ্ণনগর শহর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে চর-শম্ভুনগরের নীচের পাড়ায় বাড়ি রাহুলের। বাবা রামপ্রসাদ চৌধুরী অন্যের জমিতে শ্রমিকের কাজ করেন। মা মিনা চৌধুরী গ্রাম থেকে বেশ কয়েক কিলোমিটার দূরে ধুবুলিয়া বাজারে আনাজ বিক্রি করেন। তিন ভাইয়ের মধ্যে রাহুল মেজো। ছেলের শোকে বাক্যহারা বাবা–মা কথা বলার অবস্থাতেই ছিলেন না।
রাহুলের এক দূর সম্পর্কের দিদি সীমা চৌধুরী বলেন, ‘ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়ার পরে স্কুলছুট হয় রাহুল। দেড় দু’বছর ধরে বাবার সঙ্গে অন্যের জমিতে কাজ করা শুরু করে। ভাইয়ের খুব ইচ্ছে ছিল একটা মোবাইল কিনবে। কিন্তু অভাবি সংসার বলে বাবা–মায়ের কাছে বায়না করেনি। মাঝে–মধ্যে কাজে গিয়ে ভাই মজুরি বাবদ যা পেত, বাবার হাতেই তুলে দিত। কলকাতায় কাজে যাওয়ার সময়ে ওর মায়ের কম দামের একটা ছোট মোবাইল সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল।’
সীমা জানান, মাস দুই আগে ঠিকাদারের অধীনে কলকাতায় নির্মাণ শ্রমিকের কাজ শুরু করে ভাই। প্রথম মাসের রোজগার থেকে ৯ হাজার টাকা মাকে দিয়েছিল। পরের মাসে প্রতিদিন কাজ করতে পারেনি। এর মধ্যে ভাই বাড়ি এসেছিল। বাড়িতে কয়েক দিন থাকার পরে তাঁর শ্বশুরবাড়ি হাওড়ার বালিতে যায় রাহুল। ছিল দিন দু’য়েক। গত রবিবার সীমার স্বামী রাহুলকে তারাতলায় পৌঁছে দেন। তার তিন দিনের মধ্যে ঘটে যায় দুর্ঘটনা!
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রাক্তন পঞ্চায়েত সদস্য রাজারাম চৌধুরী বলেন, ‘দামি মোবাইল কেনার ইচ্ছে এখানকার অল্প বয়সিদের মধ্যে থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। সেই ফোন কেনার জন্য কাজ করতে গিয়ে ছেলেটার প্রাণ গেল এটা খুবই মর্মান্তিক। যাদের গাফিলতিতে এই ঘটনা ঘটল, তাদের যেন উপযুক্ত শাস্তি হয়।’