সিএসই–তে ফের বুল–বেয়ারের রেসের ইঙ্গিত বাজেটে
সুদীপ্ত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সুপর্ণ মুখোপাধ্যায়
নস্ট্যালজিয়া উস্কে দিয়ে ক্যালকাটা স্টক এক্সচেঞ্জের পুনরুজ্জীবনের বার্তা দিল বাংলার বিজেপি সরকার। সোমবার রাজ্য বাজেটে অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত জানালেন, ১১৮ বছরের পুরোনো এই স্টক এক্সচেঞ্জ বিভিন্ন আইনি জটিলতায় বন্ধ হওয়ার মুখে। রাজ্য সরকার কলকাতাকে ফিনানশিয়াল ক্যাপিটাল হিসেবে ফিরিয়ে আনতে ক্যালকাটা স্টক এক্সচেঞ্জকে সাহায্য করার প্রস্তাব রাখছে।
ফিরে যাওয়া যাক এক গৌরবের অধ্যায়ে। ১৯৭৩–এ ‘দেশ’ পত্রিকার পুজো সংখ্যায় প্রকাশিত হয় শংকরের ‘জন-অরণ্য’ উপন্যাসটি। এই উপন্যাসের উপর ভিত্তি করে ১৯৭৬–এ মুক্তি পায় সত্যজিৎ রায়ের ছবি ‘জনঅরণ্য’। বেকারত্ব এবং প্রেমিকা তপতীর এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে শেয়ার ব্রোকিংয়ের ব্যবসায় নেমেছিলেন এই ছবির মূল চরিত্র সোমনাথ। ছবিটিতে সত্যজিৎ দেখিয়েছিলেন, কেমন করে হিরোকে জ়িরো এবং সব হারানোকে সব পাওয়ার রাস্তা দেখাতে পারে শেয়ারবাজার। এই ছবি আবর্তিত হয়েছিল ক্যালকাটা স্টক এক্সচেঞ্জকে (সিএসই) কেন্দ্র করে। শুধু সোমনাথই কেন, সেই সময়ের স্বপ্নসন্ধানী বাঙালির উড়ানের রাস্তা দেখানোর একটা অধ্যায় তৈরি হয়েছিল কলকাতার এই এক্সচেঞ্জের হাত ধরে। বেকারত্ব এবং চাকরিহীনতার একটা কঠিন সময়ে স্টক ব্রোকার হয়ে হাতের ইশারায় শেয়ার কিনে বা বেচে সংসার চলেছে অনেক বাঙালির। হয়তো অনেকে খুইয়েওছেনও সব। কিন্তু সিএসই–র অতীত গৌরবকে কোনও ভাবেই অস্বীকার করা যাবে না।
১১৮ বছর আগে, যখন ভারতের বাণিজ্য রাজধানীর তাজ় মুম্বইয়ের মাথায় ওঠেনি, সেই সময়ে ডালহৌসির ৭ নম্বর লায়ন্স রেঞ্জের বাড়িতে তৈরি হয়েছিল দেশের দ্বিতীয় শেয়ারবাজার—ক্যালকাটা স্টক এক্সচেঞ্জ। দ্বারকানাথ ঠাকুরের সঙ্গে সরাসরি স্টক এক্সচেঞ্জ বা শেয়ার কেনাবেচার কেন্দ্রের কোনও সম্পর্ক না থাকলেও, সেই সময়ের কলকাতায় শিল্পের জোয়ার ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির যে ইতিহাস তৈরি হয়েছিল, সেই রেশ টেনে তাঁর মৃত্যুর ১৭ বছর পরে ১৮৬৩–তে কলকাতার ব্যবসায়ীরা স্ট্র্যান্ড রোডে বিভিন্ন সংস্থার শেয়ার কেনাবেচা শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯০৮–এ সিএসই–র স্থায়ী ঠিকানা হয় ৭ নম্বর লায়ন্স রেঞ্জ।
সময়ের সঙ্গে সম্মান হারিয়েছে সিএসই। ২০০১–এ কেতন পারেখের আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিঘাত কার্যত কফিনে শেষ পেরেক পঁুতে দিয়েছিল সিএসই-র। শিল্প সংস্থাগুলিও একে একে এই শেয়ারবাজার থেকে সরে গিয়ে বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ (বিএসই) এবং ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জে (এনএসই) নাম লেখাতে শুরু করে। বন্ধ হয়ে যায় সক্রিয় ট্রেডিং। এতে সিএসই তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ধরে রাখলেও বাস্তব অর্থে পুঁজিবাজারের মূল স্রোত থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সেই শেয়ারবাজারের প্রাণ সঞ্চারের বার্তা দেওয়া হলো এই বাজেটে।
তাই নতুন সরকারের প্রতিশ্রুতিকে ঘিরে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে কলকাতার এক সময়ের আর্থিক গৌরব। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এলে সিএসই-কে ফের সক্রিয় ও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে—এমন আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। ক্ষমতায় আসার পরে সেই প্রতিশ্রুতি পালনের লক্ষ্যে রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বেশ কয়েক দফায় বৈঠকও করেছেন অধুনা নিষ্ক্রিয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষকর্তারা। তবে শিল্পমহল, বিনিয়োগকারী এবং অর্থনীতিবিদদের একাংশের মনে একটাই প্রশ্ন—আদৌ কি বাংলার হারিয়ে যাওয়া এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে নতুন প্রাণ দেওয়া সম্ভব? উত্তর আপাতত স্পষ্ট নয়।