আবেগে ভাসছে ডালাস, শহর এখন ‘ঈশ্বর’-এর দখলে
সব্যসাচী সরকার, ডালাস
একটা গোটা শহর কত দ্রুত চলে যেতে পারে শুধু তাঁর দখলে!
রাষ্ট্রনায়ক নন, বিশাল সমাবেশে ভাষণের প্রশ্নই নেই। প্রবল ক্ষমতাশালী ডিক্টেটর নন, যেখানে মানব মস্তিষ্ককে নিয়ন্ত্রণ করে ভয়। হলিউডের মেগাতারকা নায়ক বা বিদঘুটে রকস্টার নন, যেখানে সেজেগুজে জনতার সামনে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ার মধ্যেও থাকে স্পনসরশিপের বিশাল প্যাকেজ, তৈরি করে রাখা স্ক্রিপ্ট।
আমরা যাঁকে দেখছি, তাঁর এ সবের প্রয়োজন হয় না, যশের উর্দ্ধে চলে গিয়েছেন বহু আগেই, তাঁর ক্ষমতা বলতে শুধু একটা গোল বল আর দুটো পা। যে দুটি পা গত প্রায় দুই দশক ধরে গোটা পৃথিবীকে আশ্চর্যজনক জাদুমন্ত্রে বিস্ময়াবিষ্ট করে রেখেছে, কোটি কোটি মানুষের বুকের পাঁজরের ভিতরে তিনি চিরকালীন হৃদস্পন্দন। ডালাসের ডাউনটাউন বা শহরের কেন্দ্রস্থল এ দিন সকাল থেকেই আর্জেন্তিনার সমর্থকদের দখলে, আরও ভালো করে বললে লিও মেসির ভক্তদের। তাঁর বিশাল ম্যুরাল ডালাসের রাস্তায়, প্রতিটি স্পোর্টস বারে তাঁর বিশাল কাটআউট। প্রায় দুই লক্ষ লা আলবিসেলেস্তে (আর্জেন্তিনা টিমের ডাকনাম) সমর্থক এই ম্যাচ দেখতে এসেছেন। যাঁরা স্টেডিয়ামে ঢুকতে পারবেন না, তাঁরা থাকবেন ফিফার ফ্যান জ়োনে। ফুটবল ঈশ্বরকে দেখবেন বলে হাজারে হাজারে জনতা রোদ উপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে হোটেলের বাইরে। যদি একবার ঈশ্বর দর্শন হয়।
আর্জেন্তিনার দুটো বিখ্যাত সাপোর্টার গ্রুপের নাম ‘হিঞ্চাস আজের্ন্তিনোস’ এবং লা বান্দা দে আজের্ন্তিনা)। তাঁরা ম্যাচের আগের দিন বিরাট ফ্যান ফেস্টের আয়োজন করেছেন এখানকার ক্লাইড ওয়ারেন পার্কে। কী হবে সেখানে? ইনস্টাগ্রাম পোস্ট দিয়ে হিঞ্চাস আর্জেন্তিনোস লিখেছে, ‘আমরা রাস্তায় হাঁটব, জাতীয় টিমের জন্য গান গাইব,। বিশ্ব দেখবে, আজের্ন্তিনীয় বলতে ঠিক কী বোঝায়। এখানে কোনও স্পনসর নেই, ব্যবসায়িক স্বার্থ নেই, পুরোটাই প্যাশন।’ এই ফ্যানদের আবার নাম ‘বান্দেরাজ়োস’, যাঁরা ড্রাম বাজিয়ে, নেচে, গেয়ে আবহ তৈরি করেন।
নিউ জার্সির নেওয়ার্ক থেকে গতকাল সকালে আমেরিকান এয়ারলাইন্সের ডালাস ফ্লাইটে প্রায় ৬০ শতাংশ সিট আর্জেন্তিনীয়দের দখলে। অধিকাংশের গায়ে বিখ্যাত নীল-সাদা জার্সি, পিছনে লেখা মেসি। জার্সি না থাকলে গলায় জড়ানো আর্জেন্তিনার স্কার্ফ।
নিউ ইয়র্কের আইটি সেক্টরে কর্মরত মাতিও-র সঙ্গে আলাপ হলো ফ্লাইটে। বছর চব্বিশের সপ্রতিভ যুবক গর্বিত, তাঁর পকেটে কালকের আর্জেন্তিনা-অস্ট্রিয়া ম্যাচের টিকিট আছে। বলছেন, ‘বহু আগে টিকিট কেটেছিলাম। ভাগ্যিস। মেসি হ্যাটট্রিক করবে, তার পরে টিকিট কাটব, এত নির্বোধ আমি নই। যারা কাটেনি, তারা এখন তিন হাজার ডলার দিলেও টিকিট পাবে না!’ ঘটনাও তাই। একেবারে স্টেডিয়ামের তিন নম্বর টায়ারে বহু উঁচুতে থাকা টিকিটও ব্ল্যাকে ১৭৫০ ডলার দাম। তা-ও বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। এক কথায়, গোটা ডালাস শহরটা মেসি-ম্যানিয়ায় ডুবে।
টিকিট হাতে কে ভাগ্যবান, না পেয়ে কে দুর্ভাগা, সেই জল্পনার মধ্যেই কানসাস সিটির বেসক্যাম্প থেকে রবিবার ডালাসে এসে পৌঁছেছে মেসি–সহ গোটা টিম। ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর বাবার স্বাস্থ্য নিয়ে গত কয়েকদিনে প্রচুর জলঘোলা হলেও এই মুহূর্তে তা দূরে সরিয়ে রেখে পরের ম্যাচে ফোকাস করছেন মেসি। এখনও পর্যন্ত একদিনও প্রেসের সামনে আসেননি, ম্যাচের আগের দিন প্রেস মিটে আসবেন কি না, তা নিয়ে জল্পনা আকাশছোঁয়া। এলে গোটা বিশ্বের মিডিয়া হাতে চাঁদ পাবে, কিন্তু এই নিয়ে কোনও নিশ্চয়তা নেই।
গ্রুপ জে-এই ম্যাচটা মেসিদের কাছে নক আউটে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে জরুরি, কারণ আজের্ন্তিনা যদি প্রথম ম্যাচে ৩-০ আলজিরিয়ার বিরুদ্ধে জিতে থাকে, তা হলে অস্ট্রিয়াও ৩-১ গোলে জর্ডনকে হারিয়েছে। গ্রপে এক নম্বর হতে গেলে আজ মেসিদের জিততেই হবে। তার উপরে ফিফার রেফারিং কমিশনের কাছে আলজিরিয়া নালিশ করেছে, রেফারি আর্জেন্তিনাকে টেনে খেলিয়েছেন। তাদের ক্যাপ্টেন আইলা মান্ডিকে ফাউলের পরেও মেসিকে কোনও শাস্তি দেওয়া হয়নি।
যেটুকু জানা যাচ্ছে, গন্সালো মন্তিয়েলের হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট। ফলে এই ম্যাচে তাঁকে পাওয়া যাবে না। তাঁর জায়গায় প্রথম এগারোয় আসতে চলেছেন মোলিনা। অন্য উইং ব্যাক মেদিনা, স্টপারে রোমেরো আর লিসান্দ্রো মার্তিনেস। এখন ফুটবল বিশ্ব জেনে গিয়েছে, মন্তিয়েলের উইং ব্যাক পজ়িশনটা আজের্ন্তিনার উইক লিঙ্ক। মোলিনা ওই জায়গায় ক্লিক করলে ভালো, কিন্তু সেটা না হলে নক আউটে যে কোনও বড় টিমের সামনে ভুগতে হবে স্কালোনিকে। ২০২২ সালে কাতারের দোহায় নক আউটে বেশ কিছু ম্যাচে চাপের মুখে একেবারে ভেঙে পড়েছিল ডিফেন্স। উদাহরণ ফাইনালে ফ্রান্স বা কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডস।
এবার মিডফিল্ডে এই ম্যাচেও শুরু করার কথা দে পল, ম্যাকঅ্যালিস্টার ও এন্সো ফের্নান্দেসের। উপরে আলমাদা, মেসি আর লাউতারো মাটির্নেস। আবার অনেকে মনে করছেন, আলমাদার সঙ্গে হুলিয়ান আলবারেসের আন্ডারস্ট্যান্ডিংটা ভালো বলে তাঁকে আগে নামানো হতে পারে।
টিম হিসেবে অস্ট্রিয়া যে একেবারে সহজ হবে না, দে পল, ফের্নান্দেসদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন আজের্ন্তিনার অ্যাসিস্ট্যান্ট কোচ পাবলো আইমার। তাঁর বক্তব্য, ‘ওরা যথেষ্ট টাফ টিম। ফিজি়ক্যাল ফুটবলে খুবই এফেক্টিভ। তা ছাড়া বিশ্বকাপ দেখাচ্ছে, এনিথিং ইজ় পসিবল!’
অস্ট্রিয়া ক্যাপ্টেন ডেভিড আলাবা মেসি ফ্যাক্টরের কথা জানেন, জানেন তাঁর টিম পিছিয়েই শুরু করবে। আবার এটাও জানেন, অস্ট্রিয়া অর্গানাইজ়ড ডিফেন্স রেখে প্রেসিং ফুটবল খেলবে, লক্ষ্য হবে ফিজি়ক্যালি আজের্ন্তিনার মিডফিল্ডের ছন্দ ভেঙে দেওয়া।
কিন্তু কোন প্ল্যান আর কবে লিওনেল মেসির জন্য খেটেছে? তাই গোটা বিশ্বের মেসি ভক্তদের আকুতি আর একটা গোলের। গোল নম্বর সেভেন্টিন।
তা হলেই বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোল ফুটবল ঈশ্বরের হতে যাচ্ছে।