পঞ্চরথীর ষড়যন্ত্রে কোমায় মনসুন, সদুত্তরহীন আবহবিদরাও - 24 Ghanta Bangla News
Home

পঞ্চরথীর ষড়যন্ত্রে কোমায় মনসুন, সদুত্তরহীন আবহবিদরাও

Spread the love

কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়

চক্রব্যূহে সাত মহারথী মিলে হত্যা করেছিলেন অভিমন্যুকে। মহাভারতের কুরুক্ষেত্রের মতোই অবস্থা ২০২৬–এ ভারতের বর্ষার। তবে সাত নয়, পাঁচ প্রাকৃতিক শক্তির মিলিত বিরোধিতায় কার্যত কোমায় চলে গিয়েছে দক্ষিণ–পশ্চিম মৌসুমি বায়ু।

৪ জুন থেকে ১৭ জুন পর্যন্ত দেশে বৃষ্টির যে হিসেব দখিল করেছে মৌসম ভবন, তা দেখলে অতি বড় আশাবাদীও আতঙ্কিত হবেন। সংস্থা জানাচ্ছে, ওই সময়সীমায় দেশে স্বাভাবিক বৃষ্টির পরিমাণ থাকা উচিত ৬৫.৯ মিমি। কিন্তু বাস্তবে দেশ পেয়েছে মাত্র ৩৯.৭ মিমি বৃষ্টি। অর্থাৎ, ঘাটতির পরিমাণ ৪০ শতাংশ। তৃষ্ণার্ত চাতকের মতো একটু বৃষ্টির আশায় গোটা দেশ তাকিয়ে আকাশের দিকে। প্রশ্ন একটাই, কবে ‘বর্ষাকালের উপযুক্ত’ বৃষ্টি শুরু হবে? তবে আবহবিদরা গত দশ দিনের মতোই — সদুত্তরহীন।

মনে করা হচ্ছে, দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু আরও অন্তত সাত দিন একই রকম দুর্বল বা কার্যত স্থবির অবস্থায় থাকতে চলেছে। ৪ জুন দেশে মনসুনের প্রবেশ ঘটেছিল। তার পর পেরিয়ে গিয়েছে ১৫ দিন। এই দু’সপ্তাহে বর্ষার মেঘ ঘনীভূত হওয়ার জায়গায় ক্রমশ ফিকে হতে হতে প্রায় মিলিয়ে গিয়েছে ভারতের আকাশ থেকে। কাগজেকলমে ‘ভরা বর্ষায়’ এমন ভাবে মেঘের ভ্যানিশ হয়ে যাওয়ার নেপথ্যে যে পাঁচটি প্রাকৃতিক ভিলেনকে দায়ী করছেন আবহবিদরা, তারা হলো — প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনিও–র বিকাশ, দুর্বল ম্যাডেন-জুলিয়ান অসিলেশন, উত্তর-পশ্চিম ও মধ্য ভারতের উপরে জলীয় বাষ্পহীন শুষ্ক পশ্চিমী বাতাসের প্রবাহ, দুর্বল সোমালি জেট এবং ভারত মহাসাগরের নিরপেক্ষ আচরণ।

এ বছর বর্ষার শুরুটাই ছিল ‘গোলমেলে’। দেশে কোন তারিখে বর্ষা ঢুকবে, ২০০৫ থেকে মৌসম ভবন তার পূর্বাভাস দেওয়া শুরু করেছে। একমাত্র ২০১৫ বাদ দিলে ২০০৫ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত প্রতি বছরই পূর্বাভাসের তিন–চার দিনের মধ্যে বৃষ্টি শুরু হয়েছে দেশে। ২০১৫–তে পূর্বাভাসের ছ’দিন পরে বর্ষা নেমেছিল। আর এ বছর মৌসম ভবনের চারটি ডেট ফেল করার পরে শেষ পর্যন্ত ৪ জুন দেশে বর্ষা শুরু হয়েছিল। আর তার আট দিনের মধ্যেই ভয়াবহ হোঁচট মৌসুমি বাতাসের। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্র থেকে ভিজে বাতাস ভারতে ঢুকলেও মেঘ গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ঊর্ধ্বমুখী বায়ুপ্রবাহ (কনভেকশন) এবং বায়ুর অভিসরণ (উইন্ড কনভারজেন্স) এতই দুর্বল যে, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হচ্ছে না।

মৌসুমি বায়ুর প্রভাব দুর্বল হওয়া প্রসঙ্গে আবহবিদ নভদীপ দাহিয়া বলছেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এল নিনিও পরিস্থিতির বিকাশ। প্রশান্ত মহাসাগরের জলের উপরিতল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি গরম হয়ে উঠলে তাকে ‘এল নিনিও’ বলে। এ বছর মহাসাগর অনেকটা বেশি গরম হয়ে ‘সুপার এল নিনিও’ তৈরি করেছে। এই সিস্টেমই মনসুনকে অনেকটা দুর্বল করে দিয়েছে।’ এর পাশাপাশি পুনের ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ ট্রপিক্যাল মিটিওরোলজি (আইআইটিএম)–এর বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, নেপথ্যে কলকাঠি নেড়েছে দুর্বল ‘ম্যাডেন-জুলিয়ান অসিলেশন’ (এমজেও)–ও। ‘এমজেও’ হলো নিরক্ষীয় অঞ্চলে মেঘ ও বৃষ্টিপাতের চলমান একটি বৃহৎ ওয়েদার সিস্টেম। বর্তমানে এটিও খুবই দুর্বল রয়েছে। তাই ভারতে মেঘ সৃষ্টি ও বৃষ্টিপাতের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে না।

এর পাশাপাশি উত্তর-পশ্চিম ও মধ্য ভারতের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া জলীয় বাষ্পহীন শুকনো পশ্চিমী বায়ুও আর্দ্র মৌসুমি বায়ুর কার্যকারিতা কমিয়ে দিচ্ছে বলে জানাচ্ছেন আবহবিদরা। এখানেই শেষ নয়। আফ্রিকার পূর্ব উপকূল থেকে আরব সাগরের উপর দিয়ে প্রবাহিত বাতাসের শক্তিশালী যে প্রবাহ অর্থাৎ ‘সোমালি জেট’ ভারতে বিপুল পরিমাণে জলীয় বাষ্প বহন করে আনে, বর্তমানে সেটিও অত্যন্ত দুর্বল থাকায় আর্দ্রতার জোগান কমে গিয়েছে।

এই বিষয়গুলো ছাড়াও জলবায়ু বিজ্ঞানী রঘু মুর্তুগুড্ডে ‘ভারতের অভিভাবক’ ভারত মহাসাগরের ‘নিরপেক্ষ আচরণ’–এরও উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘ভারত মহাসাগরের পশ্চিম ও পূর্ব অংশের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার পার্থক্য ভারতের মৌসুমি বৃষ্টিপাতের উপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। ভারত মহাসাগরের পশ্চিম অংশ স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি উষ্ণ এবং পূর্ব অংশ শীতল থাকলে ভারতের মনসুন শক্তিশালী হয়। উল্টোটা হলে ভারতে বৃষ্টিপাত কমে যায় এবং নিউট্রাল বা নিরপেক্ষ হলে কোনও প্রভাবই পড়ে না। এ বছর ভারত মহাসাগর এমন ‘নিউট্রাল’ অবস্থাতেই আছে।’

সর্বোপরি এ বার বঙ্গোপসাগর নিম্নচাপ এবং ঘূর্ণাবর্তের অভাবে একেবারে ‘শান্ত’ হয়ে রয়েছে। সমুদ্রে কোনও ওয়েদার সিস্টেম তৈরি হলে মনসুন সক্রিয় হয়। এ বার তেমনটাও হয়নি।

সামনের সাত দিনে ভারতের আবহাওয়ার এই রাহুর দশা কাটার কোনও আশা দেখছেন না আবহবিদরা। একেবারে স্থানীয় স্তরে এবং বিক্ষিপ্ত ভাবে বৃষ্টি হলে তাতে আর্দ্রতাজনিত অস্বস্তি আরও বাড়বে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *