ইউএস-ইরান মউ স্বাক্ষরে সাময়িক স্বস্তি, রইল অনেক প্রশ্নও
এই সময়: ‘খুব শিগগিরই’ মউ স্বাক্ষরের ইঙ্গিত বুধবার দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু সেটা যে ঘোষিত ১৯ জুনের আগেই, সেটা বোধহয় আশা করেননি কেউই। বৃহস্পতিবার ফ্রান্সেই স্বাক্ষরিত হলো আমেরিকা ও ইরানের মেমোরান্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং (মউ)। জি৭ সামিটের শেষে ফ্রান্সের ভার্সাই প্যালেসে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমান্যুয়েল মাক্রঁর সঙ্গে ডিনারের টেবিলে বসেই মউ–এ প্রথমে সইটি করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সই করা এগ্রিমেন্টটির ফটো ইরান কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হলে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজ়েশকিয়ান সেটিতে সই করে দেন। তবে এটি প্রাথমিক এগ্রিমেন্ট। মূল স্থায়ী চুক্তিটি আরও আলোচনা ও বোঝাপড়ার পরে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে তৈরি হবে। তবে মউ এগ্রিমেন্টটিকে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যা দিয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট এক্স-এ লিখেছেন, ‘এটি শক্তিশালী ইরানের বার্তা। পারস্পরিক শ্রদ্ধার মাধ্যমেই শান্তি ফিরতে পারে।’
এগ্রিমেন্টের কপি ইজ়রায়েলের কাছেও পাঠানো হয়েছে। মূল মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানও জানিয়েছে, শান্তি–সমঝোতা অবিলম্বে কার্যকর হবে। তবে এই এগ্রিমেন্ট নিয়ে অনেক ধোঁয়াশা রয়েই গিয়েছে। ফলে, দেশের মধ্যেও সমালোচনার মুখে পড়েছেন ট্রাম্প। নেটিজে়নদের অনেকেই মনে করছেন, এই এগ্রিমেন্টে সই করা আমেরিকার ‘কৌশলগত পরাজয়।’ আর ইরানের কিছু মিডিয়া প্রকাশ্যেই এই মউ-কে আমেরিকার ‘পরাজয়’ বলছে। মউ-এর ১৪ পয়েন্ট সম্বলিত আটশো শব্দের বয়ানটি প্রকাশ্যে আনা হয়েছে। এগ্রিমেন্টের মূল বিষয়গুলি হলো— হরমুজ় খোলা হবে, আমেরিকা ও আঞ্চলিক সহযোগী দেশ মিলে ইরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন ফান্ড তৈরি করবে। লেবাননেও সংঘর্ষ বন্ধ করতে হবে। ইরানের উপর থেকে আর্থিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে, ফলে ইরান তেল বিক্রি করতে পারবে এবং ইরান তাদের ফ্রোজ়েন অ্যাসেটে নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবে। তবে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির মতো অনেক স্পর্শকাতর বিষয় পরে বিশদে আলোচনার জন্য রাখা হয়েছে, আর তাতেই দানা বেঁধেছে বিতর্ক।
এগ্রিমেন্টের পয়েন্টগুলিতে বলা হয়েছে, অবিলম্বে লেবানন-সহ উপসাগরীয় এলাকায় সামরিক অভিযান বন্ধ হবে, আমেরিকা নৌ-অবরোধ তুলে নেবে, তেলবাহী ও বাণিজ্যতরীর যাতায়াত অবিলম্বে শুরু হবে। জলের নীচের মাইন ইত্যাদি আগামী ৩০ দিনের মধ্যে সরিয়ে দেবে ইরান। আমেরিকাও ইরানের কাছাকাছি এলাকা থেকে নিজের সেনা সরিয়ে দেবে। ইরান ও আমেরিকা পরস্পরের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করে পরস্পরের অভ্যম্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকবে। হরমুজে়র অধিকার এবং প্রশাসন নিয়ে ওমান ও উপকূলবর্তী দেশগুলির সঙ্গে ইরান আলোচনা করবে। ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত ও স্থায়ী চুক্তি করে ফেলতে হবে।
এগ্রিমেন্টে আরও বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদ ও ইন্টারন্যাশন্যাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সির ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সংক্রান্ত যত প্রস্তাব আছে, সেগুলি ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করার বিষয়েও আমেরিকা উদ্যোগী হবে। এগ্রিমেন্টে আছে, ইরান পরমাণু অস্ত্র নতুন করে তৈরি করবে না, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরানোর বিষয়ে ভাবনাচিন্তা হবে। সুতরাং, চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থিতাবস্থা বজায় থাকবে। ট্রাম্পের সমালোচকরা বলছেন, ইরান তো গত বছরেও রাষ্ট্রপুঞ্জে ঘোষণা করেছিল, তারা পরমাণু অস্ত্র বানাবে না। তা হলে নতুন কী হলো?
অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে মউ সই তো হলো, কিন্তু অনড় ইজ়রায়েলের ভূমিকা এ বার এই এগ্রিমেন্ট কার্যকর করতে সাহায্য করবে, নাকি বাধা তৈরি করবে, সেটাই বড় প্রশ্ন। কারণ, ইজ়রায়েল আগেই অনেকবার বলেছে হেজ়বোল্লার সঙ্গে তাদের যুদ্ধ চলবে। ইরানের মদতপুষ্ট হেজ়বোল্লাকে ইজ়রায়েল আক্রমণ করলে, পাল্টা ইরানও ইজ়রায়েলকে আক্রমণ করবে। সে ক্ষেত্রে এই হামলা-পাল্টা হামলার যে চক্র চলছে, যা বন্ধ করার জন্য এই মউ সই করা হলো, সেটা ভেস্তে যেতে পারে।
তবে ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে যে জ্বালানি সঙ্কট তৈরি হয়েছে, হরমুজ় খুলে গেলে তার অবসান হতে পারে। পরিস্থিতি পুরো স্বাভাবিক হতে অবশ্য সময় লাগবে। কারণ এটাও মাথায় রাখতে হবে এই এগ্রিমেন্ট শুধু একটি দীর্ঘমেয়াদি সংঘর্ষবিরতি ও স্থায়ী সমাধানসূত্র খোঁজার সূচনা। ইজ়রায়েল সহযোগিতা করবে কি না, তা–ও স্পষ্ট নয়। সব মিলিয়ে মনে সংশয় রেখেই ইতিবাচক ভাবে এই সমঝোতাপত্রকে দেখা উচিত বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞেরা।