২০২৬-এর ফিফা বিশ্বকাপে অদৃশ্য প্রতিপক্ষের দাপট, ভয়ে কাঁপছেন ফুটবলাররা
উত্তর আমেরিকায় জমে উঠেছে ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ (FIFA World Cup 2026)। আমেরিকা (United States), মেক্সিকো (Mexico) এবং ক্যানাডার (Canada) বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে থাকা স্টেডিয়ামে প্রথম বারের মতো ৪৮টি দল লড়ছে ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ট্রফির জন্য। তবে এবা রের বিশ্বকাপে ফুটবলারদের শুধু প্রতিপক্ষ দলের মোকাবিলা করলেই হচ্ছে না, তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে আরও এক কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বী— অসহনীয় গরম। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বেড়ে যাওয়া তাপমাত্রা মাঠের লড়াইকে আরও কঠিন করে তুলছে, যা অনেক ম্যাচের গতিপ্রকৃতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
নতুন এক সমীক্ষা বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত গরম এ বারের বিশ্বকাপের অধিকাংশ ম্যাচেই প্রভাব ফেলতে পারে। এমন কী খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সেও এর সরাসরি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বকাপের বেশির ভাগ ম্যাচেই গরমের প্রভাব
ক্লাইমেট সেন্ট্রাল নামে একটি সংস্থার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এ বারের বিশ্বকাপের প্রায় ৯৩ শতাংশ ম্যাচে এমন তাপমাত্রা দেখা যেতে পারে, যা খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলতে পারে। ১০৪টি ম্যাচের মধ্যে প্রায় অর্ধেক ম্যাচেই গরমের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। গবেষণা বলছে, এ সব ম্যাচে অন্তত ৫০ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে যে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে খেলোয়াড়রা নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দে খেলতে পারবেন না। গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ৯৭টি ম্যাচে এই ঝুঁকি গড়ে প্রায় ৮ শতাংশ বেড়েছে।
সংস্থার আবহাওয়াবিদ শেল উইঙ্কলি বলেন, ‘সংখ্যাটা হয়তো খুব বড় মনে না-ও হতে পারে। কিন্তু পুরো টুর্নামেন্টের হিসেবে দেখলে বোঝা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রায় সব ম্যাচেই খেলোয়াড়দের অতিরিক্ত গরমের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এখন এই গরমও মাঠের প্রতিপক্ষ দলের মতোই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।’
গরমে কেন কমে যায় খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীর যখন অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়, তখন পেশিতে রক্ত পৌঁছনো এবং শরীর ঠান্ডা রাখার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে শরীর নিজেই শক্তি বাঁচানোর চেষ্টা করে। ডক্টর গিবসন বলেন, ‘শরীর যখন অতিরিক্ত গরম থেকে নিজেকে বাঁচাতে ব্যস্ত থাকে, তখন পেশিতে রক্ত সরবরাহ কিছুটা কমে যেতে পারে। এর ফলে খেলোয়াড়রা নিজেরাই খেলার গতি কমিয়ে দেন বা কম পরিশ্রম করার চেষ্টা করেন।’ তাঁর মতে, এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যায় দ্রুত দৌড় এবং স্প্রিন্টের ক্ষেত্রে। গরমে খেলোয়াড়রা কম দৌড়ান, কম স্প্রিন্ট করেন এবং খেলার গতি তুলনামূলক ভাবে স্লো হয়ে যায়।
২০১৪ সালের বিশ্বকাপ নিয়ে করা একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, তাপমাত্রা ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে খেলোয়াড়দের মোট দৌড়ানোর দূরত্ব কমে যায়। শুধু তাই নয়, স্প্রিন্টের সংখ্যাও প্রায় ২২.৫ শতাংশ কমে যায়। অর্থাৎ স্বাভাবিক আবহাওয়ার তুলনায় প্রতি চারটি স্প্রিন্টের মধ্যে প্রায় একটি স্প্রিন্ট হারিয়ে যায়।
গরমে কারা পাবে বাড়তি সুবিধা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, যে দলগুলো আগে থেকেই গরম আবহাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে, তারা অন্যদের তুলনায় বড় সুবিধা পেতে পারে। বিশেষ করে ম্যাচের শেষ দিকে এই পার্থক্য আরও বেশি বোঝা যেতে পারে। এই প্রস্তুতির মধ্যে রয়েছে গরম পরিবেশে অনুশীলন, শরীরকে ধীরে ধীরে তাপমাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, পর্যাপ্ত জলপান করা এবং শরীর ঠান্ডা রাখার বিশেষ ব্যবস্থা। বরফ মেশানো পানীয়, শরীর ঠান্ডা রাখার পোশাক এবং ম্যাচের আগে নির্দিষ্ট পরিকল্পনাও এতে সাহায্য করতে পারে।
এ বারের বিশ্বকাপের ১৬টি স্টেডিয়ামের মধ্যে মাত্র তিনটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রার মধ্যে রয়েছে। ৯টি স্টেডিয়াম সম্পূর্ণ খোলা। ফলে খোলা মাঠগুলিতে গরমের প্রভাব অনেক বেশি অনুভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর প্রভাব ইতিমধ্যেই কিছু ম্যাচে চোখে পড়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। ব্রাজ়িল (Brazil) ও মরক্কোর (Morocco) ম্যাচটি ১-১ গোলে শেষ হয়েছিল। স্থানীয় ফুটবলপ্রেমী দীপঙ্কর সিংয়ের মতে, ম্যাচের শেষ দিকে খেলোয়াড়রা যেন শক্তি বাঁচিয়ে খেলছিলেন এবং ড্র ফল মেনে নেওয়ার দিকেই বেশি মনোযোগী ছিলেন। তাঁর ধারণা, টুর্নামেন্টের আরও অনেক ম্যাচেই এমন দৃশ্য দেখা যেতে পারে।