বাংলাদেশে থমকে গেল উচ্চতম রামমূর্তি নির্মাণের কাজ! ‘চরম আতঙ্কে’ মন্দির কমিটি
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পরে তারেক রহমান ঘোষণা করেছিলেন, দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে এই দেশ সবার জন্য নিরাপদ ভূমি হবে। কিন্তু মাত্র চার মাসের মাথায় ওপার বাংলায় সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার নিয়ে ফের বড় প্রশ্ন উঠে গেল। মৌলবাদী সংগঠনগুলির লাগাতার হুমকি ও ফতোয়ার জেরে মাঝপথেই থমকে গিয়েছে বাংলাদেশের উচ্চতম রামমূর্তি নির্মাণের কাজ। স্বভাবতই এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ভারতের কূটনৈতিক মহলেও।
২২ কোটির মেগা প্রকল্প!
NDTV এবং India Today-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের উত্তরের জেলা গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে ‘শ্রীশ্রী রাধা গোবিন্দ মন্দির কমিটি’-র উদ্যোগে একটি বিশাল মন্দির কমপ্লেক্স তৈরি করা হচ্ছিল। প্রায় ২২ কোটি বাংলাদেশি টাকা (ভারতীয় মুদ্রায় ১৫.৬ কোটি টাকা) ব্যয়ের এই মেগা প্রকল্পের মূল আকর্ষণ ছিল ৮১ ফুট উচ্চতার একটি রামের মূর্তি। কাজ সম্পূর্ণ হলে এটাই হবে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাম মূর্তি। এ ছাড়া সেখানে ৫০ ফুট উচ্চতার একটি কৃষ্ণমূর্তি ও ৩০ ফুট উচ্চতার একটি শিবমূর্তি তৈরির কাজও চলছিল।
বাংলাদেশর হিন্দুরা গাইবান্ধা জেলা তে প্রভু রামচন্দ্র ও হনুমান এবং শ্রী কৃষ্ণের বিশাল উঁচু মুর্তি নির্মাণ করেছেন।
অত্যন্ত প্রশংসনীয় উদ্যোগ ️তবে বাংলাদেশের মুসলিমরা তা ভেঙে ফেলতে রাস্তায় আন্দোলন শুরু করেছে। pic.twitter.com/R4JbkTuXhV
— ॐ••卐 (@Empire_hindu9) June 12, 2026
‘বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দাও!’
মৌলবাদীদের হুমকিতে সেই কাজ মাঝপথে থমকে গিয়েছে। মন্দির কমিটির অভিযোগ, চলতি সপ্তাহে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিয়ো ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে পড়েই এই জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ভিডিয়োটিতে এক কট্টরপন্থী নেতাকে প্রকাশ্য জনসভায় বলতে শোনা গিয়েছে, ‘এখানে রামের মূর্তি তৈরি হচ্ছে। ওটা বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিতে হবে। সরকার যদি না করে, তবে সাধারণ মানুষই ওটা ধ্বংস করে দেবে।’
এর পরেই মন্দির কমিটি রামমূর্তি মির্মাণের কাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। কমিটির উপদেষ্টা শ্যামলাল কুমার মহন্ত জানিয়েছেন, এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতেই তাঁদের এই পদক্ষেপ।
‘আমরা চরম আতঙ্কে’
তবে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন মন্দির কমিটির সভাপতি, হরিদাসচন্দ্র দাস। তিনি বলেছেন, ‘মূর্তি নির্মাণের প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি কিছু কট্টরপন্থী গোষ্ঠী মূর্তিটি ভেঙে ফেলার জন্য আমাদের উপরে গুরুতর চাপ সৃষ্টি করছে। আমরা চরম আতঙ্কের মধ্যে রয়েছি এবং বাধ্য হয়েই কাজ বন্ধ রেখেছি।’
Just because we don’t do mob violence doesn’t mean we have no religious feelings. You can’t keep insulting our religion & dishonoring Lord Ram.
We are staying silent only out of respect for the law, not out of fear. Otherwise…
……Hindu Sherni pic.twitter.com/jhlEO01WkU
— Voice Of BD Hindus (@HinduBdeshi71) June 16, 2026
প্রতিবাদ: শাহবাগে ‘মশাল মিছিল’
এই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশের পড়ুয়ারা। প্রথম গর্জে ওঠে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সনাতনী ছাত্র সমাজ। তার পরে এই প্রতিবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-সহ বাংলাদেশের অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। গত মঙ্গলবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়োকশো শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে এক বিশাল ‘মশাল মিছিল’ বের করে। রামমূর্তি নির্মাণের কাজ ফের চালুর দাবিতে ঢাকার ব্যস্ততম ‘শাহবাগ মোড়’ অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান তাঁরা।
সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ধর্মীয় বিদ্বেষের তীব্র নিন্দা করেছেন ‘নির্বাসিত’ লেখিকা তসলিমা নাসরিনও। এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি বাংলাদেশি মৌলবাদীদের, তালিবানদের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ২০০১ সালে বামিয়ানের বুদ্ধমূর্তি ধ্বংসের বর্বরতার সঙ্গে তুলনা করেছেন রামমূর্তি নির্মাণের বিরুদ্ধে ফতোয়া জারির এই মানসিকতাকে।
কড়া নজর সাউথ ব্লকের
এই বিষয়ে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনও মন্তব্য করা হয়নি। তবে সাউথ ব্লক সূত্রে খবর, এই ঘটনার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ভারত। অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে এই ঘটনা পর্যবেক্ষণ করছে নয়াদিল্লি।
হাসিনা সরকারের পতনের পরে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে চিন্ময় দাস প্রভুর মতো সনাতনী নেতার গ্রেপ্তারি এবং লাগাতার সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপরে হামলার ঘটনায় কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল ভারত।
তারেক সরকারের আমলে অবস্থার পরিবর্তন হবে বলে আশা করা হয়েছিল। তবে বাংলাদেশি সংখ্যালঘুদের সংগঠন, ‘বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ’-এর কেন্দ্রীয় কমিটির দেওয়া পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই বাংলাদেশে ১৩৩টি সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে। তারেক রহমান সকল সম্প্রদায়ের জন্য নিরাপদ দেশ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিলেও, সেখানকার মৌলবাদীদের ‘তালিবানি’ আস্ফালনে কোনও লাগাম যে লাগেনি, এই ঘটনাই তার প্রমাণ বলে দাবি করছেন ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।