বাড়িটাই যেন এক টুকরো ‘আর্জেন্টিনা’, নবাবগঞ্জে নাওয়া-খাওয়ার ফুরসত নেই ‘মেসির দাদার’, তাঁকে চেনেন?
‘ওরে, আমার ভাই হ্যাট্রিক করেছে।’ সকাল থেকে আনন্দে লাফাচ্ছেন ‘মেসির দাদা’। বিশ্বচ্যাম্পিয়ানের সঙ্গে অবশ্য মুখের মিল নেই তাঁর। লম্বা, সিড়িঙ্গে চেহারা। চুলগুলো কপালের উপরে আছড়ে পড়েছে। সরু গোঁফ। চায়ের দোকানে একটা হলুদ গেঞ্জি আর প্যান্ট পরে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন শিবশঙ্কর পাত্র। লোকে ডাকে ‘শিবেদা’ বলে। উত্তর ২৪ পরগনার নবাবগঞ্জের এই শিবেদাই ‘মেসির দাদা’।
কেমন দাদা? জ্যাঠতুতো, খুড়তুতো? নাকি লতায়-পাতায়? আজ্ঞে না, ওসব কিছুই নয়। তিনি মেসির ভক্ত। এতটাই যে আর্জেন্টিনার ফুটবলারকে নিজের ভাই মনে করেন তিনি। শিবশঙ্করের বাড়ি, একফালি চায়ের দোকান সবই মেসিময়। সব নীল-সাদা। তাঁর স্ত্রী স্বপ্না আর মেয়ে নেহাও মেসির ফ্যান। ভক্ত।
গঙ্গার ধারের সরু রাস্তা ধরে এগোলে প্রথমেই চোখে পড়বে আর্জেন্টিনার বিশাল পতাকা। এত বড় পতাকা যে দূর থেকে মনে হবে, ওই এলাকাটা সত্যিই আর্জেন্টিনা বুঝি। দু’পা এগোলেই নীল-সাদা রঙে মোড়া দোতলা বাড়ি। দেওয়াল, সিঁড়ি, দরজা, জানলা তো বটেই ড্রেসিং টেবিল মায় আলমারি, খাট — সবই আর্জেন্টিনার জাতীয় পতাকার রঙে রাঙানো।
বাড়ির সামনে আবার দাঁড়িয়ে আছেন মেসি নিজে। অবশ্য মূর্তি হয়ে। পাশেই চায়ের দোকান। তার নাম ‘আর্জেন্টিনা’। সেখানে চা কম, মেসির গল্প বেশি বিক্রি হয়। দোকানে ঢুকলেই বোঝা যায়, এখানে চায়ের কাপে শুধু দুধ-চিনি নয়, চার চামচ মেসি আর দু’চামচ আর্জেন্টিনাও মেশানো হয়। শিবে দা চা বানাতে বানাতে কখন যে মেসির ড্রিবলিং, ফ্রি-কিক আর বিশ্বকাপের স্মৃতিতে চলে যান, তা বোঝা দায়। ভাঁড়ের পর ভাঁড় উড়ে যায়।
বুধবার ভোরে আলজ়েরিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচে নেমেই হ্যাটট্রিক করেছেন মেসি। শিবেদাকে দেখলে মনে হবে, এই কৃতিত্ব তাঁর। সেই থেকে কোমরে হাত দিয়ে মেসি-ব্যাখ্যান চলছে। ম্যাচ শেষ হতেই এলাকার মানুষ তাঁর দোকানে ভিড় জমাতে শুরু করেছেন। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন, কেউ আবার এসে শুধু শিবেদার মুখের হাসিটা দেখছেন। কী তৃপ্তি, কী তৃপ্তি।
কলকাতায় মেসির বিতর্কিত সফরে শিবেদা গিয়েছিলেন, দেখা করেছিলেন। সেই স্মৃতি যক্ষের ধনের মতো আগলে রেখেছেন তিনি। এক কাপ চায়ে চুমুক দিয়ে আয়েশ করে সেই গল্প তিনি সবাইকে শোনান। যেন সব গতকালই ঘটেছে। সামনেই ২৪ জুন। মেসির জন্মদিন। তাই নবাবগঞ্জের আর্জেন্টিনা পাড়ায় এখন প্রস্তুতি তুঙ্গে। কেক কাটা হবে। মেসি অবশ্য এ সবের কিছুই জানেন না। তিনি তখন বিশ্বকাপ খেলবেন। সেটাই তো আসল।
আর্জেন্টিনা আর নবাবগঞ্জের দূরত্ব হাজার হাজার কিলোমিটার। কিন্তু শিবেদার মতো ফ্যানের কাছে সব তুচ্ছ। পৃথিবীর সব আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে শিবেদাই সম্ভবত একমাত্র ব্যক্তি, যিনি মেসিকে ‘আমার ভাই’ বলে ডাকতে পারেন। মেসি তাঁর হৃদয়ে থাকেন। তাঁর পরিবারের একজন। তাঁর ভাই। তিনি মেসির দাদা। ব্যস, এর থেকে বড় পরিচয় আর কিছু আছে?