এই বাটে যখন পায়ের চিহ্ন আর পড়ে না, সেই বিস্মরণ - 24 Ghanta Bangla News
Home

এই বাটে যখন পায়ের চিহ্ন আর পড়ে না, সেই বিস্মরণ

Spread the love

এই অনুযোগ ছদ্ম নয়। সত্য, সুন্দর ও ঈশ্বরের প্রতি পূর্ণ সমর্পিতপ্রাণ রবীন্দ্রনাথ জীবনের অপচয় কিংবা অপব্যবহারে ব্যথিত ছিলেন। তার উৎস তাঁর জিজীবিষা। ত্রিশ বছর পর তিনি ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন’ গানখানি লিখলেন ওই সুন্দরপূজক জিজীবিষু হৃদয় দিয়েই।

আমিত্বময়তা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে যে দেখা, তার মধ্যে বৈরাগ্য নয়, শোক নয়, আছে দর্পণের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রতিবিম্ববিহীন শূন্যতা প্রত্যক্ষ করা। সেখানে মৃত্যু নেই, আছে জীবনস্পর্শী মহিমময়তা। গানের বাণী অনুসরণ করে যে চিত্রলেখা রচিত হয়, তা অপরিসীম প্রাণপ্রৈতির প্রকাশ। তাই ধরে নেওয়া অমূলক নয়, গানখানি পৃথক ও স্বতন্ত্র সত্তা। রবীন্দ্রনাথের চিত্রধর্মী গানের মধ্যে এই সত্তারোপণীয়তা এক অনস্বীকার্য বৈশিষ্ট্য। ‘যখন পড়বে না মোর’ গানখানির দিব্যস্বরূপিণী ধরে, তার বাণীর অপব্যবহার ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে যে গানের কথা মনে এল, তার মধ্যে প্রণামের পর যে বিক্ষোভ, তা সুচেতনার পক্ষাবলম্বী হলেও তাতে ছবিয়ানা নেই, যেমন ছবি সাজিয়ে তুলছে ‘যখন পড়বে না মোর’ গান।

মানবমাত্রই নিজস্ব পরিবৈভব গড়ে নিতে চায়। উন্মাদ গাছতলাকেই নিরাপদ পৃথিবী বলে মানে। অনাথ শিশু পথপাশে পড়ে থাকা হিউম পাইপের মধ্যে আস্তানা বুঝে নেয়। কেউ চায় প্রাসাদ, কেউ ছোট্ট কুটির আর নদীর ঘাটের মধ্যে আঁটিয়ে নেয় আনন্দের ঐশ্বর্য। একদিন তার খেয়ার তরী জলের খেয়ালে দুলতে থাকবে একা। সব দেনা-পাওনা সাঙ্গ করে যে মহাজগতে মিশে গিয়েছে, তার কাম্য কিছুই নেই। এমনকী তাকে স্মরণ বা বিস্মরণ, কিছুতেই যায়-আসে না কিছু। এই উপলব্ধি মৃতের নয়, জীবিতের। সে আছে বলেই না-থাকার কল্পনা সুর ও বাণীর তুলিতে চিত্রায়ণে মগ্ন হয়েছে। যা কিছু তার প্রিয়, বিশেষ যত্নে যার থাকা সার্থক হয়ে ওঠে, সেগুলির পরিণতি আঁকা হচ্ছে নিষ্কাম মনের আলোয়। প্রিয় তানপুরাটির গায়ে জমে উঠবে ধুলো। কেউ তন্ত্রী বাঁধবে না, সুর সাধবে না। আজকের আদরের ঘরখানি বিজড়িত হবে আগাছায়, বুনো কাঁটালতার উপদ্রবে। ফুলের বাগানে গজিয়ে উঠবে অনাকাঙ্ক্ষিত গাছগাছড়ার ভিড়। দিঘির ধারে নিয়ম করে বসা, নিসর্গের সঙ্গে অন্তরঙ্গ কথালাপ ফুরিয়ে গেলে অনুপস্থিতি শ্যাওলা হয়ে ছেয়ে যাবে। এই কল্পময় আমি-বিযুক্তি কে করে? মৃত নয়, এ হলো জীবনপ্রেমীর সত্যবরণ। আমি আছি বলেই আমার বলে যা কিছু বুঝি, তার মূল্য আছে। এবং আমি আছি বলেই, অমোঘ অনুপস্থিতির মুহূর্তগুলি ছুঁয়ে দেখা সম্ভব হচ্ছে। এই আমির সামান্যতা স্বীকার করতে না পারা মূর্খের নিষ্ফল দম্ভ। আমি যে কেবল আমার কাছেই আমি। সেই আমিত্ব মুছে গেলে জগৎ পারাবারে কিছুই কম পড়ে না।

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *