দুর্নীতি ও হিংসার অভিযোগে পুলিশের জালে এক্স কাউন্সিলার, প্রধানের স্বামী-সহ ৫
এই সময়: তৃণমূলের শাসনকালের অবসানের পরে রাজ্যে আইন–শৃঙ্খলার কড়াকড়ি বাড়তেই জেলায় জেলায় শাসকদলের একাধিক নেতা ও জনপ্রতিনিধির কীর্তিফাঁস হতে শুরু করেছে। দুর্নীতি, তোলাবাজি, জালিয়াতি এবং ভোট–পরবর্তী হিংসার মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগে মঙ্গল ও বুধবারও গ্রেপ্তার হলেন বেশ কয়েকজন।
দুর্গাপুর পুরসভার ২০ নম্বর ওয়ার্ডের প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলার তথা ২ নম্বর বরো চেয়ারম্যান রমাপ্রসাদ হালদারকে গ্রেপ্তার করেছে দুর্গাপুর থানার পুলিশ। ২০২১–এর ভোট পরবর্তী হিংসা ও তোলাবাজি সমেত একাধিক অভিযোগে ১ জুন দায়ের হওয়া লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে মঙ্গলবার রাতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। বুধবার সকালে তাঁকে মহকুমা আদালতে নিয়ে আসার সময়ে ফরিদপুর ফাঁড়ির সামনে উপস্থিত বিজেপি কর্মীরা তাঁকে লক্ষ্য করে ‘চোর’ স্লোগান দেন এবং জুতো ছোড়ার চেষ্টা করেন।
আদালত চত্বরে দড়ি দিয়ে ব্যারিকেড করে রমাপ্রসাদের জন্য বেনজির নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়, যা নিয়ে বিজেপি কর্মী সুমনা ভট্টাচার্য বলেন, ‘পুলিশ তো জামাই আদর করে নিয়ে গেল রমাকে। কোমরে কেন দড়ি পরিয়ে নিয়ে যাবে না?’ আর এক বিজেপি কর্মী রোহিত মিশ্রর বক্তব্য, ‘২০২১–এ ভোটের পরে আমাকে ও আমার দলের একাধিক কর্মীকে মারধর করা হয়েছে রমাপ্রসাদের নেতৃত্বে। ওকে কোমরে দড়ি পরিয়ে বেনাচিতি বাজারে ঘোরানো দরকার।’ এ দিন আদালত তাঁকে পাঁচ দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে।
এক সময়ে বেনাচিতি এলাকায় কোচিং সেন্টার করে সেখানে ইংরেজি পড়াতেন রমাপ্রসাদ। ইংরেজির সেই পরিচিত শিক্ষক রমাপ্রসাদ ২০১১–য় তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর দলে যোগ দেন। এর পরে কাউন্সিলার ও বরো চেয়ারম্যান পদের প্রভাব খাটিয়ে তিনি প্রোমোটারি শুরু করেন। অসাধু প্রোমোটারদের সঙ্গে আঁতাত করে জোর করে জমি হাতিয়ে নেওয়া, অবৈধ ফ্ল্যাট তৈরি করে পরে পুরসভায় সামান্য জরিমানা দিয়ে তা বৈধ করা এবং প্রভাব খাটিয়ে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বিপুল টাকা রোজগারের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
বুধবার কাঁকসা ব্লকের ত্রিলোকচন্দ্রপুর পঞ্চায়েতের দোমড়া গ্রামের তৃণমূল নেতা উত্তম রুইদাসকে গ্রেপ্তার করেছে কাঁকসা থানার পুলিশ। এলাকার ত্রাস হিসেবে পরিচিত উত্তমের বিরুদ্ধে গ্রামে বাড়ি তৈরির সময়ে তোলাবাজি করার অভিযোগ রয়েছে। বুধবার সকালে উত্তমের বাড়ির পিছনে প্রচুর ভোটার ও আধার কার্ডের ফটোকপি পুড়তে দেখেন বাসিন্দারা। তাঁদের দাবি, এই ফটোকপি দেখিয়ে একশো দিনের ভুয়ো জবকার্ড তৈরি করে লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেছেন উত্তম। বাসিন্দারা পুলিশে খবর দেন। কাঁকসা থানার পুলিশ এসে উত্তমকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। পরে তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
ধৃত নেতার বাড়ির পিছন থেকে সরকারি ‘জল জীবন মিশন’ প্রকল্পের প্রচুর পাইপও উদ্ধার করা হয়েছে, যা তিনি প্রভাব খাটিয়ে নিজের হেফাজতে রেখেছিলেন বলে অভিযোগ।
বীরভূমের সাঁইথিয়া থানার পুলিশ চাল কেলেঙ্কারির অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে তৃণমূলের আমোদপুর অঞ্চল কমিটির সভাপতি রাজীব ভট্টাচার্য ও তাঁর ব্যবসায়িক অংশীদার চন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়কে। রাজীবের স্ত্রী কৃষ্ণা ভট্টাচার্য আমোদপুর পঞ্চায়েতের তৃণমূল প্রধান। রাজীব নিজে একাধিক চালকলের মালিক। গোরুপাচার মামলায় অনুব্রত মণ্ডলের নাম জড়ানোর পর থেকেই তিনি ইডি ও সিবিআইয়ের নজরে ছিলেন। খাদ্য সরবরাহ দপ্তরের অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি উদ্যোগে চাষিদের কাছ থেকে সহায়কমূল্যে ধান কিনে রাজীবের চালকলে পাঠানো হয়েছিল চাল তৈরি করে সরকারি গুদামে জমা দেওয়ার জন্য। কিন্তু তিনি প্রায় কোটি টাকার চাল সরকারি গুদামে জমা না–দিয়ে আত্মসাৎ করেন। বুধবার স্থানীয় একটি চালকল থেকে পুলিশ তাঁকে পাকড়াও করে।
এ দিকে, আবাস যোজনার ঘরের জন্য এক ব্যক্তির কাছ থেকে ভয় দেখিয়ে টাকা (কাটমানি) নেওয়ার অভিযোগে বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরের বেলশুলিয়া পঞ্চায়েত প্রধানের স্বামী নিতাই পৌলিককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। প্রভাব খাটিয়ে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্প থেকে দীর্ঘদিন ধরে কাটমানি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। স্থানীয় এক ব্যক্তির অভিযোগের ভিত্তিতে মঙ্গলবার রাতে বিষ্ণুপুর থানার পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে এবং বুধবার বিষ্ণুপুর মহকুমা আদালত তাঁকে চার দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেয়