‘আর শ্বাস নিতে পারছি না…’, ব্রিটেনে ছুরিকাঘাতে আহত যুবককেই গ্রেপ্তার পুলিশের, পরে মৃত্যু
জর্জ ফ্লয়েড থেকে এরিক গার্নারের স্মৃতি উস্কে দিল হেনরি নওয়াকের মর্মান্তিক পরিণতি। ব্রিটেন পুলিশের বডি ক্যাম ফুটেজে ধরা পড়েছে এক চাঞ্চল্যকর দৃশ্য। আহত এক যুবককে হাতকড়া পরিয়ে গ্রেপ্তার করছে পুলিশ। তিনি ছটফট করতে করতে বলছেন, ‘আমি আর শ্বাস নিতে পারছি না। আমাকে ছেড়ে দিন।’ ১৮ বছর বয়সি হেনরি নওয়াকের এটাই ছিল শেষ কথা। আহত যুবককে গ্রেপ্তারির ঘটনায় তুঙ্গে বিতর্ক।
ঘটনাটি ঘটেছে, গত বছরের ডিসেম্বরে ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটান শহরে। দুই যুবকের মধ্যে গন্ডগোলকে কেন্দ্র করে অশান্তি ছড়ায়। ব্রিটেনে এক তরুণকে ছুরি নিয়ে কোপানোর অভিযোগ ওঠে এক ভারতীয় বংশোদ্ভূতের বিরুদ্ধে। অভিযুক্তের সঙ্গে আহত সেই যুবককেও গ্রেপ্তার করেন পুলিশ বলে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কারণ, রক্তাক্ত অবস্থায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা ওই তরুণকে সাহায্য করার বদলে পুলিশ প্রথমে তাঁকেই হাতকড়া পরিয়েছিল। পরে প্রকাশ্যে আসা বডিক্যাম ফুটেজেও সেই ঘটনার সমর্থনেই তথ্য ব্রিটেনজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়েছে।
আদালতের তথ্য অনুযায়ী, ২৩ বছরের ভারতীয় বংশোদ্ভূত শিখ যুবক বিক্রম দিগওয়ার রাস্তার মধ্যে হেনরি নোয়াককে ধারালো অস্ত্র দিয়ে একাধিকবার আঘাত করে। গুরুতর জখম অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকা হেনরি বারবার পুলিশকে জানিয়েছিলেন, তাঁর কষ্ট হচ্ছে তাঁকে ছুরি মারা হয়েছে। কিন্তু ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ প্রথমে তাঁর কথায় বিশ্বাসই করেনি।
প্রকাশিত ভিডিয়োতে দেখা যায়, এক পুলিশ অফিসার হেনরিকে বলছেন, ‘তোমাকে ছুরি মারা হয়েছে? কোথায়? আমার তো তা মনে হচ্ছে না।’ এরপর রক্তাক্ত অবস্থাতেই তাঁকে হাতকড়া পরানো হয় এবং বসানোর চেষ্টা করা হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর অবস্থার অবনতি হয়। পরে পুলিশ CPR শুরু করলেও তাঁকে বাঁচানো যায়নি।
তদন্তে জানা যায়, হামলার পর বিক্রম পুলিশকে মিথ্যা অভিযোগ করেছিলেন যে হেনরি নাকি তাঁকে বর্ণবিদ্বেষী মন্তব্য করেছিলেন এবং তাঁর পাগড়ি খুলে দিয়েছিলেন। সেই অভিযোগ শুনেই পুলিশ প্রথমে হেনরিকেই সন্দেহভাজন হিসেবে ধরে নেয়। আদালত পরে স্পষ্ট জানায়, হেনরি কোনও বর্ণবিদ্বেষী মন্তব্য করেননি।
ব্রিটেনের আদালত এই মামলায় বিক্রম দিগওয়ারকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে। অন্তত ২১ বছর জেলে থাকতে হবে তাঁকে। বিচারক বলেন, অভিযুক্ত ধর্মীয় পরিচয় এবং বর্ণবিদ্বেষের অভিযোগকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। বিচারকের মন্তব্য, ‘এই ঘটনা শিখ সম্প্রদায়ের ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।’
মামলায় আরও বিতর্ক তৈরি হয়েছে ব্যবহৃত অস্ত্র নিয়ে। প্রথমদিকে একে কৃপাণ বা শিখ ধর্মীয় ছুরি বলা হলেও পরে ব্রিটেনের শিখ ফেডারেশন দাবি করে, এটি প্রচলিত ধর্মীয় কৃপাণ নয়, বরং তার থেকে অনেক বড় ও বেআইনি ধরনের ধারালো অস্ত্র।
ভিডিয়ো প্রকাশ্যে আসার পর ব্রিটেনে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রবল সমালোচনা শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী স্টার্মার ঘটনাকে ভয়ঙ্কর ও মর্মান্তিক বলে মন্তব্য করেছেন। হোম সেক্রেটারি ঘটনার পূর্ণ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
হ্যামশায়ারের পুলিশ ইতিমধ্যেই ক্ষমা চেয়েছে। জানা গিয়েছে, ঘটনাস্থলে থাকা এক পুলিশ অফিসার চাকরি ছেড়েছেন, যদিও অন্য অফিসারদের বিরুদ্ধে তদন্ত এখনও চলছে।
হেনরি নোয়াকের পরিবার জানিয়েছে, তাঁদের ছেলে ‘মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুবরণও করতে পারেনি।’ পরিবারের দাবি, শুধু খুনের বিচার নয়, পুলিশের আচরণেরও পূর্ণ ও স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া উচিত। একই সঙ্গে তাঁরা ব্রিটেনে বাড়তে থাকা নাইফ ক্রাইম-কে ’জাতীয় জরুরি পরিস্থিতি’ হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন।