টলিউডে কারা কালো টাকা সাদা করছেন? প্রশ্ন করতেই, বিস্ফোরক হিরণ | What did Hiran Chatterjee say about who is laundering black money in Tollywood
বাংলা ছবির মাধ্যমে কি কালো টাকা সাদা করা হচ্ছে?
বাংলা চলচ্চিত্রের নেপথ্যে কি তবে রুপোলি আলোর চেয়ে অন্ধকারের দাপটই বেশি? টলিউডের গ্ল্যামার আর সিনেমার চকমকে পর্দার আড়ালে কি আসলে ঘুরপাক খাচ্ছে কোটি-কোটি টাকার দুর্নীতি আর তার সূত্র ধরে আসা কালো টাকা? গত কয়েক বছর ধরে টলিপাড়ায় ফিসফাস চলছিল এসব প্রশ্ন ঘিরে। কখনও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ঘনিষ্ঠ প্রযোজকের জেলযাত্রা, কখনও বা গরু পাচার কাণ্ডের টাকা সিনেমার জগতে বিনিয়োগের অভিযোগ ঘিরে। এবার ফলতার বিডিও শানু বক্সী আর জাহাঙ্গির খানের চ্যাট সামনে আসার পরই টলিউডের অন্দরে ‘ব্ল্যাক মানি হোয়াইট কালচার’ যেন নতুন করে মাটি ফুঁড়ে বের হয়ে এলো। কারণ এই শানু বক্সীর স্বামী হলেন টলিউডের পরিচালক জিৎ চক্রবর্তী। যাঁর প্রযোজনায় কাজ করেছেন বিক্রম চট্টোপাধ্যায়। আবার যে পরিচালকের ‘আড়ি’ ছবিতে টাকা ঢেলেছিলেন প্রযোজক নুসরত জাহান এবং যশ দাশগুপ্ত। এই সাদা-কালো টাকার খেলায় কি রয়েছে টলিউডের আরও নাম? টিভি নাইন বাংলাকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে টলিউডের এই টাকার খেলা প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করতেই হিরণে স্পষ্ট জবাব, এটা নতুন নয়, গত বেশ কয়েক বছর ধরেই এটা চলছে। হিরণের কথায়, এর নেপথ্যে রয়েছে টলিউডের মেগাস্টার, মেগা প্রযোজকরাই!
কী বললেন হিরণ?
সিনেমা থেকে নিজেকে অনেকদিন ধরেই দূরে সরিয়ে নিয়েছেন হিরণ। বেশ কয়েকবছর ধরে তাঁর জ্ঞান-ধ্যান-মন পুরোটাই রাজনীতি। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে শ্যামপুর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছেন হিরণ। রাজনীতিতে মন থাকলেও, টলিউডের অন্দরের খবর নিয়ে সবসময়ই সচেতন তিনি, তা স্পষ্ট করেছেন। হিরণ বলেন, ”২০১১ সালের কিছুটা পর থেকে তৃণমূলের শাসনের যুগে বাংলা ছবিতে কালো টাকা ঢুকতে শুরু করেছিল। সেটা এমন পর্যায়ে চলে যায়, বাংলা ছবির একজন প্রযোজক, তখন তাঁকে বাংলা ছবির ধারক-বাহক বলা হত, তিনি এটার মধ্যে পুরোপুরি যুক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। এবং তার জন্য তাঁকে জেলবন্দি হতে হয়েছিল। এই বিষয়ে ইডির কেস চলছিল। তারপর তিনি জেল থেকে ছাড়া পান। তারপর কী হয়েছে, সেই সম্পর্কে বিস্তারিত জানি না। তাই মন্তব্য করব না। তবে এটা খুব দুঃখজনক যে, বাংলা ছবির অন্যতম প্রযোজক, এরকম দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিলেন।”
এরপরেই অভিনেতা সরাসরি দেবকে আক্রমণ করেন হিরণ। হিরণ বলেন, ”২০২৪-এর নির্বাচন যখন লড়তে যাই, তখন বিভিন্ন মহল থেকে, আমাকে জানানো হয়, আমার বন্ধু, এনামুল হকের (গরু পাচার কাণ্ডে জড়িত) থেকে টাকা নিয়েছেন। সেটা যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি বলেন, প্রমাণ দিতে পারলে, সিনেমা করা ছেড়ে দেবেন। তারপরই মাননীয় শুভেন্দুবাবু (শুভেন্দু অধিকারী), যিনি এখন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, তিনি টুইট করে হিসাব দিয়ে দেন, কীভাবে সেই ব্যক্তি টাকা নিয়েছিলেন। তারপর দেখাই গেল, তিনি টাকা নিয়েছেন। এরপর আর তাঁকে এই বিষয়ে মিডিয়া প্রশ্ন করেনি। সবাই চুপ করে গিয়েছিলেন। কিন্তু ২০২৪-এ ভোট লুঠ করে আমাকে হারানো হয়েছিল। লুঙ্গিবাহিনী দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে, আমার গাড়ি আটকে দিয়ে, ভোট লুঠ করা হয়। মানুষ তখন ভোট দিতেই পারেননি। সেজন্যই সাড়ে ৮ লক্ষ ভোট পেয়েছিলেন। আমি ৭ লক্ষের কাছে ভোট পাই। এবার ২০২৬-এ যখন মানুষ ভোট দিতে পারলেন, আপনারাই হিসাব করে দেখুন, ঘাটাল লোকসভা থেকে বিজেপি ৮ লক্ষ ৬৫ হাজার ভোট পেয়েছে। ৬ লক্ষের কিছু বেশি ভোট তৃণমূল পেয়েছে। তার মানে মানুষই ঘাটালে ওঁকে বিপুল ভোটে হারিয়ে দিয়েছেন। আমি এটাই বারবার বলেছি যে দীপক অধিকারী ঘাটালে ভোট লুঠ করে জেতেন।” হিরণের এই মন্তব্যের কথা দেবকে জানানো হলে, তিনি টিভি নাইন বাংলাকে জানিয়ে দেন, এই বিষয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া দেবেন না।
হিরণের কথায়, প্রাক্তন শাসকদলের ছত্রছায়ায় থেকে টলিউডের বহু প্রযোজকই দুনীর্তির খাতায় নাম লিখিয়েছেন। নাম না করে, বরং প্রিয় বন্ধু সম্বোধন করে হিরণ তাঁর মন্তব্যের উদাহরণ দিয়েছেন। হিরণ জানান, ”বাংলা ছবির অনেক প্রযোজকই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছেন। যে কারণে আমার প্রিয় বন্ধু, তাঁকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর প্রোপোজার হতে হয়েছে। মানে কতটা দুর্নীতির সঙ্গে ইন্ডাস্ট্রি জড়িয়ে গিয়েছে!”
তবে শুধুই প্রযোজক নন, দুনীর্তির প্রশ্নে হিরণ কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন টলিউডের এক দক্ষ অভিনেত্রী-সাংসদকেও। হিরণ বলেন, ”একজন দক্ষ অভিনেত্রী, যাঁকে আরজি কর কাণ্ডের প্রতিবাদ করতে দেখলাম না, বরং তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ হয়ে প্রচার করতে চলে গেলেন হেলিকপ্টার চড়ে। এতে বাংলা ছবির সঙ্গে জড়িত মানুষদের উপর, জনসাধারণের সম্মান কমে গিয়েছে। হয় আপনি পুরোপুরি রাজনীতি করুন, না হলে শুধু রাজনীতির ফায়দা নেব এবং আরজি করের মতো ঘটনার সঙ্গে যাঁরা জড়িত, তাঁদের থেকে সুবিধা নেব, আবার সিনেমা করব, দু’ টো জিনিস একসঙ্গে হয় না। এই জন্য ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়, একটা নিয়ম করা দরকার, সংসদে ৮০ শতাংশ হাজিরা দিতেই হবে। দীপক অধিকারীর সংসদে উপস্থিতির হার ১১ শতাংশ! মানুষ তো তাঁদের কথা বলার জন্যই, ভোট দিয়ে প্রতিনিধিকে নির্বাচিত করেন। তৃণমূলের কিছু বিধায়ক মানুষের হয়ে একটা কথাও বলেননি বিধানসভায় দাঁড়িয়ে। একজনকে বিধানসভা বদল করে মুসলিম প্রধান বিধানসভাতেও পাঠানো হয়েছে। তা-ও তিনি পরাজিত হয়েছেন।”
এরই সঙ্গে হিরণ যোগ করেন, ”পশ্চিমবঙ্গে গত ৬০ বছর ধরে ঠিক করে ভোট হয়নি। ৬০ বছরের আগে সুশাসন ছিল বলে আমি মনে করি। তারপর অরাজকতা চলেছে, অগণতান্ত্রিকভাবে ভোট হয়েছে, কেন্দ্রের সঙ্গে রাজ্যের ঝগড়ায় ক্রমাগত রাজ্য অর্থনৈতিকভাবে অস্বচ্ছল হয়েছে। সেই প্রভাব ছবির দুনিয়ায় পড়েছে। সাড়ে আটশো হল থেকে এখন ১২০টা সিনেমা হল। এই অবস্থায়, ভুলভাল মানুষ ঢুকবেনই। এখন হেরে যাওয়ার পর সেলিব্রিটিরা বলছেন, ‘আর রাজনীতি করব না, এখন শুধু অভিনয় করব।’ ওঁরা কি তাঁদের অতীতের দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারেন? আসলে ওঁরা সবাই মুখোশ পরে আছেন। ওঁরা স্বার্থপর, সুবিধাবাদী। রাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে নিজেদের কেরিয়ার তৈরি করেছেন। একজন প্রযোজক বাংলা ইন্ডাস্ট্রিকে শেষ করে দিয়েছেন! বাংলা ছবির অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ২১শে জুলাইয়ের মঞ্চে জোর করে নিয়ে গিয়েছেন। সেখান থেকে যাঁরা নিজেদের আটকে রেখেছেন, আমি তাঁদের শ্রদ্ধা করি। এখানে আমার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবেন না। আমি চিরকালই সিরিয়াসলি রাজনীতি করেছি। ছাত্র রাজনীতির সময় থেকে। আমি তাঁদের কথা বলছি, যাঁরা রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে, শুধু নিজেদের লাভ করেছেন। এই বিশ্বাস ব্রাদার্সের কথা হচ্ছে, তাঁদেরকে সেই প্রযোজকই সামনে এনেছেন। কাউকে মাথায় তুললে, সে তো মাথায় উঠে নাচবেই! একজন অবাঙালি ডিসট্রিবিউটর দালালি করেন, বাংলা ছবি চালাতে দেন না, হিন্দি ছবি চালান। এরা যা করেছেন, তাতেই আজকে ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা খুব খারাপ। ২০০৭ থেকে ২০২০ অবধি থেকে এটা অনুভব করেছি। আজকে যাঁরা সামনে আসছেন আন্দোলন করতে, তাঁদের দেখেছি, কীভাবে তৃণমূলের ঘনিষ্ঠ ছিলেন একটা সময়ে। ”
বিজেপির শাসনে কি টলিউডের এই দুনীর্তির চেহারার বদল ঘটবে?
হিরণের স্পষ্ট জবাব, ”আমাকে মুখ্যমন্ত্রী টলিউড সম্পর্কে যে দায়িত্ব দিয়েছেন, তারপর রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, রুদ্রনীল ঘোষ, পাপিয়া অধিকারীর উপস্থিতিতে শান্তনু বসুর সঙ্গে একটা মিটিং করেছি। আলাদা করে কোনও মিটিং করিনি। এটা একটা সামগ্রিক প্রয়াস। এখন অনেকেই বিজেপি হয়ে যাচ্ছেন। কিছু বেনোজল ঢুকছে। আর কিছু বলব না এখন। সব কিছু সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে বদল হবে।”