ইউনিয়নবাজি বন্ধ! শিল্প আনতে বার্তা শমীকের
এই সময়: বাংলাকে ‘ইনভেস্টর ফ্রেন্ডলি’ হিসেবে গড়ে তোলাই এই মুহূর্তে বিজেপির লক্ষ্য। ক্ষমতা বদলের পরে শিল্পপতি ও বণিক মহলকে বার্তা দিতে রাজ্যে নতুন জমি নীতি তৈরির প্রতিশ্রুতি আগেই দিয়েছিলেন বিজেপি রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। এ বার আরও এক ধাপ এগিয়ে বণিক মহলকে তিনি ইউনিয়নবাজিমুক্ত বাংলার স্বপ্ন দেখালেন। এরই সঙ্গে তাঁর আশা, তৃণমূলের আন্দোলনের ঠেলায় বাংলা ছেড়ে চলে যাওয়া টাটারা আবার এ রাজ্যে শিল্প গড়তে আসবে।
২০০৬–এ বাম জমানায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জঙ্গি আন্দোলনের জেরে সিঙ্গুরের বদলে গুজরাটে ন্যানো গাড়ির কারখানা তৈরি করেছিল টাটা। শুক্রবার কলকাতায় ‘মার্চেন্ট চেম্বার্স অফ কর্মাসের’ অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের বিজেপি রাজ্য সভাপতি বলেন, ‘টাটাদের সিঙ্গুরেই ফেরাব। গাড়ির কারখানা না হলেও অন্য কোনও কারখানা হবেই। এটা আমাদের চ্যালেঞ্জ। এ বিষয়ে কথাবার্তাও শুরু হয়ে গিয়েছে।’ এ দিন রাজ্যের পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল আর একটি বণিকসভা ‘বেঙ্গল চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’র (বিসিসিআই) এক অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিলেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই বাংলার বহু মানুষ বিভিন্ন রাজ্যে চাকরির খোঁজে গিয়েছেন। এ বার তা বন্ধ করা যাবে। বাংলাতেই শিল্প গড়ে উঠবে।’
রাজনৈতিক আন্দোলনের আঁচ বারবার পড়েছে বাংলার শিল্প–বাণিজ্য পরিস্থিতির উপরে। বাম জমানায় সিটু এবং পরবর্তীতে তৃণমূলের আমলে আইএনটিটিইউসির মতো শ্রমিক সংগঠনগুলির দাপট রাজ্যের বিভিন্ন কলকারখানার গেটে দেখেছেন দেশ–বিদেশের শিল্পপতিরা। গত ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনে শুধু ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের চোখরাঙানি নয়, সিন্ডিকেটরাজের দৌরাত্ম্যের মুখোমুখিও ব্যবসায়ীদের হতে হয়েছে। এ দিন বণিকমহলকে ভরসা জোগাতে তাই শমীক জানান, বিজেপির কোনও শ্রমিক সংগঠন নেই। সুতরাং বিজেপির কেউ কারখানার গেট ঘেরাও করতে আসবে না।
তাঁর কথায়, ‘একটা কথা খুব স্পষ্ট ভাষায় বলছি, আমাদের কোনও ট্রেড ইউনিয়ন নেই। শ্রমিকের অধিকার রক্ষা করার দায়িত্ব অন্য সংগঠনের আছে। তারা করবে। কিন্তু বিজেপির কোনও শ্রমিক সংগঠন নেই।’ বঙ্গ–বিজেপির সভাপতির সংযোজন, ‘আমাদের দলের কেউ শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর দাবি নিয়ে কারখানার গেটে আসবেন না। বিজেপির একজনও পার্টির লোককে চাকরি দেওয়ার দাবি নিয়ে ব্যবসায়ীদের উপরে চাপ তৈরি করবেন না।’ এরপরেই ঘুরিয়ে নিজের দলের একাংশের উদ্দেশে তাঁর সতর্কবার্তা, ‘যদি কোনও সাংসদ, বিধায়কও এ সব করেন, তবে তাঁর জায়গা কারখানার গেটে নয়, পুলিশ স্টেশনে হবে।’ শমীক জানান, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নির্দেশেই তিনি এ সব কথা বলছেন। তাঁর দাবি, ‘বিধানসভা ভোটের রেজ়াল্ট বেরনোর পরের দিন সকাল সাড়ে ন’টায় প্রধানমন্ত্রী আমাকে ফোন করে বলেন, পশ্চিমবঙ্গে কোনও ব্যবসায়ীর উপরে আক্রমণ চলবে না। তাঁদের কাছ থেকে জোর করে টাকা নেওয়া বরদাস্ত করা হবে না। একটা কারণেই উনি এ কথা বলেছেন। যাতে বাংলায় ফ্যাক্টরি থাকে। প্রধানমন্ত্রী আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন, বাংলাকে শিল্পবান্ধব করার জন্য যা করার, সব করতে হবে।’
একই সুর অগ্নিমিত্রারও। অন্য একটি বণিকসভার অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘বাংলার মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই এই পরিবর্তনের অপেক্ষায় ছিলেন। এটা শুধুমাত্র রাজনৈতিক পালাবদল নয়, এর সঙ্গে সঙ্গেই বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে সুযোগ, চাকরি এবং বিনিয়োগের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে চলেছে। যা আগামী দিনে বাংলার সন্তানদের ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল করতে চলেছে।’
হাতে বিজেপির পতাকা আর মাথায় গেরুয়া তিলক কেটে অনেকে ব্যবসায়ীদের উপর চড়াও হচ্ছে। নিজেদের বিজেপি নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে তারা ব্যবসায়ীদের কাছ থাকা টাকা দাবি করছে। রাজ্য বিজেপি দপ্তরে এ বিষয়ে একগুচ্ছ অভিযোগও জমা পড়েছে। বণিকমহলকে এঁদের বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে শমীক এ দিন বলেন, ‘আমরা আপনাদের একটা থ্রেট–ফ্রি সোসাইটি দিতে চাইছি। কিন্তু আপনারও আমাদের সহযোগিতা করুন। চার ঘণ্টার মধ্যে যাঁরা বিজেপি হয়ে ঝান্ডা নিয়ে কারখানাগুলির গেটে হাজির হয়েছেন, তাঁদের সম্পর্কে অভিযোগ করুন। মনে রাখবেন, ৪ মে বিধানসভার ভোটের ফল ঘোষণার পর থেকে বাংলায় আর কোনও সিন্ডিকেট নেই।’
স্পেশাল ইকোনমিক জ়োন (এসইজে়ড) ইস্যুতেও এ দিন নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন বিজেপি রাজ্য সভাপতি। মার্চেন্ট চেম্বার অফ কর্মাসের অনুষ্ঠানে তিনি কিছুটা আক্ষেপের সুরেই তিনি বলেন, ‘ফলতায় এসইজে়ড দুর্বল হয়ে গিয়েছে। আমার পার্টি এসইজে়ডকে শক্তিশালী করতে চায়।’ তাঁর প্রশ্ন, ‘কমিউনিস্টরা এসইজে়ডের বিরোধিতা কেন করেন, সেটা আমরা জানি। কিন্তু তৃণমূল কোনও নীতিগত কারণে নয়, শুধু সিন্ডিকেট সংস্কৃতি কায়েম রাখার জন্য বাংলায় এসইজে়ডের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল।’ শমীকের মতে, বাংলায় বিনিয়োগ বাড়াতে হলে ইউরোপ, আমেরিকার সঙ্গে সরাসরি বিমান সংযোগ প্রয়োজন। এ বিষয়ে বাংলার নতুন সরকার উদ্যোগ নিচ্ছে বলেও তিনি জানিয়েছেন। কলকাতা বিমানবন্দরে একটি রানওয়ের মাঝে একটি ধর্মীয় কাঠামো আছে। সেটা সরানোর বিষয়ে উদ্যোগ শুরু হয়েছেন বলেও শমীকের ইঙ্গিত।