মাটির দাওয়ায় ‘বন্ধু’র পাঠশালা, স্কুলছুটদের ফের বইমুখো করছেন অধ্যাপক
রূপক সরকার, বালুরঘাট
কলেজের ক্লাস শেষ হয়ে গেলে মোটরবাইক ছোটে গ্রামের দিকে। শিক্ষকের বাহন ভুট-ভুট শব্দ তুলে পাড়ায় ঢুকে গেলে সজাগ হয়ে ওঠে ছেলেমেয়েরা। তারা বসে যায় পড়াশোনা করতে। গ্রামের মাটির বাড়ির পাঠশালায়। বালুরঘাট ব্লকের অমৃতখণ্ড গ্রামপঞ্চায়েতের দিগড়া এলাকা আদিবাসী অধ্যুষিত।
এখানকার শিশুদের মধ্যে রয়েছে অনেক প্রতিভা, অনেক স্বপ্ন। কিন্তু বাড়িতে চিরন্তন দারিদ্র, সঠিক পরিবেশও নেই। তাই এই গ্রামের পড়ুয়ারা সহপাঠীদের থেকে পিছিয়ে পড়ছিল। স্কুলের বাইরে তাদের জন্য আলাদা করে গৃহশিক্ষক দেওয়ার মতো অর্থও পরিবারের নেই। এই পরিস্থিতিতে আদিবাসী গ্রামের কচিকাঁচাদের কাছে দেবদূত হয়ে এসেছেন দুলাল ‘বন্ধু’ স্যর। বালুরঘাট কলেজের অধ্যাপক ও মালঞ্চার বাসিন্দা দুলাল বর্মন প্রায় আট বছর ধরে এই গ্রামের ছেলেমেয়েদের বন্ধু হয়ে উঠেছেন।
প্রতিদিন বিকেলে সময় পেলেই তিনি দিগড়া গ্রামে ছুটে যেতেন। প্রত্যেকের খোঁজখবর নিতেন। বয়সে অনেকটা বড় হলেও তিনি শিশুদের সঙ্গে বন্ধুর মতোই মিশতেন। ফলে সকলেই তাকে স্যর, দাদা, কাকু না বলে ‘বন্ধু’ বলে ডাকত। নিজের জন্মদিনেও তিনি এই শিশুদের সঙ্গে কেক কেটে হইহুল্লোড় করে কাটাতেন। প্রতি বছর বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে দুলাল তাদের নতুন জামা ও শিক্ষা সামগ্রী দিতেন।
এ ভাবে সম্পর্ক ক্রমশ দৃঢ় হয়। দুলাল স্যর সিদ্ধান্ত নেন, শুধু বন্ধুর মতো মেলামেশা নয়, এ বার ছেলেমেয়েদের বিনামূল্যে পড়াবেন। দিগড়া গ্রামে প্রায় ১০০-১৫০ ঘর আদিবাসী পরিবারের বাস। গ্রামবাসীর অধিকাংশ দিনমজুর, কেউ রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। সংসারের নিত্য অনটনের মধ্যে শিশুরা ছোটবেলাতেই অভাবের বাস্তবতা বুঝে যায়। তাদের হাতে বইয়ের বদলে কাজের দায়িত্ব উঠে আসে, ফলে পড়াশোনা গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে।
এই পরিস্থিতি বদলে দিতে প্রায় তিন-চার মাস আগে দুলাল বর্মন দিগড়া গ্রামে ‘বন্ধু পড়াঘর’ নামে একটি শিক্ষাকেন্দ্র খোলেন। যেহেতু শিশুরা তাঁকে বন্ধু বলে ডাকে, তাই তিনি ভালোবেসে এই নাম দেন। সেই বন্ধু এখন হয়ে উঠেছেন ‘স্যর’। প্রথমে অল্প কয়েক জনকে নিয়ে শুরু করলেও এখন সেখানে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ১৮ জন পড়াশোনা করে। প্রতি সপ্তাহের সোম ও বৃহস্পতিবার বিকেলে কলেজ শেষ করে দুলাল এখানে পড়াতে আসেন। ছুটি পেলেও আসেন। গ্রামের এক জনের বারান্দায় মাদুর পেতে বাচ্চাদের পড়ান।
বিকেলে তার মোটরবাইকের আওয়াজ পেলেই ‘বন্ধু পড়াঘর’- এর শিক্ষার্থীরা ছুটে আসে। শুধুমাত্র শিক্ষাদানই নয়, তিনি বাচ্চাদের হাতে প্রয়োজনীয় শিক্ষা সামগ্রীও তুলে দেন। এ ভাবে স্কুলছুটদেরও বইমুখো করেছেন স্যর। শিশু ও তাদের অভিভাবকরা শিক্ষককে ‘বন্ধু’ হিসেবে পেয়েখুশি। পড়ুয়া সঞ্জিত টুডু বলে, ‘অনেক দিন আগে আমি পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিলাম। নিজের নামও লিখতে পারত না। দীর্ঘদিন দুলাল স্যরের কাছে পড়াশোনা করার পরে এখন বাংলা ও ইংরেজিতে নিজের নাম লিখতে শিখেছি।’
অভিভাবক ফুলমণি বেসরা বলেন, ‘আমরা স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই মাঠে কাজ করি। ছেলেমেয়েরা কী পড়াশোনা করছে, তা দেখার সময় বা গৃহশিক্ষক দেওয়ার মতো পরিস্থিতি আমাদের নেই। স্যর ছেলেমেয়েদের বিনাপয়সায় পড়াচ্ছেন, আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।’ দুলাল বর্মনও গ্রামের মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে খুশি। তাঁর কথায়, ‘এই শিশুদের মধ্যে অনেক প্রতিভা আছে। ভবিষ্যতের আলো লুকিয়ে রয়েছে। প্রয়োজন শুধু একটু পাশে দাঁড়ানো ও সাহস দেওয়ার। এতে সমাজ এগোবে। দারিদ্র ঘুচবে।’