৩ টাকা দামি তেল, তবুও কি সঙ্কটে রাশ? - 24 Ghanta Bangla News
Home

৩ টাকা দামি তেল, তবুও কি সঙ্কটে রাশ?

Spread the love

এই সময়: হরমুজ় প্রণালী দিয়ে তেল আমদানি ‘থমকে’ যাওয়ার পরেই দেশে জ্বালানির দামবৃদ্ধির আশঙ্কা ইতিউতি উঁকি দিচ্ছিল। সেটাই সত্যি হলো শুক্রবার। কেন্দ্রীয় তেল মন্ত্রক এক বিবৃতিতে জানাল, দেশে পেট্রল ও ডিজ়েলের দাম লিটার প্রতি ৩ টাকা বাড়ানো হচ্ছে। এতে কলকাতায় লিটার প্রতি পেট্রলের নতুন দাম হয়েছে ১০৮.৭৪ টাকা, ডিজ়েলের ৯৫.১৩ টাকা। যদিও ডোমেস্টিক গ্যাসের দাম নিয়ে আপাতত কিছু জানায়নি কেন্দ্র।

ইউএস-ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক সময়ে প্রায় ৭০% বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বের একাধিক দেশ এর মধ্যেই জ্বালানির দর বাড়িয়েছে। ইউএসে তেলের দাম চড়েছে ৪৪%, সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে বেড়েছে ৫২%। ঘরের পাশে পাকিস্তান-বাংলাদেশেও বেড়েছে জ্বালানির দাম। এত সবের পরেও ৭৬ দিন ধরে দেশবাসীকে জ্বালানিক্ষেত্রে যুদ্ধের আঁচ বুঝতে দেয়নি কেন্দ্র। দেশের তেল বিপণন সংস্থাগুলিকে বর্ধিত দরে তেল কিনতে হলেও, তার প্রভাব গ্রাহকদের ‘পাস-অন’ না করায় দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ ১,০০০-১,২০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল—সম্প্রতি এই দাবি করেছিলেন কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী।

তবে সেই ক্ষতির পরিমাণ ক্রমশ অসহনীয় স্তরে পৌঁছে যাচ্ছে দেখে বাধ্য হয়ে দীর্ঘ চার বছরেরও বেশি সময় পরে পেট্রল-ডিজ়েলের দাম বাড়াতে হলো বলেই শুক্রবার জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় কয়লা ও খনিমন্ত্রী জি কিষণ রেড্ডি। তাঁর দাবি, এ বিষয়ে আসল পরিস্থিতি জনতাকে বোঝানোর বদলে ভুল তথ্য পরিবেশন করা হচ্ছে একাধিক মহল থেকে। তাঁদের উস্কানিও দেওয়া হচ্ছে।

শুক্রবারের দাম বৃদ্ধির পরে আমজনতার মনে অবধারিত ভাবে উঠে আসছে একটা প্রশ্ন, তেলের দাম কি আরও বাড়বে?

কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত কী হবে, তা নিয়ে অনুমান না করে বাজার বিশেষজ্ঞদের দাবি, বর্তমানে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দর ব্যারেলপ্রতি ১০৮-১০৯ ডলারে ঘোরাফেরা করছে। ফেব্রুয়ারির শেষে যুদ্ধ শুরুর সময়ে যা ৬৯ ডলার ছিল। ভারত দেশের জ্বালানি চাহিদার ৮৫% আমদানি করে। ফলে পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০ ডলার করে বাড়লে দেশের আমদানি খরচ বাড়ে প্রায় ১,৪০০ কোটি ডলার (১৩,৪২৭ কোটি টাকা মতো) করে। সেখানে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে অনেকটা উঠে যাওয়ায়, ক্রমশ বাড়ছিল দেশের কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতির পরিমাণ। ফলে বর্তমান দামের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বিক্রির দর ‘ব্রেক-ইভেন’ স্তরে আনতে গেলেও অঙ্কের বিচারে তেল সংস্থাগুলিকে লিটারপ্রতি আরও ১২-১৪ টাকা দাম বাড়াতে হবে। তা না হলে এই খাতে বড় অঙ্কের ‘আন্ডার রিকভারি’ (বিক্রয় মূল্য ক্রয় মূল্যের থেকে বেশি) নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে না। পরবর্তীকালে যুদ্ধ থেমে যাওয়ার পরে বিশ্ববাজারে দামে ছেঁকা কমলে, এ নিয়ে ফের ভাবনা-চিন্তা করা যেতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের একাংশের দাবি, হরমুজ় জটে বিশ্বজুড়ে টান পড়েছে জ্বালানির সাপ্লাই চেনে। বিপুল প্রিমিয়াম দিয়ে দেশগুলিকে কিনতে হচ্ছে তেল। এর ব্যতিক্রম নয় ভারতও। যে পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতির উপরে কী পরিমাণ ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলছে, তা বোঝার জন্য একাধিক অর্থনৈতিক সূচক রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, বর্ধিত দরে তেল কিনতে গিয়ে টাকার নিরিখে ডলারের দাম পৌঁছে গিয়েছে ৯৬ টাকার সর্বকালীন শিখরে। কেন্দ্রীয় সরকার তেলের দাম এর পরেও না বাড়ালে দেশের মূল্যবৃদ্ধি পরিস্থিতি লাগামছাড়া স্তরে চলে যাওয়ার পাশাপাশি তলানিতে নেমে আসতে পারে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাঁড়ার। দীর্ঘমেয়াদি যে বড়সড় ক্ষতি থেকে তখন দূরে রাখা যাবে না দেশবাসীকে। যে সম্ভাবনা এড়াতে এখনই জ্বালানির দাম কিছুটা বাড়ালে আগামী দিনে তা আমজনতার জন্য তুলনায় কম ক্ষতিকারক প্রমাণিত হবে।

অবশ্য জ্বালানির ছেঁকা যাতে দেশবাসীকে তেমন প্রভাবিত করতে না পারে, সে জন্য গত রবিবারই জ্বালানি ব্যবহারে ‘সংযমী’ হওয়ার বার্তা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। জানিয়েছিলেন জ্বালানি ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সঙ্কটের সময়ে আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে বেশি করে গণপরিবহণ ও মেট্রো ব্যবহার করতে। যারপর নিজের কনভয়ে গাড়ির সংখ্যায় বড় কাটছাঁট করার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। পরে যে পথে হাঁটেন একাধিক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা। কনভয়ে গাড়ি কমিয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও।

যদিও শুক্রবার কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্তকে কড়া ভাষায় নিন্দা করেছেন লোকসভায় বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। এক্স হ্যান্ডলে তিনি লিখেছেন, ‘দেশবাসীকে কেন্দ্রের ভুলের দাম চোকাতে হচ্ছে। ৩ টাকার ধাক্কা এসেই গিয়েছে, বাকিটাও ধাপে ধাপে আসছে।’

আবার সরকারের তরফে পাল্টা দাবি করা হয়েছে, ইউএস (৪৪.৫%), ইউকে (১৯.২%), ফ্রান্স (২০.৯%), জাপানের (৯.৭%) মতো দেশকে যেখানে পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতিমধ্যেই তেলের দাম বাড়াতে হয়েছে, সেখানে ভারতে দাম বৃদ্ধির পরিমাণ নগণ্য (৩.২%)। বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থনীতিকে বাঁচাতে হলে এই পদক্ষেপ করা জরুরি ছিল। যদিও দেশবাসীর অাশঙ্কা, দেশে ৬৫% পণ্য পরিবহণ যেখানে সড়কপথে হয়, সেখানে ডিজ়েলের দাম বৃদ্ধিতে আগামী দিনে দাম বাড়তে চলেছে প্রায় সব পণ্যেরই। ফলে সবাই এখন হরমুজ় জট কেটে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে।

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *