মোদীর ‘আশ্বাসে’ ভরসা বাংলার, জনতাকে হাঁটু গেড়ে প্রণাম প্রধানমন্ত্রীর
এই সময়: তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছে বঙ্গবাসী। কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ ঢেলে ভোট দিয়েছে বিজেপিকে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘ভরসা–আশ্বাসে’ ভরসা রেখেছেন বাংলার সাধারণ মানুষ। সরকার উল্টে দেওয়া বাংলার সেই জনতার সামনে তাই মাথানত করলেন মোদী।
শনিবার কলকাতায় ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। সেই অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন নমোও। গত ২৭ এপ্রিল বাংলায় ভোট প্রচারের শেষ দিন ব্যারাকপুরে জনসভা করেন মোদী। বাংলা দখলের প্রশ্নে তাঁর এতটাই আত্মবিশ্বাস ছিল যে, ওই সভা থেকে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, বাংলায় বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে তাঁকে কলকাতায় আসতে হবে। তাঁর এই ঘোষণার পরে বঙ্গ–বিজেপির অনেক প্রবীণ নেতাও চমকে গিয়েছিলেন। ঘনিষ্ঠ মহলে তাঁরা প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘৪ মে ফল ঘোষণার পরে যদি দেখা যায়, তৃণমূলই ফের বাংলার ক্ষমতায় এসেছে, তা হলে প্রধানমন্ত্রীকে নানা রকম তির্যক মন্তব্যের সম্মুখীন হতে হবে।’
কিন্তু শেষ পর্যন্ত নমোর আত্মবিশ্বাসেরই জয় হয়েছে। বিজেপিই বাংলার ক্ষমতায়। ফলে শনিবার ব্রিগেডে শুভেন্দু অধিকারীদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে মোদীর উপস্থিতি ছিল যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী দুঁদে রাজনীতিবিদ। তিনিও বিলক্ষণ জানেন, বাংলার জনমত জোড়াফুল শিবিরের দিকে গেলে কতটা মুখ পুড়ত তাঁর। এ দিন তাই ব্রিগেডের মঞ্চে পশ্চিমবঙ্গের জনগণের সামনে মাথানত করে হাঁটু মুড়ে বসে প্রণাম করতে দেখা যায় নরেন্দ্র মোদীকে। আলাদা করে মোদী কোনও ভাষণ দেননি এ দিন। কিন্তু নতজানু হয়ে প্রণামের মাধ্যমে বঙ্গবাসীকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন তিনি। সেই প্রণামের ভিডিয়ো তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থেকেও পোস্ট করা হয়েছে। ক্যাপশনে লিখেছেন, ‘আমি পশ্চিমবঙ্গের জনশক্তির কাছে মাথানত করছি।’ এ দিন ব্রিগেডের মঞ্চে উঠে প্রথমেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান মোদী। হাতজোড় করে বিশ্বকবিকে প্রণামও করেন। শনিবার ২৫ বৈশাখ, রবীন্দ্রজয়ন্তী। সে কথা মাথায় রেখেই এই দিনটিকে বিজেপি সরকারের শপথগ্রহণের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে।
মোদীর প্রধানমন্ত্রিত্বকালে বিজেপির মুকুটে অনেক পালক জুড়েছে। কিন্তু শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের পশ্চিমবঙ্গ জয়ের স্বপ্ন কিছুতেই পূরণ হচ্ছিল না পদ্ম শিবিরের। ২০২৬–এর বিধানসভা ভোটে শেষমেশ বাংলা দখলের পরে আবেগ চেপে রাখতে পারেননি নমোও। ভোটের ফল ঘোষণার দিন বাঙালি পোশাকে সেজেছিলেন মোদী। ধুতি-পাঞ্জাবি পরে দিল্লি থেকে ভাষণ দিয়েছিলেন তিনি। এ বার কলকাতায় এসে বাংলার মানুষকে নতজানু হয়ে প্রণাম করা থেকেই স্পষ্ট বিজেপির বাংলা দখল তাঁর কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, একগুচ্ছ কেন্দ্রীয় নেতা এ দিন ব্রিগেডে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে হাজির হলেও ময়দান চত্বরে ছিল ভরপুর বাঙালিয়ানা। মঞ্চের আশপাশে বসেছিল ২০টি ঝালমুড়ির স্টল এবং ছ’টি মিষ্টির দোকান। এ ছাড়াও বিদ্যাসাগর, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাদ সাহার পোর্ট্রেট রাখা ছিল মঞ্চের এক পাশে। শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে হাজির বিজেপি কর্মী–সমর্থকদের চমকে দিয়ে দর্শকদের ভিড়ের মাঝখান দিয়ে হুডখোলা জিপে চেপে ব্রিগেডে প্রবেশ করেন মোদী। তাঁর দু’পাশে ছিলেন বঙ্গ–বিজয়ের দুই প্রধান কারিগর শুভেন্দু অধিকারী এবং শমীক ভট্টাচার্য।
মোদী, অমিত শাহ ছাড়াও, বিজেপির রাজ্য ও কেন্দ্রের শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকেই ছিলেন ব্রিগেডে। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির মুখ্যমন্ত্রীরা বিশেষ অতিথি হয়ে এসেছিলেন কলকাতায়। অতিথিদের তালিকায় ছিলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীন, কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং, অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা, অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু, ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা। প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা এনসিপি নেতা প্রফুল্ল প্যাটেল, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধরি, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নড্ডা, স্মৃতি ইরানি, শিবরাজ সিংহ চৌহান, মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবীশ, মিঠুন চক্রবর্তীরাও এ দিন মঞ্চে ছিলেন। বাংলার নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে কাছে টেনে উত্তরীয় পরিয়ে দেন আদিত্যনাথ। এ দিন সন্ধ্যায় ভবানীপুরে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি ঘুরে কালীঘাট মন্দিরে পুজো দেন বাংলার নতুন মুখ্যমন্ত্রী।