এফডিআই নীতি শিথিলে লাভ দেশের স্টার্টআপ সংস্থাগুলির
এই সময়: ভারতীয় সংস্থাগুলিতে চিনা লগ্নি নিয়ে দীর্ঘদিন কঠোর অবস্থান নিলেও সম্প্রতি তা কিছুটা শিথিল করেছে কেন্দ্র। দেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে চিনের সঙ্গে যোগ রয়েছে এমন মূলধন প্রবেশের ক্ষেত্রে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল সরকার। সম্প্রতি এই সংক্রান্ত প্রেস নোট ৩-এ সংশোধন আনা হয়। সংশোধিত প্রেস নোট ৩ কাঠামো কার্যকর হওয়ার ফলে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে বলে মনে করছে শিল্পমহল। বিশেষ করে যে সমস্ত গ্লোবাল ভেঞ্চার ক্যাপিটাল এবং প্রাইভেট ইক্যুইটি ফান্ডে সামান্য চিনা অংশীদারিত্ব রয়েছে, তাদের জন্য দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং অনিশ্চয়তার জট কিছুটা কাটতে পারে বলেই আশা করা হচ্ছে।
১ মে থেকে কার্যকর হওয়া এই নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনও বিদেশি সংস্থায় চিন বা হংকং-এর যোগ রয়েছে এমন সংস্থা বা প্রাইভেট ইক্যুইটি অথবা ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডের ১০ শতাংশ পর্যন্ত শেয়ারহোল্ডিং থাকলে এবং যে শিল্পক্ষেত্রে ওই বিনিয়োগ আসতে চলেছে, সেই ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় রুটে বিদেশি বিনিয়োগের অনুমোদন থাকলে, সেই সংস্থাও অটোমেটিক রুটে ভারতে বিনিয়োগ করতে পারবে। পাশাপাশি বৈদ্যুতিন যন্ত্রাংশ, ক্যাপিটাল গুডস ও পলিসিলিকনের মতো উৎপাদন নির্ভর ক্ষেত্রে বিনিয়োগ প্রস্তাবের নিষ্পত্তির জন্য ৬০ দিনের নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে সরকার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদক্ষেপ সরাসরি চিনা বিনিয়োগের অবাধ প্রবেশের ইঙ্গিত নয়, বরং আন্তর্জাতিক তহবিল দেশে আনার বাস্তব একটি প্রয়াস।
প্রসঙ্গত, ২০২০ সালে গলওয়ান উপত্যকায় ভারতীয় সেনার সঙ্গে চিনের সেনাবাহিনীর সংঘর্ষের পরে ভারতের সঙ্গে স্থল-সীমান্ত ভাগ করে নেয় এমন দেশগুলি থেকে আসা বিনিয়োগের উপরে কড়া নজরদারি শুরু করে সরকার। এর জন্যই প্রেস নোট ৩ চালু করা হয়। কিন্তু, পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, শুধুমাত্র চিন নিয়ন্ত্রিত তহবিলই নয়, এর ফলে বহু আন্তর্জাতিক তহবিল সমস্যার মুখে পড়ছে। কারণ, তাদের পার্টনার সংস্থাগুলিতে সামান্য চিনা অংশীদারিত্ব থাকলেও অনুমোদনের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হচ্ছিল।
ভারতের স্টার্টআপ শিল্পক্ষেত্রে চিনা বিনিয়োগ এক সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। ২০১৬ সালে এই বিনিয়োগের পরিমাণ ৪৫৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার থাকলেও ২০১৯ সালে তা বেড়ে ৩.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়ায়। আলিবাবা, টেনসেন্ট-এর মতো সংস্থাগুলি পেটিএম, ওলা, জ়োম্যাটো, স্যুইগি, বিগবাস্কেট, বাইজ়ুস এবং উড়ানের মতো ভারতীয় স্টার্টআপে বিনিয়োগ করেছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, সেই বিনিয়োগ শুধু মূলধনের জোগান-ই দেয়নি, বরং স্টার্টআপগুলির মূল্যায়ন, প্রতিযোগিতায় টক্কর দেওয়া এবং দ্রুত চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা পালন করেছিল।
কর্পোরেট গভর্ন্যান্স বিশেষজ্ঞ শ্রীরাম সুব্রহ্মণ্যমের মতে, বহুস্তরীয় তহবিল কাঠামোয় প্রকৃত মালিকানা শনাক্ত করা এখনও চ্যালেঞ্জের বিষয়। যদিও ভারতের ব্যাঙ্কিং ও অর্থপাচার রোধী ব্যবস্থাকে যথেষ্ট উন্নত বলেই তিনি মনে করেন।
আইন বিশেষজ্ঞ সলমন ওয়ারিসের মতে, নতুন নিয়মের ফলে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার গতি ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেন্দ্র আসলে একটি ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা চালাচ্ছে। এক দিকে সরাসরি চিনা বিনিয়োগের দরজা বন্ধ রাখা, অন্য দিকে, আন্তর্জাতিক মূলধন প্রবেশে অযথা বাধা কমানোই সরকারে মূল লক্ষ্য। এর কারণ, গত কয়েক বছরে চিনা পণ্যের উপরে ভারতের নির্ভরতা কমেনি বলেই দেখা গিয়েছে। অথচ, আন্তর্জাতিক তহবিল নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে পড়েছে। তাই বিদেশি বিনিয়োগ টেনে ঘরোয়া ভ্যালু অ্যাডিশন বাড়ানোর পথেই এখন বেশি জোর দিচ্ছে কেন্দ্র। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যই আগামী দিনে ভারতের স্টার্টআপ দুনিয়ার উপরে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে তাঁদের দাবি।