ওগো, তোমার চক্ষু দিয়ে মেলে সত্য দৃষ্টি…
বৈজয়ন্ত চক্রবর্তী
প্রচ্ছদে ‘চারুলতা’য় মাধবী মুখোপাধ্যায়ের ক্লোজ়-আপ। চারু দেখছে। ওই চোখজোড়ার থেকে নজর সরিয়ে নেওয়া কঠিন। পশ্চাৎ-প্রচ্ছদে সত্যজিৎ। তাঁর চোখ নীচের দিকে, তাঁর ছবিতে নিমগ্ন। তিনি আঁকছেন। এই দু’টি ছবি এবং বইটির নাম থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায় মূল সুরটি। তবে ‘দেখা’ শব্দটির ব্যঞ্জনা হয় তো এ ক্ষেত্রে সীমিত। প্রকৃত প্রতিশব্দ বোধ হয় ‘বীক্ষণ’, যেমন আলোচ্য বইটির একটি প্রবন্ধের অন্তিম বাক্যটি হলো: ‘মানববীক্ষণে বাস্তব থেকে গভীরতর বাস্তবোত্তরে পৌঁছোনোয় এই মহান শিল্পীর অনুধ্যানে কোনও ফাঁকি ছিল না।’ হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শব্দকোষ’ অনুযায়ী ‘বীক্ষণ’ শব্দের একটি অর্থ ‘পরীক্ষণ’। অর্থাৎ, শুধু ক্যামেরার লেন্স নয়, কী ভাবে সত্যজিতের মন ও মস্তিষ্কের চক্ষুদ্বয় বিচার করছে তাঁর সমসময়কে এবং ইতিহাসকে, বিষয়কে এবং বিষয়ীকে, তা নিয়ে কথাবার্তা বলাই লেখকের অভীষ্ট।
লেখক যদিও ফরাসি ভাষাবিদ এবং সাহিত্য-চিন্তক হিসেবেই সুখ্যাত, কিন্তু তাঁর সত্যজিৎ-চর্চাও দীর্ঘ দিনের। ১৯৭৭ সালে তিনি সেন্ট জ়েভিয়ার্স কলেজ পত্রিকার জন্য সত্যজিৎ রায়ের সাক্ষাৎকার নেন। পরে বাংলায় অনুবাদ করেন রবিন উড-এর ‘দি অপু ট্রিলজি’। কিন্তু যেহেতু সাহিত্যেই তাঁর মূল অভিনিবেশ, কাজেই চলচ্চিত্রের সঙ্গে সাহিত্যের একটা কথোপকথন চলতে থাকে বইটিতে। এই কথোপকথনের ফলে শুধু চলচিত্রই নয়, কবিতার কিছু লাইনও অন্য এক চিত্ররূপ পায়। যেমন, ‘জলসাঘর’ প্রসঙ্গে তিনি বলছেন, ‘ঝাড়লণ্ঠনের দুলুনির সামনে মনে পড়ছে শঙ্খ ঘোষের কবিতার একটি কথা: ‘শূন্যে কালপুরুষের তরবারি’’। কিংবা ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’র সেই বহুচর্চিত পাখির ডাক প্রসঙ্গে জীবনানন্দ: ‘আবহমান ইতিহাসচেতনা একটি পাখির মতো যেন’। অন্য শিল্পকলার রেফারেন্সও আসতে থাকে প্রায়শ। ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ প্রসঙ্গেই লেখক বলেনঃ ‘এত মৃত্যুক্লান্ত কঙ্কাল একসঙ্গে দেখেছে কি কেউ বিশ্বচলচ্চিত্রে, ক্ষোভিত সময়গ্রন্থি ছুঁয়ে? এ যেন চলচ্চিত্রের পর্দায় আঁকা গোইয়ার ছবি’। একটি পৃথক অধ্যায়ই নিবেদিত রদ্যাঁর ভাস্কর্য এবং সত্যজিৎ-চিত্রের অন্তর-সম্পর্কের আলোচনায়। সঙ্গীতের কথা তো এসেছেই, কারণ স্বয়ং সত্যজিৎ কবুল করেছিলেন যে পাশ্চাত্য ক্লাসিকাল মিউজিক-এর কাঠামো তাঁর নির্মাণের উল্লেখযোগ্য প্রেরণা। চলচ্চিত্রের সঙ্গে অন্যান্য শিল্পধারার কথালাপই এই বইটি থেকে বড় প্রাপ্তি।
বইটি মোট চব্বিশটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত। তার মধ্যে চোদ্দটি অধ্যায়ের দৃষ্টি নির্দিষ্ট এক-একটি সিনেমার উপর নিবদ্ধ: ‘দেবী’, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’, ‘মহানগর’, ‘চারুলতা’, ‘নায়ক’, ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’, ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, ‘সীমাবদ্ধ’, ‘জন অরণ্য’, ‘সদগতি’, ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’, ‘ঘরে বাইরে’ এবং ‘আগন্তুক’। এ ছাড়া চারটি অধ্যায় সত্যজিৎ রায়ের সংলাপ রচনা নিয়ে। এই আলোচনাটি জরুরি, কারণ সিনেমার সংলাপ কী করে লিখতে হয়, সত্যজিতের এক-একটি সিনেমা তার মাস্টারক্লাস। তবে বইয়ের রসটি গম্ভীর গোত্রের হওয়ার ফলেই বোধ হয় এই অংশ বাদ পড়েছে এমন দু’টি সিনেমা যাদের সংলাপ এখন প্রত্যহের বাঙালি জবানের অংশ— ‘সোনার কেল্লা’ এবং ‘হীরক রাজার দেশে’। পূর্বোল্লিখিত রদ্যাঁ-বিষয়ক অধ্যায়টি বাদ দিলে বাদ বাকি পাঁচটি অধ্যায়ে সত্যজিৎ-দৃষ্টির মূল্যায়ন সামগ্রিক— ‘সত্যজিৎ রায়: দেখার দৃষ্টি’, ‘শতবর্ষে: লেন্স-আয়নার সামনে’, ‘সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে মৃত্যু’, ‘জাঁ রনোয়ার-এর দৃষ্টিপ্রদীপ ও সত্যজিৎ রায়’ এবং ‘সত্যজিৎ রায়: কয়েকটি জাদু-মুহূর্ত’। এর মধ্যে রনোয়ার-সংক্রান্ত অধ্যায়টি গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে লেখক দেখিয়েছেন যে সত্যজিতের উপর হলিউডি প্রভাবের তত্ত্বটি আদতে অতিকথন, রনোয়ার-এর সংস্পর্শে আসার পর তিনি সেই মুগ্ধতা থেকে বেরিয়ে আসেন।
যেহেতু বইটির বিষয়বস্তু ‘দেখা’, অতএব এই বইতে সংযোজিত ছবিগুলি পাঠকের রেফারেন্স হিসেবে জরুরি ছিল। সে দিকে মনোনিবেশের জন্য প্রকাশক সংস্থাকে সাধুবাদ। অন্তে কিঞ্চিৎ অনুযোগ। যেহেতু লেখাগুলি বিভিন্ন সময়ে নানা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত, অতএব সেই রেফারেন্সগুলি থাকা উচিত— কবে কোন পত্রিকায় নিবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছে। তার সূত্র ধরেই অনুযোগের দ্বিতীয় অংশ— যেহেতু বইটি একটি সঙ্কলন, অতএব অনেক ক্ষেত্রেই একই কথা নানা লেখায় পুনরাবৃত্ত হয়েছে। সম্পাদনা আরও একটু পরিশ্রমী হলে এই নির্মাণের চেহারাও আরও নির্মেদ হতে পারত।