Matua: মতুয়া আসলে কারা? - Bengali News | Who are the people of Matua community in West Bengal, what does history saying - 24 Ghanta Bangla News
Home

Matua: মতুয়া আসলে কারা? – Bengali News | Who are the people of Matua community in West Bengal, what does history saying

Spread the love

ভোট এলেই বারবার উঠে আসে ওদের কথা। আগেও সিএএ-এনআসির সময়েও তাঁদের নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চড়েছিল উত্তেজনার পারদ। এবারও তার অন্যথা হয়নি। সঙ্গে আবার জুড়ে গিয়েছে এসআইআর প্রসঙ্গ। রাজনৈতিক বিরোধ তো আগে থেকেই ছিল, এবার এই এসআইআর ইস্যুতেই আড়াআড়ি ভাগ হয়ে গিয়েছে শান্তনু ঠাকুর ও মমতাবালা ঠাকুরের শিবির। অনশনেও বসেছিলেন তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ তথা মতুয়া মহাসংঘের সংঘাধিপতি মমতাবালা ঠাকুর। তাঁর আশঙ্কা এসআইআর হলে সবথেকে বেশি বাদ পড়বে মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষের নাম! 

কারা মতুয়া? 

যাঁদের নিয়ে এত বিতর্ক, এত চাপানউতোর,সেই মতুয়া কারা জানেন? মতুয়াদের সম্পর্কে জানতে হলে আমাদের যেতে হবে বৈষ্ণব ধর্মের আদিতে। এই ধর্ম সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিষ্ণু বা তাঁর অবতারগণ আদি তথা সর্বস্তরের ঈশ্বর রূপে পূজিত হন। উঁচু হোক বা নিচু সমস্ত বর্ণের মানুষের এখানে রয়েছে সমান অধিকার। শাস্ত্র অধ্যায়নের অধিকার থেকেও কেউ বঞ্চিত নন। কিন্তু আচমকা কেন দ্রুত গতিতে এই ধর্মমতের প্রসার ঘটতে থাকে আদি বঙ্গে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পিছনেও রয়েছে ভারতে লাগাতার বিদেশিদের আক্রমণের ইতিহাস। ১০০০ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দের পর থেকে আক্রমণের ধার অনেকটাই বেড়ে যায়। ব্রিটিশ শাসন শুরুর আগে পর্যন্ত নিম্ন বর্ণের প্রচুর হিন্দুর ধর্মান্তকরণের ঘটনাও ক্রমেই বাড়তে থাকে। সঙ্গে গোটা সমাজেই জাঁকিয়ে বসেছিল কুসংস্কার আর জাতপাতের বেড়াজাল। আর এই কয়েকশো বছরেই ক্রমেই ঢাল হিসাবে উঠে আসে বৈষ্ণব ধর্ম। ধর্মান্তকরণ আটকাতে বড় ভূমিকা নেয়। হিন্দু ধর্মের এক বিশাল অংশের মানুষ বৈষ্ণব ধর্মমতের আধারে এসে ধর্মান্তকরণের হাত থেকে রক্ষা পায়। 

১৮১২ খ্রিস্টাব্দে অবিভক্ত বাংলার গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী থানার অন্তর্গত ওড়াকান্দির পার্শ্ববর্তী সফলাডাঙ্গা গ্রামে এক বৈষ্ণব পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর। বাবা যশমন্ত বৈরাগী, মা অন্নপূর্ণা বৈরাগী। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানে ওই এখন যাকে বলে স্কুল-কলেজের পাঠ, সেটা তাঁর কোনওদিনই হয়নি। কিন্তু প্রেম-ভক্তির কথা সহজ-সরলভাবে প্রচার করতেন। বৈষ্ণব বাড়িতে জন্ম হওয়ার কারণে শাস্ত্র আলোচনার মাধ্যমে হিন্দু ও বৌদ্ধ শাস্ত্র সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। তাঁর হাত ধরেই প্রবর্তিত সাধন পদ্ধতিকে বলা হত মতুয়াবাদ। আর এই মতুয়াবাদের অনুসারীরাই এখন মতুয়া নামে পরিচিত।

মতুয়া শব্দের অর্থ কী? 

মতুয়া শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে এর আসল অর্থ। যার অর্থ মেতে থাকা বা মাতোয়ারা হওয়া। হরিনামে যিনি মেতে থাকেন বা মাতোয়ারা হন, তিনিই মতুয়া। মতুয়ারা মূলত একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী। বৈদিক ক্রিয়াকর্মে বিশেষ বিশ্বাস নেই। তাঁদের ভজন সাধনের মাধ্যমই হল নামসংকীর্তন। তাঁদের বিশ্বাস ভক্তিই হচ্ছে মুক্তির পথ। এই সাধন পদ্ধতির মাধ্যমে সত্য দর্শন অর্থাৎ ঈশ্বর লাভই তাঁদের মূল লক্ষ্য। তাঁরা মনে করেন প্রেমই ঈশ্বর লাভের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। এর জন্য কঠিন সাধনা ব্যাতিরেকে আদর্শ গৃহস্থ জীবনযাপনও সেরা অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। মানে কেউ পারিবারিক-সাংসারিক জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে সহজেই মতুয়া ধর্মমতের চর্চা করতে পারেন। 

হরিচাঁদ ঠাকুরের দুই ছেলে গুরুচাঁদ ও উমাচরণ। সামাজিক বৈষম্যের কারণে গুরুচাঁদ ও উমাচরণও প্রথাগত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। তবে বাবার আদর্শে শুরু থেকেই দীক্ষিত ছিলেন। হরিচাঁদের মৃত্যুর পর মতুয়া ধর্মের উন্নতি সাধন, অনুন্নত শ্রেণীর শিক্ষা বিস্তার ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের উপর আলাদা করে জোর দেন গুরুচাঁদ ঠাকুর। সামাজিক বাধা অতিক্রম করে ১৮৮০ সালে ওড়াকান্দিতে প্রথম স্কুল তৈরি করেন তিনিই। তাঁর প্রচেষ্টাতেই ১৮ বছরের মধ্যে এটি প্রাথমিক স্তর হতে উচ্চ বিদ্যালয়ে পরিণত হয়। অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ ও শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে গণ-আন্দোলনের সূচনাতেও বড় ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। বিশেষ জোর দিয়েছিলেন শিক্ষা বিস্তারে। নানা ক্ষেত্রের তথ্য বলছে জীবনভর তিনি ১৮১২টি প্রাথমিক স্কুল বা পাঠশালা প্রতিষ্ঠা করেন। সবই বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে। 

একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বলছে ১৮৭১ সালের জনগণনায় ফরিদপুরের চণ্ডাল জনসংখ্যা ১ লক্ষ ৫৬ হাজার, তাদের মধ্যে স্কুল বা পাঠশালায় যায় মাত্র দুশো জন। সেখানে ব্রাহ্মণ, কায়স্থদের ছায়া মাড়ানোও তাঁদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। নমশূদ্র মানেই ওই চণ্ডাল। মনুস্মৃতির বিধানে, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র এই চার বর্ণেরও নীচে তার অবস্থান। তীব্র এই সামাজিক বেড়াজালের মুখে পড়েও হার মানেননি গুরুচাঁদরা। ওড়াকান্দি গ্রামে নিজেদের বসতবাড়িতে ইংরেজদের সহায়তায় স্কুল তৈরি করেন। জোর দেওয়া হয় সমাজের নিম্নবর্গের শিক্ষায়। বিশেষজ্ঞরা বলেন এই কারণেই স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে পূর্ববঙ্গের নমশূদ্র উদ্বাস্তুরা এপারে এসে বগুলা, মাজদিয়া, বিজয়গড়, অশোকনগরের মতো এলাকায় যখন থাকতে শুরু করেন তখন চাঁদা তুলে হলেও স্কুল, কলেজ গড়ার চেষ্টা করতেন।

১৮৮১ সালে গুরুচাঁদের উদ্যোগে ও সভাপতিত্বে খুলনার দত্তডাঙ্গায় প্রথম নমশূদ্র মহাসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর আন্দোলনের সফল্যস্বরূপ ১৯১১ সালের জনগণনায় নমশূদ্র নামটি পরিচিতি লাভ করেছিল। তাঁর মৃত্যুর পর এই আন্দোলনের দায়িত্ব নেন বাংলার বিখ্যাত রাজনীতিবিদ প্রমথ রঞ্জন ঠাকুর। তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রার্থী হিসাবে ১৯৬২ সালের নির্বাচনে হাঁসখালি থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হন। 

মতুয়াদের বারোটি নিয়ম পালন করতে হয় জীবনভর। যা ‘দ্বাদশা জ্ঞান’ নামে পরিচিত। এই ধর্মে নারী-পুরুষের সমান অধিকার পুরো মাত্রায় স্বীকৃত। একইসঙ্গে বিধবা বিবাহকে উৎসাহিত ও বাল্য বিবাহের বিরোধিতাও স্পষ্টভাবে করা হয়েছে।

মতুয়াদের ১২টি নিয়ম 

১. সর্বদা সত্য কথা বলা এবং সততার সঙ্গে জীবনযাপন করা

২. সকল নারীর প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করা, বিশেষ করে তাঁদের মায়ের মতো দেখা

৩. সকল মানুষকে ভালবাসা এবং অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া

৪. সর্বদা নৈতিক ও পবিত্র জীবনযাপন করা

৫. মাদক এবং সকল প্রকার নেশা থেকে দূরে থাকা

৬. ঈশ্বরের প্রতি গভীর বিশ্বাস রাখা 

৭. সর্বদা সত্যের পথে থাকা

৮. পরিবারের প্রতি নিজের দায়িত্ব পালন করা

৯. নারী ও পুরুষের সমান অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া

১০. সকল প্রকার কুসংস্কার এবং কুপ্রথা ত্যাগ করা 

১১. সমাজে বিধবা বিবাহকে উৎসাহিত করা 

১২. বাল্যবিবাহকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা 

মতুয়াদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ শ্রী শ্রী হরি লীলামৃত। শুধু পুরুষরাই নন, নারীরাও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই ধর্মের প্রচার করতে পারে। ধর্মপ্রচারককে বলা হয় গোঁসাই। মতুয়ারা প্রতি বুধবার একত্রিত হয়ে হরিচাঁদ ঠাকুরকে স্মরণ করেন। হরিস্মরণের গোটা কর্মকাণ্ডকে বলা হয় হরিসভা। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে তাঁরা নাম-কীর্তন করে। কীর্তনের সময় তাঁরা জয়ঢঙ্কা, কাঁসর, শঙ্খ, শিঙ্গা ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করেন। গোঁসাইদের হাতে থাকে ছ’হাত দীর্ঘ একটি দণ্ড, যার নাম ছোটা। এই ছোটা নিয়ে তাঁরা আগে আগে যান এবং ভক্তরা তাঁদের অনুসরণ করে। তাঁরা সাদা রঙে বেষ্টিত লাল নিশান ও গলায় করঙ্গের মালা ধারণ করেন। দেশ বিভাগের পর মতুয়া মহাসংঘের প্রধান কেন্দ্র গড়ে ওঠে বাংলার উত্তর ২৪ পরগনা জেলার ঠাকুরনগরে। মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে পশ্চিমবঙ্গের ঠাকুরবাড়ি বর্তমানে অন্যতম প্রধান তীর্থকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে বিধানসভা থেকে লোকসভা ভোট, নির্বাচনী রাজনীতির অন্যতম ভরকেন্দ্রও এখন এই ঠাকুরনগর।  প্রতি বছর চৈত্র মাসে মতুয়া সম্প্রদায়ের গুরু হরিচাঁদ ও তাঁর পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুরের আদর্শে মতুয়া ধামে মতুয়া মহামেলা বসে। যা মূলত বারুণী মেলা হিসাবে পরিচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *