In Depth on Sheikh Hasina: শেখ হাসিনা: হাসি থেকে ফাঁসি-কিন্তু বৃত্ত সম্পূর্ণ হল না… – Bengali News | In Depth on Sheikh Hasina: Sheikh Hasina, First Bangladesh Former PM who was Given Death Sentence, What Crime did she Commit?
বাংলাদেশ যে রায়ের অপেক্ষা করছিল, সেই রায়ই দিল বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল। বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিল ট্রাইবুনাল। বাংলাদেশের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এবং বাংলাদেশ পুলিশের প্রাক্তন আইজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকেও দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড ও প্রাক্তন আইজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে ৫ বছরের সাজা দেওয়া হল। রায় শুনে শেখ হাসিনা বলেছেন, বিচারের নামে সাজানো প্রহসন হয়েছে। ফাঁসির সাজা পক্ষপাতদুষ্ট। অন্তর্বর্তী সরকারের খুনি মানসিকতার প্রমাণ। ট্রাইব্যুনালের ফাঁসির সাজা ঘোষণার অধিকার নেই। কী কী অপরাধে সাজা পেলেন হাসিনা?
২০২৪ সালের জুলাই মাস। কোটা সংস্কার আন্দোলনে উত্তাল তখন বাংলাদেশ। সেই সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটার বিরোধিতা করা আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে বলেছিলেন, “মুক্তিযোদ্ধার পরিবার সংরক্ষণ পাবে না তো কি রাজাকারের সন্তানরা সংরক্ষণ পাবে”। এই মন্তব্যেই আগুনে ঘৃণাহুতি হয়। হাসিনার বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে আপামর ছাত্র-যুবরা। হাসিনা তার বক্তব্যের সাফাই দিলেও কোটা সংস্কার আন্দোলন ততক্ষণে ছাত্র-গণ আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। হু হু করে বিক্ষোভের আগুন ছড়াতে থাকে। ছাত্রদের বিক্ষোভ মিছিলে চলে গুলি। এরপর আন্দোলন আরও জোরদার হয়। শেষে প্রবল বিক্ষোভ প্রতিবাদের মুখে পড়ে ২০২৪ সালের ৫ অগস্ট বাংলাদেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা। দেশ ছাড়ার আগে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দেন।
হাসিনার দেশ ছাড়ার পর তৈরি হয় অন্তর্বর্তী সরকার। এই সরকারের মাথায় বসেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মহম্মদ ইউনূস। তারপর আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালে মামলা দায়ের হয় হাসিনার বিরুদ্ধে। গত জুন থেকে এই মামলার শুনানি চলছিল। কিন্তু দেশে নেই শেখ হাসিনা। তাই আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও পাননি তিনি। গণ-অভ্যুত্থানের সময় হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় মোট পাঁচটি অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন। গত ১২ মে প্রতিবেদন জমা দেয় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। মোট ৮ হাজার ৭৪৭ পৃষ্ঠার অভিযোগ আনা হয়। আদালতে শোনানো হয় হাসিনার ভাইরাল অডিয়ো ক্লিপও যেখানে তিনি গুলি চালানোর নির্দেশ দিচ্ছেন।
আজ, ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদার, বিচারপতি মহম্মদ শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মহম্মদ মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী এই মামলার রায়দান করেন। ৪৫৩ পাতার রায়। সেই পাতার ছত্রে ছত্রে রয়েছে হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ, ষড়যন্ত্র। রায়ে আদালত বলেন, শেখ হাসিনা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন। একইসঙ্গে আসাদুজ্জামান খান কামাল, চৌধুরী মামুনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রমাণ মিলেছে। যেহেতু বাংলাদেশ পুলিশের প্রাক্তন আইজি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন রাজসাক্ষী হয়ে সত্য উন্মোচন করেছেন, তাই মামুনের অপরাধের সাজা সর্বোচ্চ হলেও সত্য উন্মোচন করায় তার সাজা কম হবে।
শেখ হাসিনাই বাংলাদেশের প্রথম প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী যাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মোট তিনটি অভিযোগের সাজা ঘোষণা করা হয়েছে। দুটি অভিযোগে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেওয়া হয়েছে। একটি অভিযোগে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয়েছে।
কী কী অভিযোগ-
প্রথম অভিযোগ: গত বছরের ১৪ জুলাই গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারী ছাত্র-ছাত্রীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ ও ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ উল্লেখ করে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। এর পরিপ্রেক্ষিতে আসাদুজ্জামান খান, চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনসহ তৎকালীন সরকারের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্ররোচনা, সহায়তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও আওয়ামী লিগের সদস্যরা ব্যাপক হারে ও পদ্ধতিগতভাবে নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর আক্রমণ করে। অভিযোগ, গুলি করে ১৪০০ ছাত্র-জনতাকে হত্যা করা হয়। আহত হন প্রায় ২৫ হাজার।
দ্বিতীয় অভিযোগ: হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের নির্মূল করার নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আইজিপি তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন বাহিনীর সদস্যদের মাধ্যমে সেই নির্দেশ কার্যকর করেন। গত বছরের ১৪ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য এএসএম মাকসুদ কামাল এবং ১৮ জুলাই ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রাক্তন মেয়র ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে কথাও বলেন শেখ হাসিনা। দুজনের সঙ্গে কথোপকথনের পৃথক অডিয়ো রেকর্ড থেকে জানা যায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও অন্যান্য বাহিনীকে মারণাস্ত্র ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছিলেন খোদ হাসিনা।
শেখ হাসিনার সেই নির্দেশ তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপির মাধ্যমে সব বাহিনীর কাছে দেওয়া হয়। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও তার অন্যান্য শাখা সংগঠনের কাছেও এই নির্দেশ চলে যায়। এরপরই মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়। এর দায়ে তাদের (হাসিনা, আসাদুজ্জামান ও মামুন) বিরুদ্ধে সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটির (সর্বোচ্চ দায়) আওতায় অভিযোগ গঠন করা হয়।
তৃতীয় অভিযোগ: রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় শেখ হাসিনার পাশাপাশি আসাদুজ্জামান ও মামুনকে অভিযুক্ত করা হয়।
চতুর্থ অভিযোগ: রাজধানীর চানখাঁরপুলে আন্দোলনরত নিরীহ-নিরস্ত্র ছয়জনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায়ও শেখ হাসিনাসহ তিনজনকে অভিযুক্ত করা হয়।
পঞ্চম অভিযোগ: আশুলিয়ায় নিরীহ-নিরস্ত্র ছয়জনকে হত্যার আগুনে পোড়ানোর ঘটনায়ও অভিযুক্ত হয়েছেন শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান ও মামুন।
কী করবেন হাসিনা?
প্রসিকিউশন জানিয়েছে, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান সুপ্রিম কোর্টে আপিল করার সুযোগ পাবেন না, কারণ এরা পলাতক। ট্রাইব্যুনাল আইন অনুযায়ী, অপরাধীকে রায় দেওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হবে। আপিল করতে হলে অপরাধীকে আত্মসমর্পণ করতে হবে। গ্রেফতার হলেও আপিলের সুযোগ পাবেন অপরাধী।