Nobel Peace Prize: ‘ডাহা ফেল’ ট্রাম্প! ওবামারা কীভাবে পাশ করেছিলেন? – Bengali News | In Depth: These four US Presidents won the Nobel Peace Prize, Donald Trump not among them
ওয়াশিংটন ও স্টকহোম: চলতি বছরের নোবেল পুরস্কারের কোন ক্যাটেগরি ঘিরে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ তৈরি হয়েছিল? এই প্রশ্নের উত্তর বোধহয় সবারই জানা। আর তার নেপথ্যে একজনই। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রাজনীতির কারবারি, কূটনীতিক থেকে সাধারণ মানুষ, প্রায় সবার কৌতূহল ছিল নোবেল শান্তি পুরস্কারকে ঘিরে। এবছর পুরস্কার ঘোষণার আগে নোবেল শান্তি পুরস্কার কে পাবেন, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে জল্পনা ছড়িয়েছিল। কারণ, নোবেল শান্তি পুরস্কার তাঁর পাওয়া উচিত বলে নিজেই দাবি করেন ট্রাম্প। তাঁর যুক্তি, আটটি যুদ্ধ থামিয়েছেন তিনি। শেষপর্যন্ত অবশ্য ট্রাম্পের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়েনি। এবছর নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন ভেনেজুয়েলার মারিয়া কোরিনা মাচাদো। ট্রাম্প প্রশাসন এতে শান্তির চেয়ে রাজনীতি দেখছে। ট্রাম্প শান্তিতে নোবেল না পেলেও এর আগে আমেরিকার চার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট এই পুরস্কার পেয়েছেন। কোনও যুক্তিতে তাঁদের শান্তিতে নোবেল দেওয়া হয়েছিল? কী করেছিলেন তাঁরা? একনজরে দেখে নেওয়া যাক।
আমেরিকার চার প্রেসিডেন্ট শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন-
১৯০১ সাল থেকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া শুরু হয়। এই ১২৫ বছরে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন চার মার্কিন প্রেসিডেন্ট। থিয়োডোর রুজভেল্ট, উডরো উইলসন, জিমি কার্টার এবং বারাক ওবামা। চারজনের মধ্যে তিনজন পদে থাকাকালীন পুরস্কার পেয়েছেন। প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শান্তিতে নোবেল পান থিয়োডোর রুজভেল্ট। ১৯০১ সাল থেকে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি। আর নোবেল পান ১৯০৬ সালে। উডরো উইলসন ১৯১৩ সাল থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি নোবেল পান ১৯১৯ সালে। তৃতীয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নোবেল পান জিমি কার্টার। তবে পদে থাকাকালীন এই পুরস্কার পাননি তিনি। ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি। তার দুই দশক পর ২০০২ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল পান। আর চতুর্থ এবং এখনও পর্যন্ত শেষ মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নোবেল পেয়েছেন বারাক ওবামা। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি। পদে বসার আট মাসের মধ্যেই তিনি শান্তিতে নোবেল পান।
চার মার্কিন প্রেসিডেন্ট কোন কাজের জন্য শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন?
আমেরিকার প্রথম নোবেল প্রাপকের নামই থিয়োডোর রুজভেল্ট। ১৯০৪-০৫ সালে রুশ-জাপানের মধ্যে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ থামাতে মধ্যস্থতা করেছিলেন তিনি। তাঁর নাম মনোনয়ন করেছিলেন নরওয়ের রাজনীতিক কার্ল ক্রিস্টিয়াম বার্নের।
উডরো উইলসনকে কেন নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল? প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিধ্বস্ত বিশ্ব। তখন আন্তর্জাতিক শান্তি স্থাপনের জন্য লিগ অব নেশনস প্রতিষ্ঠা করেন উইলসন। তাঁর এই কাজের জন্য নরওয়ের নোবেল কমিটিই শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য তাঁর নাম মনোনয়ন করেছিল।
এরপর জিমি কার্টার। ১৯৮১ সাল পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি। ১৯৮২ সালে কার্টার সেন্টার নামে বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। ওই সংগঠন শান্তি, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে। এই কাজের জন্য ২০০২ সালে নরওয়ের নোবেল কমিটি কার্টারের নাম মনোনয়ন করে এবং তাঁকে শান্তিতে নোবেল দেয়।
এখনও পর্যন্ত শেষ মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন বারাক ওবামা। আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও মানুষের মধ্যে সম্পর্ক দৃঢ় করতে তাঁর কাজের জন্য তাঁকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। ২০০৯ সালে তিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরই তাঁর নাম মনোনয়ন করেছিল নরওয়ে সংসদের নোবেল কমিটি।
ট্রাম্পকে নিয়ে বাড়ছিল জল্পনা-
এবার ট্রাম্প শান্তিতে নোবেল পাবেন কি না, তা নিয়ে জল্পনা বেড়েছিল। গত কয়েকমাসে ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি ৮টি যুদ্ধ থামিয়েছেন। তার মধ্যে গত মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের সংঘর্ষ বিরতির কথাও উল্লেখ করেন। তবে ভারত স্পষ্ট করে দেয়, সংঘর্ষ বিরতিতে তৃতীয় কোনও পক্ষের হাত নেই। এত দাবির পরও ট্রাম্পের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়েনি। শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন ভেনেজুয়েলার আয়রন লেডি মারিয়া কোরিনা মাচাদো। গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে লড়াইয়ের জন্য তাঁকে শান্তিতে নোবেল দেওয়া হল।
ট্রাম্প কেন এবার শান্তিতে নোবেল পেলেন না?
এবছর মনোনয়ন শেষ হয়েছে গত ৩১ জানুয়ারি। অর্থাৎ, ট্রাম্প দ্বিতীয়বার মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার ১১ দিনের মাথায়। ফলে তিনি যে আটটি যুদ্ধ থামানোর দাবি করেছেন, তার কোনও প্রভাব নোবেল কমিটির সিদ্ধান্তে পড়েনি। ইজরায়েল ও পাকিস্তান যে ট্রাম্পের নাম মনোনয়ন করেছিল, তাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। শুধুমাত্র মার্কিন কংগ্রেসে নিউইয়র্কের প্রতিনিধি ক্লদিয়া টেনি গত বছরের ১১ ডিসেম্বর যে মনোনয়ন করেছিলেন, তাকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেখানে ক্লদিয়া দাবি করেন, ২০২০ সালে ট্রাম্প প্রথম দফায় প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন আব্রাহাম অ্যাকর্ড চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল। ওই চুক্তির ফলে ইজরায়েল ও আরব দেশগুলির মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক সরল হয়েছিল। ফলে ট্রাম্পের নোবেল শান্তি পুরস্কারের সম্ভাবনার ক্ষেত্রে ওই যুক্তিই বিবেচনা করা হয়েছিল।
ট্রাম্পের নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও এদিন প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছিল নোবেল কমিটিকে। তখন নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান জর্গেন ওয়াটনে ফ্রিডনেস বলেন, তাঁরা শুধুমাত্র আলফ্রেড নোবেলের উইল এবং কাজের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেন।
প্রশ্ন উঠছে, বারাক ওবামা শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন ২০০৯ সালে। ওই বছরেরই ২০ জানুয়ারি তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথমবার শপথ নেন। গতকাল ওবামার শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন ট্রাম্পও। তিনি বলেন, কোনও কিছু না করেই নোবেল পেয়ে যান ওবামা। ট্রাম্প বলেন, “ওবামা একটা পুরস্কার পেয়েছিলেন। তিনি নিজেও জানেন না, কেন তাঁকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। কোনও কিছু না করার জন্য তারা ওই পুরস্কার ওবামাকে দিয়েছিল।”
এদিন নোবেল কমিটি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রাপকের নাম ঘোষণা করার পর কটাক্ষ করেছে হোয়াইট হাউস। ট্রাম্পের ভাগ্যে শিকে না ছেঁড়ার পর হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র স্টিভেন চেউয়াং নিজের এক্স হ্য়ান্ডেলে একটি পোস্ট করে লেখেন, ‘প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শান্তি প্রতিষ্ঠা ও যুদ্ধ থামানোর কাজ সর্বদাই চালিয়ে যাবেন। তাঁর মধ্যে মানবিকতা রয়েছে। তাঁর মতো মানুষ পাওয়া বেজায় কঠিন, যিনি শুধুমাত্র ইচ্ছাশক্তির জোরে আস্ত পাহাড় সরিয়ে দেন।’ এরপরই নোবেল কমিটির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ওই মুখপাত্র লেখেন, ‘নোবেল কমিটি আবারও প্রমাণ করে দিয়েছে যে ওরা শান্তির উর্ধ্বে রাজনীতিকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে।’
তবে ট্রাম্পের শান্তিতে নোবেল পাওয়ার আশা এখনই শেষ হয়ে যাচ্ছে না। সেই ইঙ্গিত দিয়েছেন নোবেল কমিটির চেয়ারম্যানই। তিনি বলেন, শান্তি পুরস্কারের জন্য কারও নাম আগামী বছরও বিবেচিত হতে পারে। ফলে পরের বছর ফের ট্রাম্পের নাম নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন করা হলে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ থামানোর দাবিগুলি বিবেচনা করা হতে পারে। তখন শিকে ছিঁড়তেও পারে মার্কিন প্রেসিডেন্টের। সেই আশায় তাকিয়ে থাকা ছাড়া ট্রাম্পের কাছে আপাতত আর কোনও পথ খোলা নেই।