Ganga River, Climate Change: গঙ্গা শুকিয়ে যাচ্ছে! কালপ্রিট আমরাই―কারণ জানেন? – Bengali News | Climate Change: Study finds the Ganga river is drying faster than in 1,300 years
গঙ্গা আসলে নামেই একটি নদী, দীর্ঘপথ পেরিয়ে আসা এই জলস্রোত ভারতবর্ষের শক্তি। এমন এক শক্তি যে আমাদের সভ্যতা গড়ে তুলেছে, প্রাচীনকাল থেকে মানুষের আত্মাকে স্পর্শ করে এসেছে, এবং এখন নিজেই বিপদে। সাম্প্রতিক গবেষণা মোতাবেক, গত ১৩০০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় পড়েছে আজকের গঙ্গা। কেন এমন অবস্থায় পড়ল আমাদের প্রিয় নদী? কেন শুকিয়ে যাচ্ছে সে?
ইতিহাস বলছে, গাঙ্গেয় উপত্যকা ৬৫ কোটিরও বেশি মানুষের জীবনধারণের অঙ্গ। ভারতের সমগ্র স্বাদু জলের এক-চতুর্থাংশই আসে গঙ্গা থেকে। এইবার বলি বিপদের কথা। গত ৩০ বছরে, এর স্ট্রিম-ফ্লো অর্থাৎ জলের প্রবাহ এমনভাবে কমেছে যা প্রাকৃতিক চক্রকে ভেঙে দিয়েছে। প্রসিডিংস অফ দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেসের গবেষণা অনুযায়ী, ১৬০০ শতাব্দীতে গঙ্গা প্রবল খরার মধ্য দিয়ে গিয়েছিল। তবে ১৯৯১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত এই যে ২৯ বছর, এর মধ্যে গঙ্গার শুকিয়ে যাওয়ার প্রবণতা সেই খরার থেকেও ৭৬% বেশি তীব্র। এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ৭০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ২০১২ পর্যন্ত ট্রি-রিং ডেটা এবং মনসুন এশিয়া ড্রট অ্যাটলাস ব্যবহার করে ফ্লো রেকর্ড পুনর্নির্মাণ করেছেন। আর তাতেই ফুটে উঠেছে এই ভয়াবহ তথ্য! কী তথ্য? আমার-আপনার সাধের গঙ্গা শুকিয়ে যাচ্ছে দ্রুত।
এইবার ভাবছেন অনেক কিছু, মনে হচ্ছে কারণটা কী? দোষটা মূলত আমাদেরই। বায়ুদূষণের জেরে জলবায়ু পরিবর্তন হয়েছে দ্রুত। ফলে ঋতুচক্রে আঘাত লেগেছে। এর জেরে গ্রীষ্মকালীন বৃষ্টিপাত আরও কমে গিয়েছে, উষ্ণতা বেড়েছে ভারতীয় মহাসাগরের। কলকারখানা, যানবাহন থেকে নির্গত এয়ারোসল বৃষ্টিকে আটকাচ্ছে। এছাড়া, কৃষির জন্য ইরিগেশন ক্যানাল, শিল্পের জন্য পাম্পিং―এমনই নানা কারণে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ জল তোলার জেরে ভারসাম্য হারিয়েছে প্রকৃতি। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বেসিনের গ্রাউন্ডওয়াটার লেভেল প্রতি বছর ১৫-২০ মিলিমিটার কমছে। এর ফলে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত শুকানো জলাধারের তকমাও জুটেছে আমাদের। আর হিমালয়ের গ্লেসিয়ার? গঙ্গোত্রী হিমবাহ গত ২০ বছরে গলতে গলতে প্রায় ১ কিলোমিটার পিছিয়ে গিয়েছে। এছাড়া, ১০০০-এরও বেশি ড্যাম এবং ব্যারেজ নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ নষ্ট করছে প্রতি মুহূর্তে!
গঙ্গা তো শুকিয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাবও তাই স্পষ্ট হচ্ছে ক্রমশ। প্রতি বছর দেখা যাচ্ছে বিপর্যয়। উত্তর বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গে ছোট নদীগুলো গ্রীষ্মে শুকিয়ে যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে ফসলের জন্য জল নেই, পশুপালন বন্ধ। এক প্রজন্ম আগে যে খালগুলো সপ্তাহের পর সপ্তাহ জমি সেচ করত অনায়াসে, আজ গ্রীষ্মের মুখেই সেগুলো শুকিয়ে যায়। কূপগুলো দশকের পর দশক ধরে পরিবারকে রক্ষা করত, এখন সেগুলো নিশ্চুপ, শূন্য। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, আগামী কয়েক দশকে লক্ষ লক্ষ মানুষ খাদ্যাভাবের মুখোমুখি হতে পারেন। গবেষকরা জানিয়েছেন, ব্যারেজের কারণে শুষ্ক ঋতুতে জলের প্রবাহ কমে যায়, ফলে মাটি লবণাক্ত হচ্ছে। সুন্দরবন যা বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট, আজ বিপন্ন। এ তো গেল কৃষির কথা, যাতায়াত ব্যবস্থাতেও প্রভাব পড়ছে এখন থেকেই। বাংলা, বিহার, বারাণসী এবং প্রয়াগরাজের পথগুলো বালির চাপে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এমন বহু জায়গা আজ খুঁজে পাওয়া যায়, যেখানে একসময় জলের স্রোত ছিল। সোঁতা শুকিয়ে বালি উঠে আসছে, যা উড়ে এসে জুড়ে বসছে সমভূমিতে!
কৃষি ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপন্ন হচ্ছে গঙ্গা শুকিয়ে যাওয়ার জেরে, এটা তো বুঝলেন। তাহলে অর্থনৈতিকভাবে প্রভাব পড়বেই। হচ্ছেও তাই। গঙ্গা বেসিন ভারতের জিডিপির এক বড় অংশ চালায়―তাই আজ কৃষি, মৎস্য, পর্যটন সবই ক্ষতিগ্রস্ত। গঙ্গার জল শুকানো মানে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকা ধ্বংসের মুখে। আর ইকোসিস্টেম? মাছের হাজার হাজার প্রজাতি আজ নিশ্চিহ্ন, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। এমন বহু চুনো মাছের প্রজাতি আপনার বাবাদের মুখে শুনে থাকবেন যা এখন বাজারে পাওয়াই যায় না! এতক্ষণ সবটা শুনে আপনার মনে এমন প্রশ্ন জাগতে বাধ্য: আমরা কী করব? আমাদের হাতে কিছুই তো নেই। আমরা তো সাধারণ মানুষ। সরকারই তো সব করবে!
চিন্তা করবেন না। আশা আছে। প্রথমত, দরকার ডেটা শেয়ারিং, ড্যাম ম্যানেজমেন্ট, এবং ক্লাইমেট-স্মার্ট প্ল্যানিং। অতিরিক্ত জল তোলা কমানো, ব্যারেজ সংস্কার, এবং প্রাকৃতিক প্রবাহ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা কাজ করছে প্রতিদিন। প্রযুক্তি-চালিত নেচার-বেসড সমাধান ভাবছে মানুষ। জলাভূমি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা এবং স্মার্ট ইরিগেশনের ব্যবস্থা হচ্ছে। নদীকে পুনরুজ্জীবিত করার ভাবনায় ইতিমধ্যেই কেন্দ্র নানাবিধ প্রকল্প চালু করেছে। যদিও গবেষক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের সাফ কথা, গঙ্গার জল ভাগাভাগির ট্রিটি সঠিক সময়ে ও সঠিক উপায়ে আপডেট না করলে সমস্যা বাড়বেই।
প্রশাসন তো তাদের কাজ করবে, কিন্তু বদল আনতে এগিয়ে আসতে হবে আপনাকেই। না না, প্রতিদিন গঙ্গায় নেমে আবর্জনা পরিষ্কারের মতো কঠিন কাজ আপনার দ্বারা সম্ভব নয়। তবে এই গঙ্গার ধারে বসে আড্ডা দিতে দিতে কোল্ডড্রিংকসের বোতল বা সিগারেটের প্যাকেটটা ছুড়ে ফেললেন জলে, এটা তো বন্ধ করাই যায়। তাই না? তাহলে একটু ভাবুন। গঙ্গা শুকিয়ে গেলে আপনার বাড়ির কলে জলটা যে আর আসবে না, এই সহজ সত্যিটা বুঝলেই সাবধান হয়ে যাবেন।