Gold Price Hike Explained: চড়চড়িয়ে বাড়ছে দাম, সোনা ছুঁতে পারে ৩ লক্ষ! – Bengali News | Gold Price Hike Explained: Prices are rising sharply, gold could touch 3 lakhs INR!
সোনার দাম ইতিমধ্যেই পেরিয়ে গিয়েছে ১ লক্ষের গণ্ডি। আর এবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন সোনার দাম পেরোতে পারে ৩ লক্ষ টাকা! শুনেই কি আঁতকে উঠলেন? আসলে অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা আর বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলোর সোনা কেনার কারণে বিশ্বজুড়ে হু হু করে বেড়েছে সোনার দাম। আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্সিয়াল সংস্থা সুইস এশিয়া ক্যাপিটালের পূর্বাভাস অনুযায়ী, অদূর ভবিষ্যতে প্রতি আউন্স সোনার দাম ৮,০০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। এই পূর্বাভাস যদি সত্যি হয়, তাহলে ভারতের বাজারে ১০ গ্রাম সোনার দাম ৩ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু এই অস্বাভাবিক আকাশছোঁয়া দামের কারণ কী?
প্রেক্ষাপট ও পূর্বাভাস
২০২৫ সালে এখনও পর্যন্ত ৪৩ শতাংশ দাম বেড়েছে সোনার। অন্য কোনও অ্যাসেট ক্লাস কিন্তু এই পরিমাণ রিটার্ন এখনও দিতে পারেনি। আর ২০২১ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ধরলে সোনার দাম বেড়েছে ১২৬ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মূল্যবৃদ্ধির কারণ শুধুমাত্র মুদ্রাস্ফীতি নয়। এর পিছনে রয়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক বা একাধিক পরিবর্তন। একদিকে যখন একাধিক কারণে শেয়ার বাজার ও বন্ডের রিটার্ন দুর্বল হচ্ছে, তখন বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে সোনাকে বেছে নিচ্ছেন। সুইস এশিয়া ক্যাপিটাল তাদের রিপোর্টে বলছে যে, ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর জন্যই কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলোর সোনা কেনার প্রবণতা বাড়ছে। আর তাকে যোগ্য সঙ্গত দিয়ে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনাও সোনার দামকে রেকর্ড বৃদ্ধির দিকে নিয়ে যেতে পারে।
চিনের কৌশল: ডলারের বিকল্প সন্ধান
সোনার এই র্যালির পিছনে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে চিন। আমেরিকা ও চিনের বাণিজ্য সংঘাত এবং ওয়াশিংটনের আর্থিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বেজিং ক্রমাগত সোনা কিনে চলেছে। বর্তমানে চিনের হাতে প্রায় ২ হাজার ৩০০ টন সোনা মজুত আছে। তবে তাদের লক্ষ্য হল সোনার মজুতের তালিকায় জার্মানিকে টপকে দ্বিতীয় স্থান দখল করা। চিন চাইছে ৫ হাজার টন সোনা মজুত করতে। এই মুহূর্তে আমেরিকার কাছে রয়েছে ৮ হাজার ১৩৩ টন সোনা আর জার্মানির কাছে রয়েছে ৩ হাজার ৩৫০ টন সোনা।এ ছাড়াও ইতালি ও ফ্রান্সের কাছে প্রায় ২,৪০০ টন সোনা রয়েছে, আর ভারতের মজুত আছে ৮৮০ টন সোনা।
চিনের এই অবস্থানের পিছনে রয়েছে অত্যন্ত চাতুরি ও কৌশলের এক অদ্ভূত মিশ্রণ। কারণ তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সঙ্গে সোনার পরিমাণ তুলনা করলে দেখা যায় তাদের সোনা রয়েছে মাত্র ৭.৬ শতাংশ। ফলে তাদের কাছে রয়েছে সোনা কেনার এক দারুণ সুযোগ। আসলে ডলারের ওপর, আরও স্পষ্ট করে বললে আমেরিকার উপর নির্ভরতা কমানোর জন্য চিন এই পদক্ষেপ করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি ডলার প্রধান আন্তর্জাতিক মুদ্রার মর্যাদা হারায়, তাহলে সোনা কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে উঠে আসবে।
বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি এবং ভূ-রাজনীতি
সোনার মূল্যবৃদ্ধির পিছনে আরও কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে। বছরের শেষ দিকে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। আর এমন হলে দুর্বল হয় ডলার। আর তার সঙ্গে দাম বাড়তে থাকে সোনার। এর পাশাপাশি ইউক্রেন, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়া-প্যাসিফিকে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করছে। এমন পরিস্থিতিতে চিরাচরিত হিসাব অনুযায়ী সোনাকে ফের ‘নিরাপদ আশ্রয়’ হিসাবে দেখছেন বিনিয়োগকারীরা।
এছাড়াও, এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ড বা ETF-এর মাধ্যমে সোনায় বিপুল বিনিয়োগ হচ্ছে। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে শুধুমাত্র ETF-এ ২১ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ বিনিয়োগ হয়েছে। আর এটাই প্রমাণ করে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও সোনার প্রতি ঝুঁকছেন। হিসাব বলছে, বর্তমানে সমস্ত ETF-এর সম্মিলিত সোনার পরিমাণ জার্মানির মোট মজুতের চেয়েও বেশি।
জোগান ও চাহিদা: ভারসাম্যহীনতার চিত্র
সারা বিশ্বের সোনার খনিগুলো থেকে বছরে প্রায় ৩ হাজার টন সোনা উত্তোলন হয়। এর মধ্যে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সোনা সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলো কিনে নেয়। এর ফলে বাজারে নতুন সোনার জোগান কমে যায় ও দাম বাড়তে থাকে। ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং সীমিত জোগানের ভারসাম্যহীনতার কারণেই সোনার দাম আরও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য এর প্রভাব
ভারতের বাজারে সোনার যে দাম আমরা দেখি তা সোনার আন্তর্জাতিক দামের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বাড়লে একই হারে দাম বাড়ে আমাদের দেশের বাজারেও। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় সোনার দাম আমাদের দেশে কিছুটা হলেও বেশি বেড়ে যায়। তার কারণ হল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টাকার তুলনায় ডলারের দাম বৃদ্ধি। এ ছাড়াও,, ঐতিহাসিকভাবে, ভারতীয় পরিবারগুলো সোনাকে শুধু অলংকার হিসেবেই দেখেনি, বরং সঞ্চয় ও বিনিয়োগের একটি নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবেও বিবেচনা করেছে। ভারতের সাধারণ মানুষ ও তাঁদের পরিবারের কাছে প্রায় ২৫ হাজার টনের বেশি সোনা মজুত হিসেবে আছে বলে অনুমান করেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে বর্তমান দামে সোনায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। ঐতিহাসিক তথ্য বলছে, অল টাইম হাই ছুঁয়ে ফেলার পর সোনার দাম সাধারণত ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। তাই, এই মুহূর্তে একসঙ্গে অনেকটা টাকা দিয়ে সোনা কেনা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা খুচরা বিনিয়োগকারীদের জন্য সিস্টেমেটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান বা কিস্তিতে সোনা কেনার পরামর্শ দিচ্ছেন। এতে দামের ওঠানামার ঝুঁকি কমে আসে। সোভেরেইন গোল্ড বন্ড বা ডিজিটাল গোল্ডের মতো বিকল্পগুলোও এখন জনপ্রিয় হচ্ছে, কারণ এতে সোনা সংরক্ষণের ঝামেলা নেই এবং অতিরিক্ত সুদও পাওয়া যায়।
সোনার এই অভূতপূর্ব মূল্যবৃদ্ধি আসলে বিশ্ব অর্থনীতিতে একটা বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। ডলারের এককেন্দ্রিকতার বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলোর সোনা কেনা ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, এই দুয়ে মিলে সোনার দামকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য সোনার এই দাম বাড়া আসলে একটি দ্বিমুখী পরিস্থিতি। এক দিকে যেমন দারুণ রিটার্নের সম্ভাবনা, অন্যদিকে তেমনই রয়েছে আকস্মিক পতনের ঝুঁকি। তাই, বিচক্ষণতার সাথে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া এই মুহূর্তে জরুরি। সোনার ভবিষ্যৎ দাম হয়তো ৩ লাখ টাকা স্পর্শ করতেও পারে, কিন্তু তার জন্য বিনিয়োগ কৌশল হতে হবে সুচিন্তিত ও বৈচিত্র্যপূর্ণ।
কোথাও বিনিয়োগ করতে চাইলে সেই বিষয়ে যথাযথ তথ্যানুসন্ধান ও বিশ্লেষণ করুন। এই লেখা শুধুমাত্র শিক্ষাগত উদ্দেশ্যে। TV9 বাংলা বিনিয়োগের কোনও উপদেশ দেয় না।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: যে কোনও বিনিয়োগে বাজারগত ঝুঁকি রয়েছে। ফলে, আগে বিনিয়োগ সংক্রান্ত সমস্ত নথি সাবধানে পড়ে নেবেন। তারপর বিনিয়োগ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।