Explained: হাম দো, হামারে তিন! ভগবতের মুখে মুসলিমদের নিয়েও সুর বদল – Bengali News | Mohan Bhagwat Advocates ‘Hum Do, Hamare Teen’ to Tackle Declining Fertility Rate
নয়াদিল্লি: ‘হাম দো, হামারা তিন’, কানে লাগছে কথাটা? স্বাভাবিক, কারণ দীর্ঘদিন ধরে ভারতবাসী শুনে এসেছে হাম দো হামারে দো, এককালে সঞ্জয় গান্ধীর মুখে এই কথা ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা দেশজুড়ে। তারপর দিল্লির যমুনা থেকে বাংলার গঙ্গা, কতই না জল বয়ে গিয়েছে। কিন্তু এই হাম দো, হামারে দো মানুষের মনে থেকে গিয়েছে একটা আপ্তবাক্যের মতো। আর আজ সরসঙ্ঘচালক মোহন ভগবত বলছেন, দো নয় তিনের কথা। কিন্তু হঠাৎ করেই জনসংখ্যা নিয়ে কেন এত উদ্বিগ্ন হতে হল তাঁকে?
সঙ্ঘের তত্ত্ব
শতবর্ষে পা দিয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ। আর সেই আবহেই নাগপুরে আয়োজিত একটি সভায় আরএসএস প্রধান বলেন, “জনসংখ্যা বৃদ্ধি না হলে সমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমা অত্যন্ত উদ্বেগের একটা বিষয়।” এই নিরিখে একটি পরিসংখ্যানও তুলে ধরেছেন তিনি। ভগবতের কথায়, “জনসংখ্য়া বৃদ্ধির হার ২.১ এর নীচে নেমে গেলে এই সমাজের অবলুপ্তি ঘটবে। বহিরাগত কোনও আক্রমণ ছাড়াই আস্ত একটা সমাজ নিমিষে ধ্বংস হয়ে যাবে। সেই কারণে জন্ম হার ২.১-এর নীচে নামা উচিত নয়। আর অঙ্কের নিরিখে ০.১টি সন্তান হয় না। হয় দু’টি। যা তিনটি করা প্রয়োজন।” হঠাৎ কেন এমন কথা বলছেন তিনি? ভারতে কি এই মুহূর্তে কোনো সমস্যা রয়েছে নাকি আগামীর সমস্যার মোকবিলার জন্য শক্তি সঞ্চয় করছে আরএসএস? এক্ষেত্রে কি চিনকে দেখেই আগাম শিক্ষা নিচ্ছেন সরসঙ্ঘচালক?
তথ্য বলছে, চিনের জন্মহার নেমে গিয়েছে ১.০৯ এ। যা বিশ্বে সর্বনিম্ন। এককালে এই চিন জনসংখ্য়া নিয়ন্ত্রণে জনগণকে নানা দাওয়াই দিয়েছিল, আজ সেটাই যেন পায়ে কুড়ুল পড়ার মতো পড়েছে। কমছে জন্মের হার। যুব শক্তি হারাচ্ছে লাল ফৌজের দেশ। এই একই দশা কিন্তু ভারতেরও। রাষ্ট্রপুঞ্জ বলছে, ১৯৫০ সালে ভারতে মহিলা প্রতি সন্তানের সংখ্য়া ছিল ৬, যা বর্তমানে নেমে এসেছে দুইয়ে। অবশ্য তা যে এখানেই থেমে গিয়েছে এমনটা নয়। আর্থ-সামাজিক পরিকাঠামো সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে সমাজের মধ্যবর্গীয় বা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে। কমছে জন্মহার। খোদ বিবিসির-ই একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে জন্মহার সবচেয়ে বেশি নিম্নমুখী হয়েছে দক্ষিণী রাজ্যগুলিতে। সেখানকার সব ক’টি রাজ্য মিলিয়ে গড় জন্ম হার এসে ঠেকেছে ১.৬-তে। আর এই জন্মহার কমা মানে বাড়বে বৃদ্ধ জনগণের পরিমাণ। কর্মক্ষম হারাবে দেশ প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে।
এই একই অনুষ্ঠানে তিনি তুলে ধরেছেন হিন্দু-মুসলিম ডিএনএ-র কথাও। তবে ইঙ্গিতে। সরসঙ্ঘচালকের মুখে একবারের জন্য উঠে আসেনি হিন্দু-মুসলিম প্রসঙ্গ। ডিএনএ-র কথা বলেছেন, তাতে জুড়েছেন সনাতনী, হিন্দভী, ভারতীয়র মতো শব্দ। নেই হিন্দু-মুসলিম রাজনীতির কচকচানি, তবে রয়েছে আভাস। আর সেই আভাসই যেন তুলে ধরছে আরএসএস-এর ‘অবস্থান বদলের’ কথা। ভগবতের সাফ বার্তা, সবার ডিএনএ এক। ভারতীয় মুসলিমরাও যে এককালে ‘হিন্দুই’ ছিলেন, সেই মতবাদেই জোর দিয়েছেন তিনি। তবে ইঙ্গিতে। আর জনসংখ্যা, তাদের উপরেও তো নির্ভর। সুতরাং, এক জোট তো করতেই হবে।
বরাবর ‘হিন্দু খাতরে ম্য়য় হে’ এই স্লোগান ব্যবহার করেই আরএসএস শুধুমাত্র হিন্দুদের দিয়েছে বেশি বেশি সন্তান নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। তাদের এক সময়ের প্রচারের অংশও ছিল হিন্দু জাগরণ না ঘটলে দেশে মুসলিম প্রধানমন্ত্রীও দেখতে হতে পারে। কিন্তু নাগপুরের শতবর্ষ সভা হঠাৎ করে কীভাবে সেই সকল ভাবনাচিন্তার উর্ধ্বে পৌঁছে গেল? তা হলে কি বদলাচ্ছে অবস্থান?
বদলাচ্ছে অবস্থান?
মোহন ভগবতের মন্তব্য নিয়ে যে রাজনৈতিক তরজা হয়নি এমনটা নয়। তা স্বাভাবিকের থেকে খানিক কম হলেও দু-একটা মন্তব্য এদিক-ওদিক থেকে উঠে এসেছেই। এই যেমন হায়দরাবাদের সাংসদ আসাউদ্দিন ওয়েসি প্রশ্ন তুলেছেন, “তা হলে কেন এতদিন ধরে মিথ্যা বলা হল, কেনই বা বলা হল মুসলিম জনসংখ্যা হিন্দুদের পেরিয়ে যাবে?”
ওয়াকিবহাল মহল বলছে, আরএসএস বকলমে হিন্দুদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির বার্তা দিতেও পারে, কিন্তু একটা পরিসংখ্য়ান তাদের কোথাও গিয়ে হয়তো ‘স্বস্তি’ দিয়েছে। তাই মোহন ভগবতের কথায় ফুটে উঠেছে ‘সামগ্রিক জনসংখ্যার’ কথা।
কিন্তু কী সেই পরিসংখ্যান? দেশের মুসলিমদের মধ্য়ে কমছে বেশি বেশি সন্তান নেওয়ার প্রবণতা। ২০২২ সালে কেন্দ্রের স্বাস্থ্য মন্ত্রক প্রদত্ত জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য সমীক্ষার রিপোর্ট বলছে, গত ২০ বছরে অন্য়ান্য ধর্মের মানুষদের তুলনায় মুসলিমদের মধ্যে জন্মের হুড়মুড়িয়ে পড়েছে। যেখানে ১৯৯২ থেকে ৯৩ সালে তাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ৪.৪ ছিল। তা ২০১৯-২০ সালে পড়ে গিয়েছে ২.৩-এ। ওই রিপোর্টেই আরও বলা হয়েছে যে সেই তুলনায় হিন্দু পরিবারে সন্তান জন্মের হার ১.৯৪ থেকে ২ এর মধ্যে। এমনকি, দেশের সবচেয়ে বেশি মুসলিম অধ্যুষিত রাজ্য যেমন কেরল, অসম এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জম্মু-কাশ্মীরে মুসলিমদের মধ্যে সন্তান জন্মের হার নেমেছে ১.৪-এ।
সত্যিই প্রয়োজন তিন সন্তান?
এবার আসা যাক দেশের জনসংখ্যার কথায়। ২০১১ সালের পর দেশে জনগণনা করা নানা কারণে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। বারবার শোনা যায়, এই হবে এই হবে। কিন্তু এখনও হয়ে ওঠেনি। এদিকে যে হারে বাসে ট্রেনে ভিড় বাড়ছে তাতে দেখে অনেকেই বলছেন, ভারতের মোট জনসংখ্যা কমপক্ষে ১৪০ থেকে ১৪৫ কোটির মধ্যে। যদিও রাষ্ট্রপুঞ্জ, কোনও দেশে জন্মহার মোটামুটি ২.১ হলেই ঠিকঠাক বলেছে। অর্থাৎ এটাই আদর্শ জন্মহার। আর এই আবহে আরএসএস বলছে হাম দো হামারা দো নয় তিন। কিন্তু জনতা? তারা কী বলছেন? কেউ কেউ বলছেন, ‘মোহন ভগবত একা মানুষ। বিয়ে করেননি। তিনি এসব বলতেই পারেন। কিন্তু সাধারণের পক্ষে মানা তা সম্ভব নয়। একটা সন্তান সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছে সবাই। এত খরচ। তিন সন্তান কীভাবে সম্ভব?’
অবশ্য, দেশের এই নিম্নমুখী জন্মহার নিয়ে কিন্তু মোটেই ভাবিত নয় একাংশের নতুন প্রজন্মের দম্পতিরা। ইতিমধ্যেই একটি বাক্য এই নতুন প্রজন্মের দম্পতিরদের মধ্যে খুব জনপ্রিয় হয়েছে, তা হল Double Income No Kids। মানে খুব পরিষ্কার। যা আয়, তা নিজেদের কাজেই ব্যয়। সন্তান হয়ে উঠেছে ‘বাড়তি খরচ’। কিন্তু সমাজের বুকে এই বদলটা কবে ঘটল? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আর্থ সামাজিক পরিস্থিতি, সবজিপাতির আকাশছোঁয়া দর। আর এই সব তো দূর। একটা সন্তান ধারণ থেকে প্রসব এই গোটা প্রক্রিয়াই তো লক্ষ টাকার বিষয়। তারপর তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য সব মিলিয়ে জর্জরিত হয়ে উঠছে দেশের একটা বড় অংশের মানুষ।