Explained: চক্রব্যূহে দাঁড়িয়ে তিলোত্তমার মা-বাবা? – Bengali News | In Depth: Tilottama’ Parents not get justice after one year, now political parties slam each other
মেয়ের মৃত্যুর এক বছর পূর্ণ হওয়ার দিন রাস্তায় নেমেছিলেন তাঁরা। নবান্ন অভিযানের পথে কখনও আকাশের দিকে তিলোত্তমার মা বলেন, “২০২৪ সালের ৯ অগস্ট আমার গোটা দুনিয়াটাই হারিয়ে গিয়েছে। আমার মেয়েকে তাঁর কাজের জায়গায় মেরে ফেলা হয়েছে।” আবার কখনও পুলিশকে ডেকেও সাড়া না পেয়ে তাঁরা বলেন, “কথা বলতেও ভয় পান আপনারা। আপনারা কী বোবা হয়ে গিয়েছেন?” উপরের কথাগুলি কয়েক সেকেন্ডের। কিন্তু, সেই বক্তব্যই যেন সব কিছু বলে দিচ্ছে। তাঁদের যন্ত্রণা। তাঁদের সন্তানহারা শূন্যতা। বিচারের জন্য প্রার্থনা। যন্ত্রণা থেকে বেরিয়ে আসছে মনে জমে থাকা ক্ষোভ। এক ৯ অগস্ট থেকে আর এক ৯ অগস্ট। একটা বছর। তিলোত্তমার মা-বাবা সেদিনও যে জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, আজও সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে। অন্তত তিলোত্তমার মা-বাবা তাই মনে করেন। ধর্ষক সঞ্জয় রায়ের আমৃত্যু কারাদণ্ড হয়েছে। কিন্তু তিলোত্তমার মা-বাবার দাবি, সঞ্জয় একা নয়। আরও অনেকে আছে। সরকার তাদের আড়াল করছে। সিবিআই-রাজ্যের সেটিং হয়ে গিয়েছে। এমনও বিস্ফোরক কথা শোনা যায় তাঁদের মুখে। আর এখান থেকেই লড়াই এই দুটি মানুষের। একটা সময় গোটা দেশ রাস্তায় নেমেছে। প্রতিবাদ করেছে। তবে সময় যত গড়িয়েছে, কোথাও যেন ব্যস্ততার ভিড়ে ম্লান হয়ে যাচ্ছিল সেই লড়াই। কিন্তু মেয়ের বিচারের জন্য তাঁরা তো লড়াই থামিয়ে দিতে পারেন না। দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন, সব রাজনৈতিক দলকে আহ্বান করছেন, শুধু একটাই কারণে, মেয়ের বিচার চাই। আর এখানেই তাঁদের যা বর্তমান অবস্থান, কেউ কেউ বলছেন তিলোত্তমার মা-বাবা রাজনীতির চক্রব্যূহে আটকে পড়েছেন? সত্যিই কি তাই!
৯ অগস্ট থেকে ৯ অগস্ট-
মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। বড় ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু একটা রাত তাঁর সেই স্বপ্ন কেড়ে নিল। শুধু কেড়ে নেয়নি। ছিন্নভিন্ন করে দেয়। সরকারি হাসপাতালের সেমিনার হল থেকে উদ্ধার হয় কর্তব্যরত জুনিয়র ডাক্তার তিলোত্তমার দেহ।
আর এই নৃশংস ঘটনার প্রথম থেকেই কোনও কিছু লুকোনোর চেষ্টা হয়েছে বলে তিলোত্তমার বাবা-মা অভিযোগ করে আসছেন। মেয়ের মৃত্যুর পর তাঁদের ফোন করে বলা হয়েছিল, তিলোত্তমা আত্মহত্যা করেছেন। হাসপাতালের তরফে কেন একথা বলা হয়েছিল, তার উত্তর আজও খুঁজে চলেছেন তাঁরা। সরকারি হাসপাতালে কর্তব্যরত ডাক্তারের ধর্ষণ এবং খুন যদি হয়, তার দায় কার? এই প্রশ্ন বারবার তুলেছেন তিলোত্তমার মা-বাবা।
অরাজনৈতিক আন্দোলন-
এবার শুরু থেকে শুরু করা যাক। তিলোত্তমার বিচারের জন্য দেশজুড়ে আন্দোলনের ঝড় ওঠে। আর পুরোটাই ছিল অরাজনৈতিক। দেশজুড়ে চিকিৎসকরা রাস্তায় নেমেছেন। সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমেছেন। এমনকী রাজনৈতিক নেতারা তাঁদের পতাকা বাড়িতে রেখে রাস্তায় নেমেছেন। এই আন্দোলন এতটাই স্বতস্ফূর্ত ছিল কোনও রাজনৈতিক দলও রাজনীতির রং লাগাতে চাননি। হয় তো ইচ্ছা করেই। কারণ, সে সময় শাসক দল ছিল এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছিলেন, যখন লাখো লাখো সাধারণ মানুষ এভাবে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করছে, বিরোধীদের জন্য আলাদা আন্দোলন করার জায়গা ছিল না। শাসক দল তখন প্রবল কোণঠাসা।
জুনিয়র ডাক্তারদের অনশন-
জুনিয়র ডাক্তাররা যখন মাটি কামড়ে অনশন শুরু করেন, তখন আরজি কর আন্দোলন অন্য মাত্রা নেয়। দেশজুড়ে শুরু হয় চিকিৎসা সংকট। জুনিয়র ডাক্তাররা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, তাদের আন্দোলন কোনও রাজনৈতিক আন্দোলন নয়। চিকিৎসকদের নিরাপত্তা স্বার্থে এই আন্দোলন। সিপিএম, বিজেপি, কংগ্রেস সবাই নৈতিক সমর্থন জানিয়েছিল। কিন্তু কোনও ভাবেই রাজনীতি স্পর্শ করতে পারেনি এই আন্দোলন। অন্তত চিকিৎসকরা এই দাবি প্রথম থেকেই করে এসেছে।
শাসক দল যখন পথে-
কলকাতা পুলিশ যতদূর তদন্ত এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, তার থেকে এক পাও এগোতে পারেনি সিবিআই। এই অভিযোগ তুলে এবার তিলোত্তমার বিচারের দাবিতে রাস্তায় নামে তৃণমূলও। পাড়ায় পাড়ায় মিছিল থেকে রাজপথ, তৃণমূলের নেতারা বিক্ষোভ দেখান। সিবিআইয়ের তদন্তকে হাতিয়ার করে বিজেপিকে কোণঠাসা করতে শুরু করেন তৃণমূল নেতারা। কোনও কোনও ক্ষেত্রে আন্দোলনকারী জুনিয়র ডাক্তাররাও রোষের মুখে পড়েন।
আরজি করে তিলোত্তমার দেহ নিয়ে যাওয়ার সময় কিংবা রাত দখলের দিন মীনাক্ষী বা অগ্নিমিত্রা পালের মতো বাম-রাম নেতাদের সক্রিয় ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল। কিন্তু এসবই অরাজনৈতিক ব্যানারে রাজনৈতিক লড়াই। তখনও পর্যন্ত এই লড়াই তিলোত্তমা মা-বাবার একার লড়াই ছিল না।
আদালতে লড়াই-
আরজি কর ঘটনার পর স্বতঃপ্রণোদিত মামলা করে সুপ্রিম কোর্ট। আরজি কর ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে চিকিৎসকদের নিরাপত্তার কথা ভেবে টাস্ক ফোর্স গঠন করে সুপ্রিম কোর্ট। অন্যদিকে কলকাতা হাইকোর্টে চলে আরজি কর মামলা। কলকাতা পুলিশের মতো সঞ্জয় রায়কে মেইন কালপ্রিট বলে চিহ্নিত করে সিবিআইও। দোষী সাব্যস্ত হয় সঞ্জয় রায়। আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এই রায়ে খুশি ছিলেন না তিলোত্তমার মা-বাবা। তাঁদের দাবি, আরও অনেকে যুক্ত রয়েছে এই ঘটনায়। রাজ্য সরকার আড়াল করতে চাইছে।
তিলোত্তমার মৃত্যুর এক বছর-
এক বছর পর যখন একই বিন্দুতে দাঁড়িয়ে তিলোত্তমার মা-বাবা, দেওয়ালে পিঠ ঠিকে যাওয়ার মতো তাঁরা নবান্ন অভিযানের আহ্বান দেন। শাসক দল বাদে সব রাজনৈতিক দলকে আহ্বান করেন এই মিছিলে থাকার জন্য। শুভেন্দু অধিকারীও ঘোষণা করেন, তাঁরা এই মিছিলে থাকবেন। এরপর শুরু হয়ে যায় রাজনৈতিক আকচাআকচি। শাসক দলের কটাক্ষ, বিজেপির প্ররোচনায় পা দিয়ে ফেলছেন তিলোত্তমার মা-বাবারা। তাঁদের আবেগ নিয়ে রাজনীতি করতে চাইছে বিজেপি।
তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ বলেন, “আমরা বাবা-মার সঙ্গে রয়েছি। তবে বিজেপি বাবা-মাকে নিয়ে রাজনীতি করছেন, তার তীব্র নিন্দা করছি। আরজি কর মামলার তদন্ত করছে সিবিআই। আর কেন্দ্রে রয়েছে বিজেপি। সিজিও কমপ্লেক্স অভিযান করার কথা। কেন নবান্ন অভিযান করছেন?”
তবে, নবান্ন অভিযানে বিজেপি ছাড়া কোনও রাজনৈতিক দলকে দেখা যায়নি। তাদের মতে, বিজেপি এই মিছিলে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ায় তারা থাকবে না। জুনিয়র ডাক্তাররাও ছিলেন না।
তবে, নবান্ন অভিযানে সাধারণ মানুষ পথে নামে। জাতীয় পতাকা হাতে বিজেপি নেতা-কর্মীদের দেখা যায়। পুলিশ-আন্দোলনকারীদের মধ্যে ধুন্ধুমার কাণ্ড ঘটে। নিগৃহীত হন তিলোত্তমার মা। পুলিশও মার খায়। আর এই নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক চাপানউতর শুরু হয়ে যায়। বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী নবান্ন অভিযানে তিলোত্তমার মায়ের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা নিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, “আসলে বিনীত গোয়েলকে (কলকাতার তৎকালীন পুলিশ কমিশনার) বাঁচাতে চান মনোজ ভার্মা (কলকাতার পুলিশ কমিশনার)। এরা এই দুই সাক্ষীকে খতম করতে চেয়েছিল। যাতে কেসটা ক্লোজ হয়ে যায়।”
সত্যিই কি রাজনীতির চক্রব্যূহে জড়িয়ে গেলেন তিলোত্তমার বাবা-মা?
তিলোত্তমার বাবা-মা স্পষ্ট বলছেন, তাঁরা কোনও রাজনীতির অংশ হননি। তিলোত্তমার বাবা বলেন, “আমরা রাজনীতি করছি না। তিলোত্তমা মঞ্চ রাজনীতি করছে।” ৯ অগস্ট নবান্ন অভিযানে তৃণমূল ছাড়া সব দলকেই আহ্বান জানিয়েছিলেন তাঁরা। তবে তৃণমূলের বেশ কয়েকজন নেতাকে তিনি এই অভিযানে সামিল হতে দেখেছেন বলে মন্তব্য করেন তিলোত্তমার বাবা।
তিলোত্তমার বাবা বলছেন, তাঁরা রাজনীতির চক্রব্যূহে জড়াননি। কিন্তু কী ভাবছেন জুনিয়র ডাক্তাররা? তিলোত্তমাকাণ্ডের পর একদম শুরু থেকে জোরদার আন্দোলনে নেমেছিলেন তাঁরাই। পাশে পেয়েছিল আপামর রাজ্যবাসীকে। কোনও রাজনৈতিক দলকে তাঁদের আন্দোলনের মধ্যে ঢুকতে দেননি। আরজি কর আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ অনিকেত মাহাতোর স্পষ্ট কথা, “আমরা মনে করেছিলাম যখন পশ্চিমবাংলার মানুষ একটা ন্য়ায়বিচারের দাবিতে সহমত হয়েছেন, রাস্তায় নেমেছেন সেখানে কোনও রাজনীতির সংকীর্ণতা থাকবে না। আমরা চাইনি কোনও রাজনৈতিক দল তাঁদের রং নিয়ে এই আন্দোলনে আসুক। কিন্তু এই আন্দোলন সবার।”
এখন তিলোত্তমার মা-বাবা রাজনৈতিক চক্রব্যুহে আটকে পড়েছেন কি না, তাতে বিশেষ গুরুত্ব দিতে নারাজ জুনিয়র ডাক্তাররা। তাঁদের একটাই কথা তিলোত্তমা যেন ন্যায়বিচার পান।
৩৬৫ দিন অতিক্রান্ত হয়ে গিয়েছে, এখনও হার না মানা লড়াইয়ে অনড় জুনিয়র ডাক্তাররা। এখন চাইছেন সুবিচার। কিন্তু তা মিলবে কী? আর মিললেও কোন পথে? কে দেবে সুবিচার? তিলোত্তমার মা-বাবাকে নিয়ে রাজনৈতিক তরজা পুরোদমে তখন এটাই যেন লাখ টাকার প্রশ্ন। এদিকে হাতে আর কয়েকটা মাস। তারপরই বিধানসভা ভোট। দামামা বেজে গিয়েছে সেই কবেই। এই আবহে শেষ পর্যন্ত দেখার আন্দোলনের আগুন আরও কতটা তপ্ত হয়।