Explained: ট্রাম্পের বিরুদ্ধে একজোট হচ্ছেন মোদী, পুতিন, জিনপিংরা? – Bengali News | BRICS countries can challenge the U.S. and its policies
‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হওয়া কঠিন’ – প্রতিবেদনে ‘গ্লোবাল সাউথ‘-এর কথা বলেছিলাম। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার সেই সব দেশ, যারা পশ্চিমী দেশের মতো অতটা উন্নত নয়, কিন্তু নানা রাজনৈতিক, সামাজিক ও আর্থিক প্রতিকূলতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে, সেই সব দেশকে এক বন্ধনীতে ‘গ্লোবাল সাউথ’ বলে ডাকা হয়। ‘গ্লোবাল সাউথ’ শব্দবন্ধনীকে সবসময় ভৌগোলিকভাবে দেখলে চলবে না। এর ঠিক উল্টো, অর্থাৎ উন্নত দেশগুলিকে গ্লোবাল নর্থ বলে ডাকা হয়। গত এক সপ্তাহ ধরে এই গ্লোবাল সাউথ ও নর্থ দেশগুলির নিজেদের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কে যেন জোয়ার এসেছে। ট্রাম্পের চাপানো শুল্কের ফাঁস মুক্ত হতে দু’পক্ষই একে অপরের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। ভারত, চিন, ব্রাজিল, রাশিয়া– ট্রাম্পের চাপানো ‘অন্যায্য’ শুল্কের বিরুদ্ধে সরব হয়ে মার্কিন দাদাগিরির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতেই ‘ব্রিকস’ সদস্য দেশগুলি (যার মধ্যে রয়েছে নতুন পাঁচ সদস্য দেশও) একযোগে শক্তিশালী ‘বিকল্প জোট’ তৈরি করে মাকিন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ‘হাল্লা বোল’ ঘোষণা করতে তৈরি হচ্ছে। বিশ্বব্যাঙ্ক বা ‘আইএমএফ’-এর মতো পশ্চিমী রাষ্ট্র প্রভাবিত আর্থিক সংগঠনের বদলে ব্রিকস দেশগুলি এনডিবি (নিউ ডেভলপমেন্ট ব্যাঙ্ক) বা ‘ব্রিকস পে’-র মতো বিকল্প পেমেন্ট সিস্টেমের উপর জোর দিচ্ছে। মার্কিন ডলারের একাধিপত্যকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে ব্রিকস পে-র মতো বিকল্প পেমেন্ট সিস্টেম। আর শুধু ডলারের কথাই বা বলছি কেন? ‘ক্রিপ্টোকারেন্সি’ নিয়ে ট্রাম্পের ভোলবদলেও আপত্তি রয়েছে ব্রিকস সদস্য দেশগুলির। যে ট্রাম্প একসময় ‘বিটকয়েন’-কে ‘ধাপ্পা’ বলে মন্তব্য করেছিলেন, সেই ট্রাম্পই এখন ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে আমেরিকাকে বিশ্বের ‘ক্রিপ্টো’ রাজধানী হিসাবে গড়ে তুলতে উঠেপড়ে লেগেছেন। অন্যদিকে, ডলারের একাধিপত্য কাটিয়ে ব্রিকস সদস্য রাষ্ট্রগুলি নয়া কারেন্সি আনতে চাইছেন। আর এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি উৎসাহ আবার রাশিয়ার। একইসঙ্গে ‘ডিজিটাল অ্যাসেট’-এর বাজারকে ধরতেও কম উৎসাহ নেই মস্কো-সহ ব্রিকসের অন্যান্য সদস্যের। চলতি সপ্তাহে ব্রিকস সদস্যদের অন্তত হাফডজন নজিরবিহীন পদক্ষেপ থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট, আমেরিকাকে জোরাল ধাক্কা দিতে প্রস্তুত হচ্ছে ব্রিকসের ‘বিকল্প জোট’।

গত শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের মধ্যে টেলিফোনে কথা হয়েছে। মোদী জানিয়েছেন, আলোচনা খুব ভাল হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্ব ভবিষ্যতে আরও নিবিড় হবে। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের ঠিক ২৪ ঘণ্টা আগে মস্কোয় নামেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল। দেখা করেন পুতিনের সঙ্গে। পুতিনকে চলতি বছর দিল্লিতে আসার আমন্ত্রণ জানান। পাশাপাশি, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা ডা সিলভাও ফোন করে মোদীকে। এর মাঝেই বিদেশমন্ত্রক থেকে নিশ্চিত করা হয়, অগাস্টের শেষে ‘শাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন’ সামিটে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী মোদী সাতবছর পর চিন সফরে যাচ্ছেন। যার জেরে ভারতের কড়া সমালোচক ‘গ্লোবাল টাইমস’-এর মতো চিনা মুখপত্রকেও ভারতের প্রতি সুর নরম করতে হয়।
সম্প্রতি ব্রিকস সদস্যদের মধ্যে সুষ্ঠু পারস্পরিক বোঝাপড়ার জন্য দায়ী ট্রাম্পের কয়েকটি হঠকারী মন্তব্য ও বাড়তি শুল্ক চাপানোর হুঁশিয়ারি। রাশিয়ার কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল কেনার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভারতের উপর প্রথমে ২৫ ও পরে আরও ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপান। ট্রাম্প একের পর এক মনগড়া দোষারোপ চাপান ভারতের উপরে। ভারত নাকি রাশিয়ার কাছ থেকে সস্তায় তেল কিনে ইউক্রেন যুদ্ধে পুতিনের হাত শক্ত করছে। আজ ভারতে মোট তেলের প্রায় ৩৬ শতাংশই আসে রাশিয়া থেকে। অথচ, ২০২২-এ ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগে ভারতে মাত্র ১% তেল আসত রাশিয়া থেকে। কিন্তু যুদ্ধ চলাকালীন ইউরোপ ও আমেরিকা রাশিয়ার উপরে নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলিকে তেল সরবরাহের জন্য বেছে নেয়। ফলে ভারত যাদের কাছ থেকে স্বাভাবিক সময়ে তেল কিনত, সেই জোগানে টান পড়ে। তখন রাশিয়া সস্তায়, বিপুল ছাড়ে ভারতকে তেল বিক্রির প্রস্তাব দেয়। ১৪০ কোটির দেশের তেলের বিপুল চাহিদা মেটাতে ভারতও স্বাভাবিকভাবেই সেই প্রস্তাব লুফে নেয়। ভারত স্পষ্ট জানিয়েছে, দেশবাসীর স্বার্থে যার কাছ থেকে সস্তায় তেল পাওয়া যাবে, দিল্লি তার কাছ থেকেই কিনবে। অন্য কারও (পড়ুন আমেরিকা) দাদাগিরি মেনে নেওয়া হবে না।
আর ট্রাম্পও বলিহারি! একা ভারত নয়, ব্রিকসের কোনও সদস্য মার্কিন বিরোধী অবস্থান নিলেই তাদের উপরেও অতিরিক্ত ১০% শুল্ক চাপাবেন বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এখানেই শেষ নয়। ভারত ও রাশিয়ার অর্থনীতিকে ‘মৃত’ বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেন ট্রাম্প। অথচ অর্থনীতি সম্পর্কে যাদের ন্যূনতম জ্ঞান আছে, তারাই জানেন, ভারতের অর্থনীতির গতি এই মুহূর্তে চূড়ান্ত ঊর্ধ্বমুখী। বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতিই ভারতের। ২০২৫-২৬-শেও ভারতীয় অর্থনীতির ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকবে বলেই আগাম আঁচ দিয়ে রেখেছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। সেখানে ট্রাম্প কী ভেবে ভারতের অর্থনীতিকে মৃত বললেন, বোধহয় একমাত্র তিনিই জানেন। রুশ তেল কেনার জন্য ট্রাম্পের চাপানো বাড়তি শুল্কের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে ভারত। বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জসওয়াল স্পষ্ট জানিয়ে দেন, কারও চাপে পড়ে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে সম্পর্ক খারাপ হবে না। আর বিদেশমন্ত্রকের এই বিবৃতি শুধু যে কথার কথা নয়, সেটাই স্পষ্ট মোদী ও পুতিনের ফোনে কথোপকথের মধ্যেই।

ব্রাজিলও একইভাবে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে। কারণ তাদের উপরও ট্রাম্প ৫০% শুল্ক চাপিয়েছেন। এই প্রসঙ্গে আমেরিকার সঙ্গে সরাসরি বৈঠকে বসার ডাক উপেক্ষা করে প্রেসিডেন্ট লুলা শুনিয়ে রেখেছেন, ‘ট্রাম্পকে ফোন করে আমি আর অপমানিত হবে না। তার চেয়ে মোদী বা শি-কে ফোন করে আলোচনায় বেশি ভাল ফল মিলবে।‘ এরপর সত্যি সত্যি মোদী ও লুলা-র মধ্যে প্রায় এক ঘণ্টা ফোনে কথা হয়। দুই দেশ-ই ২০৩০-এর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে ২০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা গ্রহণ করেছে। ‘গ্লোবাল সাউথ’ দেশগুলির মধ্যে এই সুষ্ঠু আলোচনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদী এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, ‘পিপল সেন্ট্রিক পার্টনারশিপ’। এসব দেখেশুনে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ও দক্ষিণ আমেরিকার বৃহত্তম বড় রাষ্ট্র নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ঠিক করে নিচ্ছে মার্কিন দাদাগিরি মোকাবিলা কোন পথে করতে হবে।
শুধু কি তাই? সাতবছর পর প্রধানমন্ত্রী মোদীর বেজিং সফর ঘিরেও আন্তর্জাতিক মহলে জল্পনা তুঙ্গে। অগাস্টে দুই রাষ্ট্রপ্রধানের সাক্ষাৎ হলে সেটা হবে আমেরিকার কাছে সবচেয়ে বড় ধাক্কা। সীমান্ত সমস্যা মিটিয়ে ভারত ও চিন বাণিজ্যে কাছাকাছি এলে ট্রাম্পের ‘মেড ইন আমেরিকা’ নীতি ধাক্কা খাবেই। কারণ, চিনের সস্তার কাঁচামাল ও ভারতের মানবসম্পদ গোটা বিশ্বেই সুবিদিত। পাশাপাশি রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট পুতিনও ভারতে আসছেন। মোদী-পুতিন সাক্ষাতে যদি রুশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনায় জোর দেয় দিল্লি, তাহলে সেটাও ট্রাম্পের কাছে বড় ধাক্কা হবে। ইতিমধ্যেই ভারতীয় সেনা কর্তারা ‘অপারেশন সিঁদুর’ চলাকালীন রুশ ডিফেন্স সিস্টেম ‘এস-৪০০’-এর ঢালাও প্রশংসা করেছেন। সেটা কি ওই ক্ষেত্রকেই আরও প্রশস্ত করতে? এই প্রশ্নও তুলছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, বিশ্বের প্রায় ৪৬% জনসংখ্যাই ব্রিকস সদস্য দেশগুলির। গ্লোবাল জিডিপি-র প্রায় ৩৫.৬% অবদানও। আর তাই ট্রাম্পের বাণিজ্যিক ও আর্থিক খামখেয়ালিপনার বিরুদ্ধে ক্রমশ ব্রিকস দেশগুলি একজোট হলে সেটা ট্রাম্পকে জোর ধাক্কা দিতে পারে বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।