EXPLAINED: অভিষেকই লোকসভার লিডার, এক ঢিলে ক’টা পাখি মারলেন মমতা? – Bengali News | What message did Mamata want to give to Abhishek Banerjee by making him the leader of Trinamool Congress in the Lok Sabha
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে লোকসভায় তৃণমূলের দলনেতা ঘোষণা করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বা বলা ভাল সর্বসম্মতভাবে তাঁকে এই পদে আনা হচ্ছে তা নিজেই জানিয়েছেন তৃণমূল সুপ্রিমো। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একটা বড় অংশ এই পদক্ষেপকে আসলে এক ঢিলে অনেকগুলি পাখি মারার সামিল বলেই মনে করছেন। ঠিক কোন কোন পাখি মারলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়? তা নিয়েই পুরোদমে আলোচনা চলছে রাজনৈতিক মহলে।
ঠিক কোন রাস্তায় বাজিমাত মমতার?

দেখুন, জাতীয় কংগ্রেস ছেড়ে ১৯৯৮ সালে যখন তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি করেন মমতা সেই সময় তাঁর সঙ্গে একঝাঁক সহকর্মী বা বলা ভাল অনুগামী যুব কংগ্রেস থেকে চলে এসেছিলেন তৃণমূলে। বেশ কয়েকজন প্রবীণ কংগ্রেস নেতাও মমতাকে সঙ্গ দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে আরও কয়েকজন প্রবীণ কংগ্রেস নেতা তৃণমূলে যোগ দেন। এই যুবক কংগ্রেস থেকে চলে আসা ঘনিষ্ঠ কিছু রাজনৈতিক সহকর্মী, আর দু’একজন প্রবীণ নেতাই ছিলেন তৃণমূল গড়ার পর মমতার কিচেন ক্যাবিনেটের সদস্য। তাঁরাই ছিলেন দিদির ঘনিষ্ঠবৃত্তের ভাই সকল। তারপর কালীঘাটের পাশ দিয়ে বয়ে চলা আদিঙ্গায় বয়ে গিয়েছে অনেক জল। পরবর্তীতে সিঙ্গুর নন্দীগ্রামের মতো আরও অনেক রাজনৈতিক ওঠাপড়ার মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের শাসন ক্ষমতা দখল করে তৃণমূল কংগ্রেস। সেই সময় মমতার ক্যাবিনেটজুড়ে মূলত অতীতের সেই সব যুব কংগ্রেসের অনুগামীদের আনাগোনাই সবথেকে বেশি চোখে পড়ে। এদের মধ্যে যেমন ববি হাকিম, শোভন চট্টোপাধ্যায়, অরূপ বিশ্বাস, মদন মিত্রদের মতো একগুচ্ছ নাম রয়েছে। এর প্রায় কয়েক বছর পরে দেখা যায় রাজনীতির নিয়মে, জীবনের নিয়মে ক্ষমতাসীন তৃণমূলের সদস্যপদ বাড়তে থাকে। ওই যে… যে দল ক্ষমতায় রয়েছে, সেই ক্ষমতাসীন দলে আসতে চাওয়ার একটা স্বাভাবিক সহজাত প্রবণতা বিশ্বের সব প্রান্তে দেখা যায়, তৃণমূলও এর অন্যথা নয়। শুরুর সময়ে এই নবীন ব্রিগেডের প্রাথমিক স্তরে নেতা যদিও শুভেন্দু অধিকারী ছিলেন। কিন্তু, কালক্রমে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে যে তৃণমূলের যুব কংগ্রেসের ভার দেওয়া হল তা তো সকলেরই জানা।
ওই সময় একদিকে তৃণমূলে মমতা ও মমতার পার্শ্বচর মানে ওই যাদের বলছিলাম ওল্ড গার্ড বা আরও সহজ করে বললে প্রবীণ ব্রিগেড। আর অন্যদিকে অভিষেককে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া ক্ষমতার আর একটা উপকেন্দ্র। এই উপকেন্দ্রকে কেন্দ্র করেই আবার নবীন ব্রিগেড। এদের মধ্যে নাকি বড় সংঘাত! এরা নাকি কেউ কাউকে জায়গা ছাড়তে চায় না। এগুলো কান পাতলেই শোনা যায়। কিন্তু সত্যাসত্য যাচাই করা বড় দায়। আবার এও ঠিক, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজনীতিতে নিয়ে আসা, লোকসভা নির্বাচনে টিকিট দেওয়া এই গোটা প্রক্রিয়ায় মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এরপর থেকেই ধীরে ধীরে তৃণমূলে উত্থান শুরু অভিষেকের। দল থেকে বেরিয়ে যান মুকুল-শুভেন্দুও। সংগঠনে ক্রমশ নিরঙ্কুশ হয়ে উঠছিলেন অভিষেক। আর এতেই সেই তথাকথিত নবীন-প্রবীণের চাপানউতোর। কিন্তু দলটার নাম যে তৃণমূল কংগ্রেস! যাদের মূল কথা সবার উপরে মমতা সত্য, তাহার উপরে নাই! ফলে যখনই দলের অন্দরে আকচা-আকচি বেড়েছে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে এসে জানিয়ে দিয়েছেন দলে তিনিই শেষ কথা! অতঃপর কেউ খুশি হয়েছেন, কেউ বা অখুশি। কিন্তু, মানতে হয়েছে সকলকে। এত অবধি তো পরিষ্কার হল, কিন্তু মমতার পরেই যদি কারও স্থান থেকে থাকে দলে তিনি যে অভিষেক এ বিষয়েও কোনও সন্দেহ নেই তৃণমূলী জনতার। তবে আবারও সেই একই কথা, কেউ খুশি হোক বা অখুশি, মানতে হবে সক্কলকে।

তবে তৃণমূলে অভিষেক বন্দ্য়োপাধ্যায়ের উঠে আসার এক মাত্র কারণ যে দলনেত্রীর সঙ্গে তাঁর রক্তের সম্পর্ক তা বললে কিন্তু সত্যের অপলাপ হবে! অভিষেক দলে নিজের মতো নিজের উপযোগিতা প্রমাণ করেছেন, একথাও মেনে নেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। আসলে মমতা মানেই মেঠো আবেগ, স্ট্রিট ফাইটিংয়ের স্ট্রং রুম। আপাদমস্তক সহজাত, অকপট এবং লাগামহীন এক রাজনৈতিক সত্ত্বার বহিঃপ্রকাশ। অন্যদিকে অভিষেক চলেন কিন্তু একটু অন্য ঢঙে। চোখে তাঁর চশমা, দৃষ্টিতে প্রত্যয়। শানিত বাচনভঙ্গি, শহুরে আদব-কায়দা, ডেটা ড্রিভেন, কর্পোরেট স্টাইলে রাজনীতি…. যা তৃণমূলে ভালই স্বীকৃত। অর্থাৎ কোনওটাই এ ক্ষেত্রে বনাম নয়, আসলে এবং! ফলে বোঝাই যাচ্ছে মমতা ও অভিষেক দুটো আলাদা রকম। আর তাই মাঝেমধ্যেই তাতে সংঘাত হওয়াটা খুব অস্বাভাবিক নয় বলেই মত মনে করা হয়। কিন্তু, অভিষেকের রাজনৈতিক জীবন তো আগাগোড়াই মমতা ব্র্যান্ড অফ পলেটিক্সেই আচ্ছন্ন! এর ফলে দূরত্ব বাড়লেও ঘুচেও যায় খুব তাড়াতাড়ি।
এই যেমন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অসুস্থতার কারণে লোকসভার দলনেতার পদে অভিষেকের অভিষেক ঘটানো। শোনা গিয়েছিল চব্বিশের লোকসভা ভোটের আগেও দলের বেশ কয়েকজন প্রবীণকে ফের টিকিট দেওয়ার বিপক্ষে সওয়াল করেছিলেন অভিষেক। তবে সেটা দলের অন্দরে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অভিষেকের সেই আপত্তিতে যে আমল দেওয়া হয়নি তা স্পষ্ট সুদীপ সৌগতদের লোকসভা আলো করে বসে থাকার মধ্যে দিয়ে। কিন্তু এ হেন আস্থাভাজন ওল্ড গার্ড, প্রবীণ রাজনীতিক সুদীপ অসুস্থ হওয়ায় মধ্যে তিরিশের অভিষেকের হাতে লোকসভায় দলের নেতৃত্বের ব্যাটন তুলে দেওয়ায় মমতা এক সুচারু রাজনৈতিক চাল চেলে দিলেন। এদিকে এই সুদীপকেই মমতা ডাকেন আবার সুদীপদা বলে। এখান থেকেই কিন্তু দলে তাঁর সিনিয়রিটিটা বোঝা যায়। সেই সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বয়সও হয়েছে বেশ খানিকটা, প্লাস তিনি অসুস্থ। অসুস্থতার কারণেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিষেককে লোকসভায় তৃণমূলের দলনেতা হিসাবে দায়িত্ব দিচ্ছেন বলে ঘোষণা করেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একটা বড় অংশ মনে করছে সুদীপের পর অভিজ্ঞতার বিচারে সৌগতর নাম ছিল, কল্যাণের নাম ছিল, কাকলি ঘোষদস্তিদারের মতো সাংসদ রয়েছেন। কিন্তু তাঁদের কেউ এই দায়িত্ব পাননি। সুতরাং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদপ্রাপ্তির মধ্যে দিয়ে একটা বার্তা বড়ই স্পষ্ট হয়ে গেল। কী সেই বার্তা বলুন তো? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন বার্তাটা হচ্ছে নেত্রী নবীন প্রজন্মকেও যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছেন। তবে কিন্তু শুধু ব্যাখ্যা এটাই হতে পারে না। মানে শুধু মমতার নবীনে আস্থা বললে ব্যাপারটা সম্পূর্ণ হয় না।
মমতার ব্রান্ড অফ পলিটিক্সের ধারক-বাহক
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দলের মধ্যে অভিষেকের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার সাফল্য তার এই নতুন দায়িত্ব প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিবেচিত হয়েছে। আমরা যদি তৃণমূলে নেতৃত্বের হায়ারারকির দিকে তাকাই তাহলে মমতার পরেই যে অভিষেকের স্থান রয়েছে এ নিয়ে কোনও প্রশ্নচিহ্নই নেই। তবে কারও মনে কোনও প্রশ্ন না থাকলেও সন্তোষ অসন্তোষের কথাটা কিন্তু আলাদা। মানে একেবারেই অন্য বিষয় ওটা। কিন্তু অবস্থান বিচারে যে তিনি দ্বিতীয় এ নিয়ে কারও মনে কোনও কনফিউশন নেই। সে কারণে কবেই তাঁর নামের শেষে জুড়ে গিয়েছে সেকেন্ড ইন কমান্ড তকমা। কে তাতে খুশি, কে তাতে অখুশি, সেটা অন্য কথা! অভিষেকের এই যে ঝকঝকে উপস্থাপনা, ইংরাজি-বাংলা-হিন্দিতে তাঁর যে অবাধ বিচরণ, নবপ্রজন্মের রাজনীতিকের যে নতুন সমীকরণ তিনি প্রতিনিয়ত এঁকে চলেছেন তা তাঁর নতুন দায়িত্ব প্রাপ্তির পিছনে অন্যতম রসায়ন হিসাবে কাজ করেছে বলে মত অনেকেরই। এ তো গেল একটা দিক। এবার আসা যাক আর একটা পাথির কথায়। কারণ, ওই যে আপনাদের বলেছিবাম অনেকগুলি পাখির কথা।

এই মুহূর্তে ভারতে জাতীয় স্তরের রাজনীতিকদের দিকে তাকালে যে নামগুলি দেখা যায় সেগুলিকে অভিজ্ঞতা ও বয়সের নিরিখে যদি ভাগ করা যায় তাহলে শীর্ষ তালিকায় যে কটা নাম রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সনিয়া গান্ধী সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নিয়েছেন, সেভাবে আর তৎপর হতে দেখা যায় না শরদ পাওয়ারকে। অন্যদিকে লালু আবার রাজনৈতিক বাণপ্রস্থে, নীতিশ কুমার কোনও বিশেষ প্রক্রিয়ায় মুখ্যমন্ত্রিত্ব সামলে যাচ্ছেন বটে কিন্তু তাঁকে আর খুব একটা জাতীয় রাজনীতির সক্রিয় কুশীলব বলে কেউ খুব একটা মনে করেন না। এই অবস্থায় কেন্দ্রে মোদী সরকারের থার্ড টার্ম চলাকালীন বিরোধী রাজনীতির যে স্পেস তৈরি হয়েছে সেখানে মূল বিরোধী দলের জায়গায় রয়েছে কংগ্রেস, বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। তারপরেই রয়েছে সমাজবাদী পার্টি, নেতৃত্বে অখিলেশ যাদব। অন্যদিকে আরজেডির নেতৃত্ব দিতে দেখা যাচ্ছে লালুপুত্র তেজস্বী যাদবকে। ওদিকে আবার রয়েছেন বাল ঠাকরের নাতি আদিত্য ঠাকরে। এদের সঙ্গে মমতা তো একেবারেই সমকক্ষ নন। ভুলে গেলে কিন্তু চলবে না, রাহুল গান্ধীর পিতা রাজীব গান্ধীর সঙ্গে রাজনীতি করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সনিয়ার সমসাময়িক তিনি। তাই রাহুলদের এই প্রজন্মের সঙ্গে মমতা অভিজ্ঞতার মাপকাঠিতে অনেক যোজন এগিয়ে। শুধু তাই নয়, আসলে তো দুটো ভিন্ন প্রজন্ম। ফলে এদের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে রাজনীতির সুর বাঁধা মমতার জন্য ঠিক শোভাও দেয় না। আবার অনেক বলেন চাপেরও বটে। কারণ তাঁদের বাবা-কাকাদের সঙ্গে রাজনীতি করে এসেছেন যে তিনি। সে কারণেই তাঁর রাজনীতির উত্তর প্রজন্ম হিসাবে অভিষেকেই সিলমোহর দিয়েছেন মমতা। করেছেন তাঁর ব্রান্ড অফ পলিটিক্সের ধারক-বাহক।
মেন্টর মমতা?
পাশাপাশি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে এই মুহূর্তে সক্রিয় রাজনীতিতে রয়েছেন। শুধু রয়েছেন তাই নয়, পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজনৈতিকভাবে তপ্ত রাজ্যের রাজ্যপাঠ তৃতীয় দফার জন্য সামলে চলেছেন। আজ তাঁর দলের একমাত্র তিনিই যাঁকে দেখে নির্বাচন হয়। এ কথা যেমন স্বীকার করেন অভিষেক, তেমনই স্বীকার করেন বাংলার যে কোনও ব্লকের যে কোনও নেতাই। ফলে পশ্চিমবঙ্গে প্রশাসনিকভাবে যে গুরুদায়িত্ব তিনি এই মুহূর্তে সামলাচ্ছেন তা থেকে সরার কোনও প্রশ্নই নেই। অন্যদিকে জাতীয় স্তরে আবার বিরোধী পরিসরে যে স্পেসটা তৈরি হচ্ছে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একদিকে SIR ঘোষণা হওয়ার পরপরই তা ঘিরে নানা অভিযোগ আনতে শুরু করেছে বিরোধীরা। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে নিয়ে ভারত-পাক নিয়ে নাক গলানোর বিতর্ক তো রয়েইছে পাশাপাশি শুল্ক চাপানোর যে অভূতপূর্ব কূটনীতি সামনে আনছেন, এই সব কিছুকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রকে চেপে ধরতে শুরু করেছে বিরোধীরা। আর এই সবটাই যে খুব গুরুত্বপূর্ণ তা দলের সাংসদের বুঝিয়ে দিয়েছেন মমতা। করেছেন বৈঠক। যেখানে মমতা পরিষ্কার বলেছেন আমি আমার লোকসভা টিমের পারফর্মেন্সে খুশি নই, রাজ্যসভা অপেক্ষাকৃত ভাল করছে। অর্থাৎ রাজধানীতে যে সংসদীয় তৃণমূল দলের ভূমিকা যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তা বুঝতে পারছেন মমতা। কিন্তু রাজ্য সামলে দিল্লিতে গিয়ে পড়ে থাকা তো আর তার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু তিনি আবার দীর্ঘদিনের পার্লামেন্টেরিয়ান।

কিন্তু মমতা তো বলেছেন সুদীপ সুস্থ হওয়া পর্যন্ত অভিষেক এই দায়িত্বে। অর্থাৎ সেই দিক থেকে দেখতে গেলে ছোট্ট ইনিংস। কিন্তু অভিষেক যেভাবে শুরু করলেন তা দেখে অনেকেই বলছেন, ছোট্ট ইনিংসটা যে বড় হবে না তা কে বলতে পারে! এই যেমন দেখুন না অপারেশন সিঁদুরের পর আমাদের দেশের পক্ষ থেকে যে প্রতিনিধি দল বাইরে গিয়েছিল, সেখানেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে পাঠিয়েছিলেন। শুরুতে যদিও তৃণমূল সাংসদ হিসাবে জুড়েছিল ইউসুফ পাঠানের নাম। কিন্তু মমতা তা খারিজ করে দেন। পরে জানা যায় যাচ্ছেন অভিষেক। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু ফোন করে মমতার কাছে জানতে চান, তিনি কাকে প্রতিনিধি হিসেবে পাঠাবেন। উত্তরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম বলেন মমতা। তারপর বিদেশ গেলেন অভিষেক। জাপানে গিয়ে শান দিলেন বাঙালি আবেগে। তখনও কিন্তু বাঙালি অস্মিতা নিয়ে হইচই শুরু হয়নি বাংলায়। কিন্তু সলতেটা কি তখনই পাকাতে শুরু করে দিয়েছিলেন? বিদেশের মাটিতে স্বাধীনতা সংগ্রামী রাসবিহারী বসুর স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধার্ঘ জানানোর পাশাপাশি আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠনে রাসবিহারীর উজ্জ্বল অবদান স্মরণ করিয়ে দেন অভিষেক। অর্থাৎ শানিত অভিষেক, যে আরও শানিত হচ্ছেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে। এবার আসি পরের পাখিতে।
শেষ কথা শৃঙ্খলাই
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একদম পুরনো দিনের সঙ্গী। দল কোনও আইনি বিপাকে পড়লে আজও কল্যাণে ভরসা রাখেন মমতা। কল্য়াণও সেই অল্ড গার্ডদেরই একজন। এতদিন লোকসভার চিফ হুইপও ছিলেন। সেই কল্যাণকেই নানা সময় মহুয়া মৈত্রের বিরুদ্ধে নানা অসংযত মন্তব্য করতে দেখা গিয়েছে। যদিও মহুয়াও হেঁটেছেন একই রাস্তায়। কিন্তু দলের মুখ্য সচেতক হওয়ার পরে কল্যাণ যেভাবে কথা বলেছেন তা যে দল খুব একটা ভাল ভাবে নেয়নি তা বোঝা গিয়েছে মমতার কণ্ঠের উষ্মা থেকেই। কল্যাণ ইস্তফাপত্র দেওয়ার পরেই তা গৃহৃতও হয়ে গিয়েছে। মমতা সাফ বলেছেন, দলের কর্মীদের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলার যে নিয়ম রয়েছে তা একইভাবে প্রযোজ্য দলের সাংসদদের ক্ষেত্রেও। আবার শৃঙ্খলারক্ষার একইবার্তা অভিষেকও দিয়েছেন। কিছুদিন আগেই সাংসদ-বিধায়ক সহ দলের নেতাদের ভার্চুয়াল বৈঠকে বলেন, “৮০ হাজার বুথে আগামী দুই মাসের মধ্যে দুটো করে সভা করুন। দলের ঊর্ধ্বে কেউ না। একত্রিত হয়ে লড়াই করুন। দলে কোনও আমি তুমি চলবে না। যদি কেউ আমি-তুমির রাজনীতি কর, পরিণতি খুব খারাপ হবে। দল যাকে দায়িত্ব দেবে, পছন্দ না হলেও কাজ করতে হবে তার সঙ্গে।” যা দেখে রাজনীতির কারবারিদের বড় অংশ বলছেন, অভিষেক জানেন মাঠটা নতুন হলেও পিচটা তাঁর চেনা। প্রবীণ-নবীন ইস্যুতে দলের মধ্যে কোনও ক্ষেদের পলি পড়লে মমতার পাশাপাশি তা তিনিও ড্রেজিং করবেন। অর্থাৎ মমতা-অভিষেক একসঙ্গেই বলছেন তানাশাহি নাহি চলেগা। যদিও কল্যাণ-অভিষেকের কিন্তু আলাদা করে কথা হয়েছে। কিন্তু কী আলোচনা হয়েছে তা প্রকাশ্যে আসেনি। শুধু কল্যাণ বলেছেন আলোচনা সদর্থক। অর্থাৎ, দায়িত্ব পাওয়ার পরেই অভিষেক যে সকলকে নিয়ে চলার অ্যাপ্রোচ দেখাচ্ছেন তা পরিষ্কার।

এদিকে আবার নতুন দায়িত্ব পাওযার পর বৃহস্পতিবার সংসদে যান অভিষেক। সংসদে এসেই দলীয় সাংসদদের সঙ্গে বৈঠকে বসলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানালেন লোকসভায় কল্যাণের জায়গায় আসা তৃণমূলের নতুন চিপ হুইপ কাকলি ঘোষ দস্তিদার। কিন্তু এখানেও অভিষেক রাখলেন সৌজন্যের ছাপ। দলের সাংসদদের সঙ্গে প্রথম বৈঠকে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লোকসভার দলনেতার চেয়ার ফাঁকা রেখে পাশের চেয়ারে বসলেন অভিষেক। সেই ছবিও ইতিমধ্যেই সামনে এসেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন এ থেকেই বোঝা যাচ্ছে মমতার অভিষেক এই মুহূর্তে রাজনীতির আঙিনায় ঠিক কতটা পরিণত।
‘কাছের লোক নয়, কাজের লোক’
অন্যদিকে নো-ননসেন্স লিডার হিসাবে দলের মধ্যে ইতিমধ্যেই গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে অভিষেকের। Abhisekh is very strict, Abhisekh is very performance driven, অভিষেকের কোনও কাছের লোক নেই, অভিষেকের ক্ষেত্রে সবাই কাজের লোক হতে হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বড় অংশ বলছেন এখানেই সুকৌশলে খেললেন মমতা। অভিষেকের মতো একজন নেতাকে এতবড় দায়িত্ব দেওয়ার মাধ্যমে বাকিদের কাছে নিরবে একটাই বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করলেন তৃণমূল সুপ্রিমো। কী সেটা? এবার থেকে সবটাই মানে কাজ, কাজ আর দিনের শেষ কাজটা খুবই সিরিয়াসলি দেখা হবে দলের অন্দরে।

অভিষেককে নির্বাচনে যে মমতা প্রাথমিকভাবে সাকসেসফুল তার প্রমাণও কিন্তু এরইমধ্য এসে গিয়েছে। ভাবছেন নিশ্চয়, এই তো দায়িত্ব পেল, এখনও তো অনেক খেলা বাকি! রাজনীতির খোঁজ-খবর যাঁরা রাখেন তাঁদের প্রায় সকলেই জানেন মমতা যখন কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল তৈরি করতে চাইছিলেন সেই সময় একজন একেবারেই চাননি মমতে চলে যান। খুব করে চেয়েছিলেন তিনি থেকে যান। সেই মানুষটার নাম সনিয়া গান্ধী। মমতা আলাদা দল গড়ার পরে এনডিএ-র সঙ্গে জোটে গিয়েও ফের ফিরে এসে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করছিলেন। তখন মমতাকে স্টিয়ারিং হুইলে রেখে জোট গড়াতে রাজ্য পার্টিকে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি তাঁর নাম সনিয়া গান্ধীকে। মমতাকেও বারবার বলতে শোনা গিয়েছে সনিয়ার সঙ্গে তাঁর একটা বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে একাধিকবার তাঁদের সম্পর্কের রসায়ন পুরোদমে দেখা গিয়েছে। এমনকী এই কদিন আগে ইন্ডিয়া ব্লকের বৈঠকেও সনিয়া রাহুলের মাঝখানে মমতা বসেছেন। সনিয়ার স্বামী রাজীব গান্ধীও মমতাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। মমতার কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্বের শুরুটাও তো হয়েছিল রাজীব গান্ধীর ক্যাবিনেটের মন্ত্রী হয়ে। এই ব্যাকগ্রাউন্ডে দাঁড়িয়ে অভিষেক আবার রাহুলের ফোন পেয়ে ছুটে গিয়েছিলেন দিল্লিতে। রাহুলের বাড়িতে যোগ দিয়েছিলেন ডিনারে। অভিষেকের স্বাগত জানাতে এগিয়ে আসেন খোদ রাহুল গান্ধী এবং সোনিয়া গান্ধী। তাঁদের সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথন পরিষ্কার করে দেয় মমতার লোকসভার দলনেতাকে শ্রীমতি গান্ধী গ্রহণ করেছেন করেছেন। অর্থাৎ, ভালই মতোই অভিষেকের অভিষেক তো হল, এখন দেখার আগামী দিনে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর এই নতুন ভূমিকা সঠিকভাবে ব্যবহার দলের জন্য ও তাঁর নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য কতটা সুদিন নিয়ে আসতে পারেন!