উত্তমকে সেদিন বাঁচিয়ে ছিলেন সৌমিত্র, মহানায়কের জীবনের চিরকালের সমস্যা মুহূর্তে মিটিয়ে ছিলেন পুলু – Bengali News | Untold story of soumitra chatterjee and uttam kumar on shooting floor
ঘড়ির কাঁটা তখন দেড়টা ছুঁয়েছে। টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে তুমুল ব্যস্ততা। শুটিং ফ্লোরে বড় বড় লাইটের ঝলকানি। আর ট্রলি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে উত্তম কুমার ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। মনিটারে চোখ রেখেছেন বাংলা ছবির প্রবাদপ্রতীম পরিচালক দিলীপ মুখোপাধ্যায়। সিনেমার নাম তখনও ঠিক হয়নি। তবে দুরন্ত গতিতে রোজই চলছে শুটিং। বাঙালির দুই প্রিয় নায়ক তখন মুখোমুখি। দৃশ্য সৌমিত্র ও উত্তমের বাকযুদ্ধ। পরিচালক অ্য়াকশন বলতেই সংলাপ শুরু করলেন উত্তম। পাশে দাঁড়িয়ে সৌমিত্র। কিন্তু একী, সংলাপ বলতে গিয়ে মহানায়ক হঠাৎ থমকে গেলেন? কী হল আচমকা? পরিচালক কাট বলতেই নিয়মমাফিক, ঝড়ের বেগে উত্তমের কাছে আসলেন মেকআপ ম্যান, টাচ আপ দিয়েই ফের যথাস্থানে। সৌমিত্রও তখন নিজের পাঠ বুঝে নিচ্ছেন। আর উত্তম? সংলাপ লেখা কাগজের দিকে তাঁর কড়া নজর। আওড়ে যাচ্ছেন একই শব্দ বার বার। সেদিকে নজর গেল সৌমিত্রর। মহানায়কের কাছে গিয়ে সৌমিত্র বললেন, ‘অসুবিধা হচ্ছে? পরিচালককে বলে বদলে নাও!’ সৌমিত্র জানতেন, উত্তম যদি একবারটি পরিচালককে একথা বলতেন, পরিচালকের মানা করার সাহস ছিল না। কারণ, পরিচালকও জানতেন তিনি ইন্ডাস্ট্রির মহানায়ক। কিন্তু ওই যে ‘দ্য গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম’ মানুষদের স্বভাবের মধ্যে অদ্ভুত একটা মিল রয়েছে, তাঁরা কেউই হারতে জানেন না। উত্তমও তো তাঁদের মধ্যেই পড়েন। লড়াই তো তাঁর মহানায়ক হয়ে ওঠার প্রধান হাতিয়ার ছিল! সেই উত্তম একটা শব্দের কাছে মাথানত করবেন! একদম নয়, উত্তমও তা করলেন না!
শুটিংয়ের ফাঁকে একথা ভাবতে ভাবতে যখন ফ্লোরের বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেটে সুখটান দিচ্ছেন সৌমিত্র, ঠিক তখনই পাশে এসে দাঁড়ালেন উত্তম। ‘পুলু আমাকেও একটা সিগারেট দে তো!’ সেদিন অন্যদিনের মতো উত্তমের কণ্ঠস্বরের তেজ ছিল অনেকটাই কম। তা বুঝতে দেরি হল না, সৌমিত্রর। পকেটে হাত দিয়ে সিগারেট বার করতে করতে উত্তমদার মুখের দিকে নজর গেল সৌমিত্রর। ধরতে পারলেন মহানায়কের চোখে মুখে ছড়ানো অদ্ভুত এক টেনশন। উত্তমদাকে সোজা প্রশ্ন, ‘কী হয়েছে তোমার দাদা? শরীর ঠিক আছে তো!’ সিগারেটের ধুঁয়ো ছেড়ে উত্তম দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন। ‘ভাই পুলু, তাহলে তোকেই বলি। আমার ছোটবেলা থেকেই তুতলে যাওয়ার একটা সমস্যা রয়েছে। একটানা কথা বললেই, কোনও একটা শব্দ বলতে গিয়েই আটকে যাই, আর তখনই সব গুলিয়ে যায়। বহুদিন ধরেই এই সমস্যা কাটানোর জন্য নানা রকম ব্যবস্থা নিয়েছি। তবে আজ অনেকদিন পর এটা ঘটল! তাই একটু চিন্তিত। ‘
উত্তমের কাছ থেকে এই কথা শুনে হেসেই ফেললেন সৌমিত্র। ‘দাদা তুমি মহানায়ক। পর্দায় এসে দাঁড়ালে তুমি সোজা দর্শকের মনে প্রবেশ কর। তোমার এক হাসিতেই দৃশ্যে ম্যাজিক চলে আসে, সেই উত্তম কুমার এসব নিয়ে বিচলিত!’ সৌমিত্রর মুখে একথা শুনে উত্তমও হালকা হাসলেন। এরপর সৌমিত্র বললেন, ‘দেখো দাদা একটা কায়দা আছে। মঞ্চে এটা আমিও ট্রাই করি। যে শব্দ বলতে গিয়ে আটকে যাই, সে শব্দকে ভাগ করে বলি। সেই শব্দে জোর দিই না। বরং সেখানে অভিব্যক্তি, সেই শব্দের প্রক্সি দেয়। তুমিও এটা করো।’ সেদিন থেকেই সৌমিত্রর এই টিপসের ফল হাতেনাতে পেলেন উত্তম। তারপর থেকে একটা ছবির শুটিংয়েও উত্তম এই সমস্য়ার সম্মুখীন হননি। আর যখনই সুযোগ পেয়েছেন সৌমিত্রকে ধন্যবাদ জানাতে ভোলেননি। পর্দায় যাঁর সঙ্গে প্রতিযোগিতা, অনুরাগীদের কাছে উত্তম-সৌমিত্রর লড়াই। বাস্তবে কিন্তু চিত্রটাই আলাদা। বরং দুই ভাইয়ের মতোই একে অপরের সহযোগিতায় এগিয়ে আসাকেই শ্রেয় বলে মানতে উত্তম-সৌমিত্র। আর সেই কারণেই হয়তো আজও এই দুই নায়ক বাঙালির মনে অনেকটা জায়গা করে রেখেছেন।