অক্সফোর্ডে প্রতিবাদের মুখে মমতা, রাজনৈতিক ভাবে লাভ হল ‘দিদি’র - 24 Ghanta Bangla News
Home

অক্সফোর্ডে প্রতিবাদের মুখে মমতা, রাজনৈতিক ভাবে লাভ হল ‘দিদি’র

Spread the love

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়, সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক

কত সাল? এখন আর ঠিক মনে নেই। প্রাক হোয়াটসঅ্যাপ যুগ। তখনও চুপকথা মানে এসএমএস। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেদিন দিল্লিতে। পরের দিন রাজধানী শহরেই ওঁর একটা সভা হওয়ার কথা। ওঁর তখন বিএসএনএল নম্বর। পুরনো যুগের সাধারণ ফোন। রাতের বেলা সেই ফোনে একটা মেসেজ ঢুকল। মেসেজে লেখা, ‘কাল তোমার সভায় ঝামেলা হতে পারে। দেখে নিও।’ তার অনেক আগে থেকেই রাজনৈতিক মহলে, সাংবাদিকের মধ্যে এবং সবচেয়ে বড় কথা সাধারণ মানুষের কাছেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘দিদি’ নামে পরিচিত হয়ে গিয়েছেন। এহেন ‘দিদি’ উত্তরে লিখলেন, ‘ওক্কে’। ইংরেজিতে ওকেকে। ব্যস, ওইটুকুই। কে ঝামেলা করবে, কেন করবে, কীভাবে করবে— কিছু জানতে চাননি সেদিন। এর পরেই পরিচিত মেজাজে ফোন কানে তুলে… ‘মুকুল, অমুক আমাকে মেসেজ করেছে। দেখে নিও।’ গল্প শেষ!

পরের দিন সকালে মুকুল রায় সেই অমুককে ফোন করলেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হয়েছে রে?’ অমুক যা বলার বলল। মুকুল রায় ফোন রেখেই তৎপর হলেন। সেই দিনের সভায়, যে ঝামেলা খুব বড় আকার নিতে পারত, সেই ঝামেলা খুচরো ঝামেলায় পর্যবসিত হল। সব খবরের চ্যানেলে লাইভ চলাকালীন দিদি বললেম, ‘আমার কাছে আগেই খবর ছিল।’ গল্প আরও শেষ!

এর পরে যমুনা থেকে শুরু করে গঙ্গা, গঙ্গা থেকে শুরু করে দিদির বাড়ির পাশের আদি গঙ্গা দিয়ে কত কত জল ও দূষণ বয়ে গেল। তার পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফোন নম্বর বদলাতে বদলাতে একটা সময় এল যেদিন দিদি অক্সফোর্ডে গেলেন। কেলগ কলেজে তাঁর বক্তৃতা চলাকালীন যা হল, তাকে ভাবগম্ভীর বাঙালিরা ‘হিউমিলিয়েশন’ বলেন! আর রকের ভাষায় বলা হয়— ‘বাওয়াল’।

কয়েক জন নব্যযুবা ও বিগতযুবা মিলে যা করলেন, সেটা কোনও প্রতিবাদের ভাষা ও আচরণ হতে পারে কি না, তা নিয়ে বহু দিন চর্চা চলবে। তবে একথা মেনে নেওয়া যায়, যা হল, তা মমতাকে অপমান করার জন্যই হল। সেই কারণেই, সিঙ্গুর থেকে অভয়া হয়ে হিন্দুস্বার্থ— এইসব কথা তোলা হল। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই গেল, এতে দিদি অপমানিত হলেন কি? তাঁর রাজনৈতিক ক্ষতি হল কি?

ধরা যাক সিঙ্গুর। টাটা কি মমতার জন্য সিঙ্গুর ছেড়েছিলেন নাকি বুদ্ধবাবুর জনবিচ্ছিন্ন শিল্পনীতির জন্য? এই বিতর্ক এখনও সজীব। বহুফসলি জমি কেন তাঁর ‘রতনের’ হাতে তুলে দিয়েছিলেন বুদ্ধবাবু? এই প্রশ্ন এখনও সিপিএমের অনেক নেতা-কর্মীর মনেই আছে। তাছাড়া মধ্যবিত্তের (নিম্ন?) একলাখি গাড়ি শেষ পর্যন্ত ধনীদের টয়কারে পরিণত হয়েছে। টাটার ন্যানো প্রোজেক্ট কি সফল? এই ধরনের অনেক প্রশ্ন থাকতে পারে। সেই সব প্রশ্নে যাচ্ছি না। যেমন যাচ্ছি না যেদিন রতন টাটা শেষ বারের মতো মহাকরণে এলেন, সেদিন কেন বিরোধী দলনেত্রীকে ডাকা হল না। এমনকী, নিরপেক্ষ একজন, যিনি চাইছিলেন, সব দিক বজায় রেখে বিষয়টা ভালোয় ভালোয় মিটুক, তিনি গৌতম দেবকে ফোন করে বলেছিলেন, ‘এটাই শেষ সুযোগ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ডাকুন।’ কেন শেষ চেষ্টা করা হল না? সেই আলোচনাও থাক। বরং আসা যাক নতুন প্রশ্নে। তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষের কথা থেকে এবারেও আমরা জানতে পারি যে, উনি আগে থেকেই সব জানতেন।

জানতেন? এবারেও জানতেন তিনি? তাহলে যখন ইনফরমেশন ছিল, তখন তাঁরা এটা থামানোর চেষ্টা করেছিলেন কি? ব্রিটিশ পুলিশকে জানানোর চেষ্টা? ধরে নিলাম জানিয়ে ছিলেন। তাহলে ব্রিটিশ পুলিশের ব্যর্থতা কি এটা? একজন অগ্রজ সাংবাদিক বললেন, ব্রিটিশ পুলিশ বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। কতটা বিশ্বাস করে? অক্সফোর্ডের অতিথি, দেশের অতিথি। একজন সত্তর পেরনো মহিলাকে একদল মানুষের প্রায় চিৎকারে নিজের কথা থামিয়ে দিতে হবে, এমন প্রতিবাদের ভাষায়, এতটা বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাস করে তারা? হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে বসে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা বেশ কঠিন। কিন্তু যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এই বাংলার মাটিতেই আসতে হবে, তা হল গোটা ঘটনায় লাভ কার?

কেলগ কলেজের এই সভায় প্রতিবাদের ইস্যু হয়ে উঠেছিল একটি নাম— অভয়া। গত বছর থেকে এই নামটা কলকাতার সর্বস্তরের মানুষের কাছে পরিচিত। এই নামকে সামনে রেখেই কলকাতার বুকে ‘অতি-আত্মবিশ্বাসী’ ছাত্র-ডাক্তাররা আন্দোলন চলছিল। কোনও রাজনীতিকের পরামর্শ না নিয়ে (বিজেপি না হোক, এমনকী নকশাল নেতা অসীম চট্টোপাধ্যায়েরও নয়) তাঁরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে লড়তে নেমেছিলেন! সেই আন্দোলন কতটা ঠিক, কতটা ভুল, কতটা স্বার্থের, কতটা সময়ের তাগিদের— সেটা অন্য আলোচনার বিষয়। কিন্তু যে কথা না বললেই নয়, তা হল আন্দোলনকারীদের রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার কথা। কার সঙ্গে লড়তে গেলেন তাঁরা? মমতার সঙ্গে। যিনি রাজীব গান্ধী, অটলবিহারি বাজপেয়ী থেকে জ্যোতিবাবু-প্রণববাবুর মতো তাবড় নেতাদের সঙ্গে সমানে সমানে লড়াই করেছেন, এবং সেই সব কঠিন রাজনৈতিক পরীক্ষা পেরিয়ে আজ এই জায়গায় এসেছেন। তাঁর মতো রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে লড়তে হলে যে কড়া রাজনীতি দিয়েই লড়তে হবে, এ কথা বুঝতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। এত দিন ধরে যেভাবে আন্দোলন চালিয়েছেন, সেভাবে যে সাফল্য পাননি, তা তো তাঁরা জানতেন। তাহলে অক্সফোর্ডে আবার অভয়া ইস্যু তুলে কী লাভ করতে পারতেন ওঁরা?

প্রতিবাদের ধ্বনি উঠল। অভয়ার নাম ফের উঠল। জবাব বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে মমতার সংক্ষিপ্ত জবাব— ‘বিষয়টা বিচারাধীন’। আচ্ছা, এই ছোট্ট উত্তরেই কি কথোপকথন শেষ হয়ে যায় না?

কিন্তু শেষ হল না। এইসবের পরে উঠে এল আরও একটা কথা। হিন্দু! কোনও হিন্দু এই রাজ্যে আক্রান্ত? কোনও সুনির্দিষ্ট তথ্য আছে? যদি না থাকে, তাহলে এহেন ‘প্রতিবাদী’ কথারই বা অর্থ কী?

শেষে যে কথা বলার। কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্ররা এমন প্রতিবাদ করতে পারেন না, তা নয়। প্রতিবাদ, প্রশ্ন এসব তো থাকবেই। তবে ধরনটা কেমন হবে, সেটা নিয়েও কথা চলতে পারে। কিন্তু যাঁরা এই প্রতিবাদে সামিল হলেন, তাঁরা কি এটা কখনও ভেবে দেখেছেন, তাঁরা যা করলেন, তাতে শেষ পর্যন্ত হয়তো রাজনৈতিক ভাবে লাভ হবে মমতারই?

কেন লাভ হবে? এই প্রতিবাদের আওয়াজ যদি দেশের মাটিতে বাংলার মাটিতে উঠত, তাহলে তা অন্য রকম হত। কিন্তু হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে দাঁড়িয়ে এই কাণ্ড আসলে দেশের ভাবমূর্তির প্রশ্নের সঙ্গেও জড়িয়ে গেল। যাঁরা, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজনৈতিক ভাবে পছন্দ করেন না, তাঁদের অনেকেও হয়তো এহেন ঘটনায় বিব্রত বোধ করলেন। আর বাংলায় তৃণমূলের ভোটারদের কাছে? থাক সে কথা। তাঁদের ‘দিদি’কে বিদেশের মাটিতে যাঁরা অপদস্থ করার চেষ্টা করেন, তাঁদের ছবি এই ভোটাররা মনের মধ্যে বাঁধিয়েই রাখবেন। শুধু সেই ছবির ফ্রেমে ফুলের মালা না পরিয়ে, অন্য কিছুর পরাবেন, তা আন্দাজ করাটা কঠিন হবে না।

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

(দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় ৩৫ বছরের বেশি সময় সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। ইংরেজিতে টাইমস অফ ইন্ডিয়া ছাড়াও, বাংলায় বেশ কিছু সংবাদ মাধ্যমে দীর্ঘ দিন কাজ করেছেন পলিটিক্যাল বিভাগে। তিনি বর্তমানে সাংবাদিকতার পাশাপাশি কিছু বেসরকারি সংবাদমাধ্যমে রাজনীতির বিশ্লেষক হিসাবে যুক্ত আছেন।)

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *