ট্রাম্প না থাকলেও ইউক্রেনের পাশে ইউরোপ, রুষ্ট রাশিয়া! তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কি দোরগোড়ায়? – Bengali News | Russia said Macron’s speech amounted to a threat against putin
দীপেন্দু পাল
বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলির মধ্যে একে অপরের প্রতি সম্পর্কের সমীকরণ প্রতিদিন যে হারে বদলাচ্ছে, তা দেখে এই প্রশ্ন তুলতে বাধ্য হচ্ছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা! তবে কি এবার তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে দুনিয়া? কারণ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কার্যত ‘ঘাড়ধাক্কা’ দিয়ে ওভাল অফিস থেকে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে বার করে দিলেও এবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলি তাঁর পাশে দাঁড়ানোরই বার্তা দিলেন। একধাপ এগিয়ে ফরাসি প্রেসিডেন্ট তো ইঙ্গিতও দিলেন, প্রয়োজনে রুশ আগ্রাসন থেকে ইউরোপকে রক্ষায় পারমাণবিক ক্ষমতাও দেখাতে পারে ফ্রান্স। একই আশ্বাস দিল ব্রিটেনও। এমনিতেই ব্রিটিশ ও রুশ বিমান বাহিনী তাদের দক্ষতার জন্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত।
বৃহস্পতিবার ব্রাসেলসে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লদিমির জেলেনস্কিকে পাশে নিয়ে অন্তত ২০টি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য স্পষ্ট জানিয়ে দিল, তাঁরা ইউক্রেনের পাশেই থাকছে। ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনকে ইউরোপ মোটেও ভাল চোখে দেখছে না সেটা পরিষ্কার হয়ে গেল। আমেরিকার কাছ থেকে কার্যত ‘ঘাড়ধাক্কা’ খাওয়ার পর এভাবে ইউরোপের সমর্থন পেয়ে দৃশ্যতই আবেগতাড়িত জেলেনস্কি। বিবিসি-কে বললেন, ‘ধন্যবাদ ইউরোপ। কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ানোর জন্য। তোমরা শুধু মিষ্টি মিষ্টি কথাই বলনি, প্রকৃত অর্থেই সমর্থন করেছো।” ইউক্রেনে শান্তি ফেরাতে আগামীতে কিভে শান্তিরক্ষা বাহিনী পাঠানোরও আশ্বাস ফ্রান্স-ব্রিটেনের।
এই পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু বেলা খানিক গড়াতেই কড়া প্রতিক্রিয়া এল রুশ শিবির থেকেও। শান্তিরক্ষা বাহিনী বা পিস কিপিং ফোর্সের নামে কিভের মাটিতে একজন সেনার পা-ও পড়লে সেটাকে যুদ্ধের ডঙ্কা বাজানো হিসাবেই দেখবে মস্কো, এই ভাষাতেই এবার হুঁশিয়ারি দিলেন পুতিন। তার মানে, এবার সরাসরি ইউরোপকে সতর্ক করলেন রুশ প্রেসিডেন্ট, আরও স্পষ্ট করে বললে ফ্রান্স, ব্রিটেনকে। ক্রেমলিনের বিবৃতি, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইম্যানুয়েল ম্যাক্র-র বক্তব্যকে রাশিয়া ‘থ্রেট’ হিসাবে দেখছে। ভবিষ্যতে এর ফল ভাল হবে না।’
কিন্তু আচমকা কেন এই মন্তব্য করতে গেল রাশিয়া? যাবতীয় টানাপোড়েনের সূত্রপাত ব্রাসেলসে, বুধবার। ফরাসি প্রেসিডেন্টের একটি ভাষণকে কেন্দ্র করে। বুধবার সে দেশের চ্যানেলে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে গিয়ে ম্যাক্র বলে বসেন, আগামী সপ্তাহেই তিনি ইউরোপের দেশগুলির সেনাপ্রধানদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে চলেছেন। সেখানেই ইউক্রেনে সেনা পাঠানোর বিষয়টি চূড়ান্ত করতে চান। তবে এই সেনা কিভে শান্তিরক্ষার কাজ করবে সেটাও তিনি স্পষ্ট করেন। কিন্তু আমেরিকা পাশে না থাকলেও ইউরোপ যে ইউক্রেনের পাশেই থাকবে, সেই বিষয়টিও ভাষণে উল্লেখ করেন ম্যাক্রন। আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ক্রমাগত বেড়ে চলা রুশ আগ্রাসন ভবিষ্যতে ইউরোপ ও ফ্রান্সের জন্য ঘাতক হয়ে উঠতে পারে। ফ্রান্সের পারমাণবিক সক্ষমতার ছাতার নিচে ইউরোপকে সুরক্ষা দেওয়া হবে বলেও টিভিতে ভাষণে জানান ফরাসি প্রেসিডেন্ট। আর তারপরেই ধেয়ে এল রুশ সতর্কবার্তা।
গত সপ্তাহেই এক ঘর মার্কিন সংবাদমাধ্যমের সামনে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্টকে একের পর এক তীব্র বাক্যবাণে বিদ্ধ করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। যে কোনও মূল্যে রাশিয়ার সঙ্গে শান্তিচুক্তি করতে হবে ইউক্রেনকে। শান্তি স্থাপনে রাজি হলে তবেই যেন আবার ওভাল অফিসমুখী হন জেলেনস্কি, সাফ জানান ট্রাম্প। সেই ঘটনার পরও কিন্তু জেলেনস্কি ট্রাম্পকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, রাশিয়া ঘোষিত বন্দি প্রত্যার্পণ চুক্তি মানছে না। কিন্তু ট্রাম্প অনড় থাকেন নিজের তত্ত্বে। এমনকী জেলেনস্কি কেন স্যুট-বুট পরে আসেননি ওভালের মতো ঐতিহ্যমণ্ডিত অফিসে, তা নিয়েও তীব্র কটাক্ষ করেন মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা। একসময় তো মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েন ইউক্রেনীয় প্রতিনিধিও।
কিন্তু এবার প্রায় গোটা ইউরোপকে পাশে পেয়ে আবার চাঙ্গা হয়ে উঠতে পারে ইউক্রেন, সেই আশঙ্কা থেকেই সম্ভবত আগেভাগেই সতর্কবার্তা ধেয়ে এল ক্রেমলিনের তরফে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিদেশমন্ত্রী ল্যাভরভ মস্কোতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বলেন, ‘পূর্বসূরি নেপোলিয়ান, হিটলারের ভাষাতেই কথা বলছেন ম্যাক্র। তাঁরাও স্বপ্ন দেখতেন, রাশিয়াকে হারাবেন, জয় করবেন।’ তিনি আরও স্পষ্ট করেন, ন্যাটো সদস্যভুক্ত কোনও দেশ যেন ইউক্রেনের মাটিতে শান্তি রক্ষার অজুহাতে সেনা পাঠানোর সাহস না দেখায়। কারণ এমনটা ঘটলে রাশিয়া তাকে যুদ্ধের সূত্রপাত বলেই বিবেচনা করবে ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করবে।
সবমিলিয়ে বিশ্বজুড়ে এই মুহূর্তে চূড়ান্ত ডামাডোল। ভয় ধরাচ্ছে আরও একটা তথ্য। ফেডারেশন অফ আমেরিকান সায়েন্টিস্ট-এর তথ্য মোতাবেক, আমেরিকা ও রাশিয়ার কাছে গোটা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পারমাণবিক বোমা মজুত রয়েছে। দু দেশের অস্ত্র ভাণ্ডারেই ৫০০০-এরও বেশি বোমা রয়েছে। চিনের কাছে কম করে ৫০০, ফ্রান্সের কাছে প্রায় ৩০০, ব্রিটেনের ভাণ্ডারে ২২৫-এর মতো পারমাণবিক বোমা রয়েছে। তবে একটা হিসাব পরিষ্কার, যে রাশিয়ার একার কাছে যত পরমাণু বোমা রয়েছে, গোটা ইউরোপের সবকটি দেশ মিলিয়েও তত বোমা নেই। যার ফলে রুশ বিদেশমন্ত্রীর এই হুঁশিয়ারি যে কেবল ফাঁকা বুলি নয়, সেটা স্পষ্ট। তার উপর আবার রুশ সেনাবাহিনীতে প্রায় ১,৮০,০০০ জনেরও বেশি কর্মরত সক্ষম সদস্য সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ায় তাঁদের সেনা সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ লক্ষ-য়। যা বিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম। চিন ছাড়া আর কোনও দেশের কাছে এত সেনা নেই। রুশ বিদেশমন্ত্রী তাই সাফ জানিয়েছেন, ফ্রান্স-ব্রিটেন যতই দিবাস্বপ্ন দেখুক না কেন, যুদ্ধের কঠিন মাটিতে রাশিয়াকে টক্কর দেওয়ার কাছাকাছিও নেই তারা।
