‘সেকুলার দেশে দিওয়ালি বার্তায় কেন ব্রাত্য দিয়া?’
এই সময়: ভারতের মতো ‘সেকুলার’ দেশে অভিনেত্রী দিয়া মির্জ়ার পরিবেশ–বান্ধব দিওয়ালির প্রচার ভিডিয়ো সরিয়ে দেওয়া খুবই দুর্ভাগ্যজনক— স্বতঃপ্রণোদিত মামলা গ্রহণ করে মঙ্গলবার এ কথাই মনে করিয়ে দিল বম্বে হাইকোর্ট। ওই ভিডিয়ো পুনরায় আপলোডের জন্য বৃহন্মুম্বই পুরসভা (বিএমসি)–কে নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
দিয়াকে ‘হিন্দুবিদ্বেষী’ বলে দেগে দিয়ে যে ভাবে তাঁর বাজি ও দূষণহীন দিওয়ালি পালনের বার্তা সরিয়ে ফেলা হয়েছিল, তা নিয়ে দেশজোড়া বিতর্কের মধ্যে বম্বে হাইকোর্টের এই মন্তব্য যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
আদালতের নির্দেশেই বেশ কিছু সেলিব্রিটিকে দিয়ে দূষণহীন দিওয়ালির ভিডিয়ো–বার্তা রেকর্ড করিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করেছিল বিএমসি। কিন্তু রবিবার দিয়া মির্জ়ার ভিডিয়োটি নিয়ে আপত্তি তোলেন বিজেপির মুম্বই চিফ অমিত সাতাম। তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘দিওয়ালি সেলিব্রেশনের পাঠ আমরা ওঁর (দিয়া) থেকে নেব না।’ এর পরেই দিয়ার ভিডিয়ো সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সরিয়ে ফেলে বিএমসি।
অভিনেত্রী মাধুরী দীক্ষিত, ক্রিকেটার অজিঙ্ক রাহানের পরিবেশরক্ষার ভিডিয়ো কিন্তু ডিলিট করা হয়নি। সোমবার মুম্বইয়ের মেয়র রীতু তাওড়ে দাবি করেন, ‘দিয়া মির্জ়া হিন্দু–বিদ্বেষী। উনি সব সময়ে বিভেদমূলক শক্তিকে সমর্থন করেন। নিট–ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ট্রোল করেছিলেন উনি। ওঁর মতো হিন্দু–বিদ্বেষীকে আমরা ব্ল্যাকলিস্ট করেছি।’ যদিও কংগ্রেস, শিবসেনা (ইউবিটি)–এর মতো বিরোধীরা প্রশ্ন তোলে, উৎসব বা পরিবেশ রক্ষার ইস্যুতে ধর্মের ভেদাভেদ করা যায় কি? কার্যত সেই প্রশ্নই এ দিন তুলে দিল বম্বে হাইকোর্ট।
স্বতঃপ্রণোদিত মামলায় মঙ্গলবার বিচারপতি জিএস কুলকার্নি এবং বিচারপতি ডক্টর নীলা গোখলের বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, ‘উৎসব সকলে উদ্যাপন করতে পারেন। দেশের কোনও উৎসব থেকে কোনও ব্যক্তিকে দূরে রাখা যায় না। কোনও ব্যক্তি শুধুমাত্র ভিন্ধর্মের বলে তাঁর যোগদান নিয়ে আপত্তি তোলা যায় কি? আমরা তো সেকুলার দেশ!’ এই প্রসঙ্গেই কিছু রাজনীতিকদের মন্তব্যকে চূড়ান্ত ‘আপত্তিকর ও দুর্ভাগ্যজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন বিচারপতিরা। তাঁদের বক্তব্য, ‘গতকাল যে খবর সামনে এসেছে, তাতে আমরা বেদনাহত। আদালতের নির্দেশ মেনেই সচেতনতামূলক ভিডিয়ো রেকর্ড করা হয়েছিল।
আদালতই বলেছিল, যে কোনও জাত, ধর্মের মানুষ সমাজে সচেতনতা প্রসারে অংশ নিতে পারেন। তা হলে কেন এই ব্যক্তির সচেতনতা বার্তা নিয়ে আমাদের এত আপত্তি?’ হাইকোর্টের মন্তব্য, ‘উনি তো দূষণ নিয়ে ভালো বার্তাই দিয়েছেন। এতে সাম্প্রদায়িক রং চাপানো দুর্ভাগ্যজনক। দু’–তিন জনের বিচ্ছিন্ন ভাবনা থেকে এই পরিস্থিতির উদ্ভব। এই ভিডিয়ো কোনও ভাবেই মুছে ফেলা উচিত নয়।’ বিচারপতি গোখলের পর্যবেক্ষণ— প্রত্যেকে একই বাতাসে শ্বাস নেন, তা দূষিত হলে সচেতন করার অধিকার সকলের রয়েছে।
এই বিতর্ক নিয়ে অভিনেত্রী দিয়া সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছিলেন, ‘এর জন্য কোনও পয়সা নিইনি, আসলে ভালোর যুগ আর নেই! আর বায়ুদূষণ তো সকলের জন্যই উদ্বেগের, তা নিয়ে ভিডিয়ো করলে সমালোচনা কেন?’ এ দিন আদালতের পর্যবেক্ষণ অভিনেত্রীর অবস্থানকেই সমর্থন করেছে।
তবে, এর পরেও সুর নরম করছে না বিজেপি। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবীশ মঙ্গলবার বলেন, ‘এটা একটা ছোট ব্যাপার, অকারণে বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে। আমার মনে হয় না, হাইকোর্ট আমাদের বিরুদ্ধে কোনও কড়া অবস্থান নিয়েছে। এটা সোশ্যাল মিডিয়া সংক্রান্ত একটা ছোট ইস্যু।’ আর অমিত সাতামের মন্তব্য, ‘কারও ধর্ম দেখে আমরা আপত্তি তুলিনি। দিয়া মির্জ়ার সঙ্গে ভারত–বিরোধী শক্তি ও টুকড়ে টুকড়ে গ্যাংয়ের যোগ দেখেই আমরা আপত্তি তুলেছিলাম। তবে আদালতের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা আছে। তাদের পর্যবেক্ষণ অবশ্যই পড়ে দেখব।’