‘সার’ শেষেও দু’মাসে লিস্টে দুশো বাংলাদেশি
সুগত বন্দ্যোপাধ্যায়
‘ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট’— বাংলায় বিধানসভা ভোটের প্রচারে এসে বারবার এই ‘থ্রি ডি’ নীতির কথা বলেছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ থেকে শুরু করে বঙ্গ–বিজেপি নেতৃত্ব। তাঁদের মোদ্দা কথা ছিল, ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (সার) উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশি, রোহিঙ্গাদের মতো অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে দেশ থেকে বের করা। বাংলায় ‘সার’ প্রক্রিয়া শেষে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়েছে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। সব মিলিয়ে বাদ গিয়েছিল প্রায় ৯০ লক্ষ ভোটারের নাম।
কিন্তু এর ছ’মাস বাদে দেখা যাচ্ছে, এখনও বঙ্গের ভোটার তালিকায় রয়ে গিয়েছে বহু অনুপ্রবেশকারীর নাম। নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে মঙ্গলবার জানা গিয়েছে, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর— এই দু’মাসে ফরেনার্স রেজিস্ট্রেশন রিজিওনাল অফিসের (এফআরআরও) তরফে অন্তত দু’শোর বেশি ব্যক্তির নামের তালিকা পাঠানো হয়েছে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দপ্তরে।
এফআরআরও জানিয়েছে, এই ব্যক্তিরা আদতে বাংলাদেশি নাগরিক। বৈধ ভিসা নিয়ে ভারতে ঢুকলেও মেয়াদ শেষে তাঁরা নিজেদের দেশে ফেরেননি। বরং তাঁদের নাম রয়েছে এ রাজ্যের ভোটার লিস্টে! এমনকী, এর ভিত্তিতে তাঁরা ভারতীয় পাসপোর্ট, আধার কার্ডের মতো নথিও তৈরি করে ফেলেছেন। সিইও দপ্তরকে এর ভিত্তিতে অনুসন্ধান চালিয়ে এই নামগুলি ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া ও অন্যান্য আইনি পদক্ষেপের জন্যও লিখেছে এফআরআরও।
কমিশন সূত্রের দাবি, ‘সার’ প্রক্রিয়ায় প্রথমে ‘এএসডিডি’ (অনুপস্থিত, স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত, মৃত ও ডুপ্লিকেট) এবং পরের ধাপে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতি পর্যায়ে নথি যাচাই করে অসঙ্গতি থাকা ভোটারদের যে বাদ দেওয়া হয়েছিল, তারপরেও এই দুই শতাধিক বাংলাদেশির নাম ভোটার লিস্টে রয়ে গিয়েছে। এই পরিসংখ্যান শুধুমাত্র দু’মাসের। এফআরআরও ভারতে বৈধ ভাবে আসা বিদেশ নাগরিকদের নথি যাচাই করে এই তথ্য নিয়মিত জানাতে থাকে সিইও দপ্তরকে।
ফলে এই সংখ্যাটা আগামী দিনে আরও বাড়তে পারে। এ তো গেল শুধুমাত্র বৈধ পাসপোর্ট–ভিসা নিয়ে এ দেশে আসা বিদেশি নাগরিকের তথ্য। ফলে বেআইনি ভাবে যাঁরা ঢুকছেন, তাঁদের নামও যদি ভোটার লিস্টে উঠে থাকে, তা হলে সংখ্যাটা আরও অনেকটা বাড়বে। এখানেই প্রশ্ন উঠছে, সেক্ষেত্রে ‘সার’–এর পরেও অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় খামতি রয়ে গিয়েছে কি?
সোমবারই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীন দাবি করেছিলেন, গোটা দেশে ‘সার’ প্রক্রিয়ায় যে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ গিয়েছে, তার মধ্যে তিন কোটি অনুপ্রবেশকারী আছেন। যদিও এই পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ‘মমতা তৃণমূল’, কংগ্রেস, বামেরা। বঙ্গ–বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও একাধিকবার জানিয়েছেন, বাংলায় ‘সার’ সঠিক ভাবে হলে আরও অন্তত ৩০ লক্ষ নাম বাদ যাওয়ার কথা।
সিইও দপ্তর সূত্রের খবর, এই দুই শতাধিক ব্যক্তির বেশিরভাগের নাম মিলেছে মূলত হাওড়া, কলকাতা এবং উত্তর ২৪ পরগনায়। এফআরআরও তদন্ত করতে গিয়ে দেখেছে, হাওড়ার শিবপুরের এক ব্যক্তির কাছে ভারত ও বাংলাদেশ— দু’দেশেরই পাসপোর্ট পাওয়া গিয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে ভারতীয় ভোটার ও আধার কার্ডও।
এফআরআরও–র দাবি, ওই ব্যক্তি স্বীকার করে নিয়েছেন তিনি বাংলাদেশের নাগরিক। ওই ব্যক্তি ভোটার লিস্ট থেকে নিজের নাম বাদ দেওয়ার জন্য ওই বিধানসভা কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারের (ইআরও) কাছে ৭ নম্বর ফর্ম জমাও দিয়েছেন। পাশাপাশি বেআইনি ভাবে এ দেশে থাকা বিদেশি নাগরিকদের বিষয়ে পুলিশ–প্রশাসনকেও জানানো হচ্ছে।
কিন্তু ভোটার তালিকা থেকে এই বাংলাদেশি নাগরিকদের আগে চিহ্নিত করে বাদ দেওয়া হয়নি কেন?
সিইও দপ্তরের কোনও কর্তা প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চাননি। তবে এক আধিকারিকের যুক্তি, ‘ভোটার তালিকায় সংশোধন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। ভোট মিটে যাওয়ার পরে বহু জায়গায় ইআরও পদ শূন্য রয়েছে। বিধানসভা ভোটের পরে দপ্তরের কাজে কিছুটা শিথিলতাও এসেছে। তবে কোনও অনিয়ম ধরা পড়লে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’ এর পিছনে কোনও বিএলও, ইআরও–র গাফিলতি আছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে অনেক সময়ে ভুয়ো নথি দেখে ভুলও হতে পারে।