অন্ধ্রের পথে ‘অর্ণব’, বুধবার থেকে ভোগান্তি বঙ্গে
এই সময়: বঙ্গোপসাগরে ক্রমশ শক্তি বাড়াচ্ছে ‘অর্ণব’। মঙ্গলবারের মধ্যে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়ে বুধবার, ২৮ অক্টোবর অন্ধ্রপ্রদেশের বাপটলা ও বিশাখাপত্তনমের মাঝামাঝি জায়গা দিয়ে ল্যান্ডফল করতে চলেছে এই অতি তীব্র ঘূর্ণিঝড়। ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য গতিপথ বাংলা থেকে বহু দূরে রয়েছে। শুধু তাই নয়, একই সঙ্গে ঝড়ের ‘কোন অফ আনসার্টেনিটি’ (অনিশ্চয়তা শঙ্কু)–ও বাংলার থেকে অনেক দূরে থাকছে। এর পরেও বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ওই ওয়েদার সিস্টেম এতটাই শক্তিশালী যে দুর্যোগ পুরোপুরি এড়াতে পারবে না রাজ্য। ‘অনিশ্চয়তা শঙ্কু’ হলো এমন একটি মানচিত্র-নির্দেশিত এলাকা, যার মধ্যে নির্দিষ্ট সময়ে ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্র অবস্থান করতে পারে বলে আবহবিদরা অনুমান করেন। পূর্বাভাসের সময়সীমা যত বাড়ে, সাধারণত এই শঙ্কুও তত চওড়া হয়।
‘অর্ণব’–এর প্রভাবে বুধবার থেকেই দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টির তীব্রতা বাড়বে। বৃহস্পতিবার দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস জারি করেছে হাওয়া অফিস। বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ঝোড়ো হাওয়ার আশঙ্কাও যথেষ্ট। শুক্রবারও বৃষ্টির দাপট বজায় থাকবে। উত্তরবঙ্গেও বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত বৃষ্টি, বজ্রপাত ও ঝোড়ো হাওয়ার সতর্কতা রয়েছে।
মৌসম ভবনের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার ঘূর্ণিঝড়টি পশ্চিম-মধ্য ও সংলগ্ন মধ্য বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছিল। সেই সময়ে সেটি ঘণ্টায় ১৩ কিলোমিটার গতিতে পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে এগোচ্ছিল। তখন ‘অর্ণব’ ওডিশার গোপালপুর থেকে প্রায় ৫২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে এবং বিশাখাপত্তনম থেকে ৫৪০ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণপূর্বে অবস্থান করছিল। সোমবার রাতে সেটি ‘প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে’ পরিণত হয়। মঙ্গলবার দুপুরের মধ্যে তার ‘অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে’ পরিণত হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। আবহাওয়াবিদ্যার পরিভাষায়, ঘূর্ণিঝড়ে বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৮৯–১১৭ কিলোমিটার পর্যন্ত থাকলে তাকে ‘তীব্র ঘূর্ণিঝড়’ এবং বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১১৮–১৬৫ কিলোমিটার পর্যন্ত উঠলে সেটিকে ‘অতি তীব্র ঘূর্ণিঝড়’ শ্রেণিতে ফেলা হয়। পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামীকাল, বুধবার সকালে ঘণ্টায় ১১৫ থেকে ১২৫ কিলোমিটার স্থায়ী গতিবেগ এবং সর্বোচ্চ ১৪০ কিলোমিটার দমকা হাওয়া নিয়ে ঝড়টির উপকূল অতিক্রম করার সম্ভাবনা।
তবে ঘূর্ণিঝড়ের বিপদ শুধু উপকূলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। স্থলভাগে ঢোকার পরে ‘আই অফ দ্য স্টর্ম’–টি আরও ভিতরে এগিয়ে যাওয়ার সময়েও বেশ কিছুক্ষণ ঝড়ের তীব্রতা বজায় থাকবে। উপকূলবর্তী এলাকায় সমুদ্রের জলস্তর স্বাভাবিকের তুলনায় ১ থেকে ২.৬ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পুনের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ট্রপিক্যাল মিটিওরোলজি (আইআইটিএম)-এর আবহবিদরা জানাচ্ছেন, বর্তমানে সমুদ্রের উপরিতলের তাপমাত্রা প্রায় ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। জলতলের তাপমাত্রা এত বেশি থাকায় ঘূর্ণিঝড় প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্পের জোগান পাচ্ছে। এই কারণে খুব সহজে তার শক্তিক্ষয় হবে না। ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য অভিমুখ সম্পর্কে মৌসম ভবন যা জানিয়েছে, তার ভিত্তিতে বলা যায়, ল্যান্ডফলের পরে ‘অর্ণব’ এবং তার অবশেষ দেশের মূল ভূখণ্ডের অনেকটা অভ্যন্তরে ঢোকার পরে হঠাৎই থমকে গিয়ে প্রায় ৯০ ডিগ্রি উত্তরে ঘুরে উত্তরপ্রদেশ পর্যন্ত এগোতে থাকবে। বর্ষা বিদায়ের পরে দেশের উত্তর-পশ্চিম দিকে ইতিমধ্যেই একটি পশ্চিমী ঝঞ্ঝা ঘনিয়ে উঠেছে। দেশের ওই প্রান্ত থেকে ঢুকে আসা বাতাসের প্রভাবেই ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে আসা বাতাসের প্রবাহের এমন অভিমুখ পরিবর্তন। অনুমান করা হচ্ছে, ২০১৪-র ‘অতি তীব্র ঘূর্ণিঝড়’ হুদহুদের পরে এই অঞ্চলে এটি সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় হয়ে উঠতে চলেছে। ২০১৪-র ১২ অক্টোবর বিশাখাপত্তনমের কাছে হুদহুদের ল্যান্ডফলের সময়ে বাতাসের বেগ ছিল ঘণ্টায় ১৮৫ কিলোমিটার।
শেষ পর্যন্ত ‘অর্ণব’ কতটা শক্তিশালী হবে, তা নিয়ে একমত নন আবহবিদরা। একদিকে সমুদ্রের উপরিতলের তাপমাত্রা প্রায় ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস—দ্রুত শক্তি বৃদ্ধির পক্ষে যা অনুকূল। কিন্তু একই সঙ্গে উপরের বায়ুমণ্ডলের জোরালো বায়ুপ্রবাহ ঝড়ের কাঠামোকে দুর্বল করে দেওয়ার সম্ভাবনাও যথেষ্ট। মনে করা হচ্ছে, ‘অর্ণব’ দ্রুত শক্তি বৃদ্ধি করলেও শেষ পর্যন্ত খুব বেশি সুসংগঠিত অবস্থায় থাকতে পারবে না।
‘অর্ণব’-এর প্রভাবে দক্ষিণবঙ্গে ২৮ অক্টোবর কলকাতা-সহ প্রতিটি জেলাতেই বৃষ্টি এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর এবং ঝাড়গ্রামে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকবে। ২৯ অক্টোবর কলকাতা-সহ গোটা দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টির তীব্রতা বাড়বে বলে জানানো হয়েছে। এ দিন মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া ও পশ্চিম বর্ধমানে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া এবং বজ্রপাতের আশঙ্কাও রয়েছে। ৩০ অক্টোবর বৃষ্টির প্রকোপ কমলেও পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ ও নদিয়ায় বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে।
উত্তরবঙ্গে ২৯ অক্টোবর দার্জিলিং ও জলপাইগুড়িতে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। ৩০ অক্টোবর কালিম্পং ও আলিপুরদুয়ারেও ভারী বৃষ্টি হতে পারে। শনিবার, ৩১ অক্টোবর বৃষ্টির পরিমাণ কমার সম্ভাবনা থাকলেও দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কালিম্পং, আলিপুরদুয়ার ও কোচবিহারে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ঝোড়ো হাওয়ার আশঙ্কা থাকছে।