কলকাতা পুরভোটে লড়বেন না ফিরহাদ, একত্রিশের পর রাজনীতি ছাড়ার ইঙ্গিত
কলকাতা: আসন্ন কলকাতা পুরনিগমের নির্বাচনে আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না বলে জানিয়ে দিলেন প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিম (Firhad Hakim)। শনিবার তাঁর এই ঘোষণায় কলকাতার পুররাজনীতিতে নতুন জল্পনা তৈরি হয়েছে। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কাউন্সিলর থেকে কলকাতা পুরনিগমের দুইবারের মেয়র হয়ে ওঠার দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রায় এবার ইতি টানতে চলেছেন তিনি। একই সঙ্গে ২০৩১ সালে কলকাতা পোর্ট কেন্দ্রের বিধায়ক হিসেবে বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার পর রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোরও ইঙ্গিত দিয়েছেন ফিরহাদ।
তবে রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দিলেও তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি নিজের আনুগত্যের কথা জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি তাঁর মন্তব্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘ভক্তির বদলে রক্তের সম্পর্ককে বেছে নিয়েছেন’, যা তাঁকে আঘাত করেছে। এই মন্তব্য ঘিরে তৃণমূলের অন্দরে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
ALSO READ | বিহারের রাজনীতিতে বড় সিদ্ধান্ত! জনতা দল থেকে বহিস্কৃত বাহুবলি বিধায়ক
কেন পুরভোটে লড়বেন না ফিরহাদ?
একটি বেসরকারি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফিরহাদ হাকিম জানান, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জন্য কাজ করার ক্ষমতায় পরিবর্তন আসে। তাই নতুন প্রজন্মকে দায়িত্ব দেওয়ার পক্ষেই তিনি। তাঁর বক্তব্য, একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করাই ভালো, কারণ তরুণ বয়সে মানুষের জন্য যে পরিষেবা দেওয়া সম্ভব, বয়স বাড়লে তা সব সময় সম্ভব হয় না।
ফিরহাদের কথায়, তিনি চান তাঁর এলাকার তরুণরা মানুষের পাশে দাঁড়ান এবং তাঁর মতো বয়স্কদেরও পরিষেবা দিন। নতুন প্রজন্ম যদি মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারে, তাহলে রাজনৈতিকভাবে তাদের হারানো কঠিন হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রায় চার মাস আগে কলকাতার মেয়র পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন ফিরহাদ। সেই সময় তিনি বলেছিলেন, মর্যাদা বজায় রেখেই তিনি পদ ছাড়তে চান। এবার পুরভোটে না লড়ার সিদ্ধান্ত জানিয়ে নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও স্পষ্ট ইঙ্গিত দিলেন তিনি।
ALSO READ | পিস্ বন্ড সই করতে আপত্তি! খারিজ নেহা বোরার পিটিশন
রাজনৈতিক উত্তরসূরি কি মেয়ে প্রিয়দর্শিনী?
ফিরহাদ হাকিমের মেয়ে প্রিয়দর্শিনী হাকিম রাজনীতিতে সক্রিয়। ফলে বাবার ছেড়ে দেওয়া রাজনৈতিক জায়গায় তিনিই এগিয়ে আসবেন কি না, তা নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছে। পুরসভার ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের ফলে ফিরহাদের দীর্ঘদিনের ৮২ নম্বর ওয়ার্ড, অর্থাৎ চেতলা, ভাগ হয়ে দুটি ওয়ার্ডে পরিণত হয়েছে। তার মধ্যে একটি মহিলা সংরক্ষিত হওয়ায় প্রিয়দর্শিনীর সম্ভাব্য প্রার্থিতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে মেয়েকে রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে তুলে ধরার বিষয়ে সরাসরি কোনও ঘোষণা করেননি ফিরহাদ। তাঁর বক্তব্য, পরিবারের কাউকে রাজনীতিতে নিয়ে আসার পক্ষে তিনি নন। তবে পরিবারের কেউ নিজের ইচ্ছায় রাজনীতিতে আসতে চাইলে তিনি তাঁকে বাধা দেবেন না। তাঁর কথায়, কাউকে বাইরে থেকে এনে রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পক্ষপাতী নন তিনি।
মমতাকে এখনও নেত্রী মানেন, তবু আক্ষেপ
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ফিরহাদ বলেন, আজও তিনি মমতাকেই নিজের নেত্রী বলে মনে করেন। তবে তাঁর আক্ষেপ, মমতা ‘ভক্তির বদলে রক্তকে বেছে নিয়েছেন’। এই মন্তব্যে তিনি কাকে ইঙ্গিত করেছেন, তা স্পষ্ট করে বলেননি। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামও সরাসরি উল্লেখ করেননি তিনি।
ফিরহাদের এই বক্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নানা ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছে। তবে তাঁর মন্তব্যের নির্দিষ্ট লক্ষ্য সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো স্পষ্ট বক্তব্য সামনে আসেনি।
ফিরহাদকে তীব্র আক্রমণ কুণাল ঘোষের
ফিরহাদের মন্তব্যের পরই পাল্টা আক্রমণ শানিয়েছেন তৃণমূল বিধায়ক ও মুখপাত্র কুণাল ঘোষ। তাঁর বক্তব্য, মেয়র পদ থেকে ফিরহাদের ইস্তফা দেওয়ার কোনও প্রয়োজন ছিল না। তিনি পদে থেকে মানুষের পরিষেবা দিতে পারতেন। কুণালের অভিযোগ, ফিরহাদের সিদ্ধান্তের ফলে সরকার পুরনিগমের উপর নিয়ন্ত্রণ নিতে পেরেছে।
কুণাল আরও অভিযোগ করেন, ফিরহাদ নিজের রাজনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উত্থানের সময় তাঁর কাছ থেকে যে সুযোগ ও গুরুত্ব পেয়েছিলেন, তার প্রতি যথাযথ আনুগত্য দেখাননি। বিজেপির সঙ্গে তাঁর অবস্থান নিয়েও কটাক্ষ করেন তৃণমূল মুখপাত্র। তবে এগুলি কুণাল ঘোষের রাজনৈতিক অভিযোগ ও মূল্যায়ন, স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য নয়।
ফিরহাদের ‘রক্ত বনাম ভক্তি’ মন্তব্যের প্রসঙ্গেও পাল্টা প্রশ্ন তোলেন কুণাল। তাঁর বক্তব্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন ফিরহাদ কেন এই কথা বলেননি? সেই সময় তিনি শুধু কলকাতার মেয়র ছিলেন না, রাজ্য মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্যও ছিলেন। কুণালের দাবি, মমতার আস্থা ও বিশ্বাসের সঙ্গে ফিরহাদের আচরণ সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
পুরভোটে একা লড়ার পক্ষে ফিরহাদ
বর্তমানে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের সঙ্গে যুক্ত ফিরহাদ হাকিম আসন্ন পুরনির্বাচনে তৃণমূলের বিদ্রোহী অংশের একা লড়ার পক্ষেও সওয়াল করেছেন। তাঁর মতে, তরুণ প্রজন্ম এবং জেনারেশন জেড বা জেন জ়ি-কে রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে আসার সুযোগ দেওয়া উচিত।
ফিরহাদের পুরভোটে না লড়ার সিদ্ধান্ত তাই শুধু ব্যক্তিগত অবসর নেওয়ার ঘোষণা নয়, কলকাতার পুররাজনীতিতে সম্ভাব্য নেতৃত্ব পরিবর্তন এবং তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তুলেছে। তবে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরসূরি কে হবেন এবং ২০৩১ সালের পর তিনি সত্যিই সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াবেন কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়।